ArthoSuchak
সোমবার, ৩০শে মার্চ, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

ভারতের ভোট-রাজনীতিতেও পিকে জাদু!

ভারতীয় চলচিত্রের যত সংক্ষিপ্ত তালিকা করেন না কেন আমির খান অভিনীত পিকে বাদ রাখতে পারবেন না কোনভাবেই। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার বলেন বা বৈশ্বিক, সবখানেই দাপট দেখায় পিকে। এমনকি চীনে রিতিমতো রেকর্ড তৈরি করে পিকে। তবে পিকে জাদু এখন আর পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই, ভারতের রাজনীতিতে এখন অন্যতম আলোচনা পিকে। নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে মমতা ব্যানার্জী এমনকি অরবিন্দ কেজরিওয়াল পর্যন্ত পিকে জাদুকে তৃতীয় বারের মত দিল্লির মসনদে!

ভারতের দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টির বিজয়ের পেছনেও রয়েছেন এক রহস্যমানব- প্রশান্ত কিশোর, যিনি পিকে নামেই পরিচিত। ভারতের কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক অনেক নেতার ভোটে বিজয়ের পেছনে রয়েছে তার অবদান।

কেজরিওয়ালের জন্য সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ফাঁদ পেতেছিল বিজেপি। সেই ফাঁদ এড়িয়ে কীভাবে জিতলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল? হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের চক্রে না পড়ে, জাতীয় ইস্যুতে ছটফটানি না দেখিয়ে নাগরিক সেবার ওপর জোর দিয়ে জিতে গেলেন তিনি। এসব বুদ্ধি তাকে দিয়েছিলেন ভারতের ভোটগুরু বলে খ্যাত প্রশান্ত কিশোর বা পিকে। ভারতে ভোট জয়ের এই জাদুকর যার পক্ষে, তিনিই নাকি জেতেন, এমন মিথ তৈরি হয়েছে তাকে ঘিরে।

এ মিথ অবশ্য এমনি এমনিই তৈরি হয়নি। বলা হয়ে থাকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমার, কংগ্রেসপ্রধান রাহুল গান্ধী, পাঞ্জাবের কংগ্রেস নেতা কাম মুখ্যমন্ত্রী অমেরেন্দ্র সিং আর হালের চমক অন্ধ্রের জগন (জগন মোহন রেড্ডি)- সবাই তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। রাজীব গান্ধী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার কথা পুরোপুরি না শোনার ফলে পুরো ফল পাননি বলে বলা হয়। এককথায় প্রশান্ত কিশোর এখন ভারতের ভোটগুরু।

মোদি তখন গুজরাটে বারবার তিনবার ফেরত আসার যুদ্ধে হালে পানি পাচ্ছিলেন না, সেই ২০১২ সালে মোদির গুজরাট বিধানসভা ভোটের হাল ধরেন প্রশান্ত কিশোর। সবাইকে তাক লাগিয়ে জিতিয়ে দেন হারের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা চিন্তিত মোদি আর তার দল বিজেপিকে।

লোকসভার ভোটে ইজ্জত খোয়ানোর পর আম আদমি পার্টির ভেতর প্রশান্ত কিশোরের সাহায্য নেওয়ার পক্ষে চাপ তৈরি হলেও অরবিন্দ তেমন একটা গা করেননি। কিন্তু বিজেপির মার মার কাট কাট প্রচারে একরকম ভড়কে গিয়ে প্রায় শেষ মুহূর্তে রাজি হয়ে যান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তখন হাতে মাত্র দেড় মাস সময়। প্রায় নিরুপায় হয়ে তিনি তার কুরসি রক্ষার দায়িত্ব তুলে দেন প্রশান্ত কিশোরের হাতে। দায়িত্ব পেয়ে পিকে অরবিন্দকে বলেন, তার বোল-চাল পাল্টাতে হবে। চরম মোদিবিরোধী ভাবমূর্তির বদলে নরম এক ভাবমূর্তির লেবাস পরতে হবে। কেন্দ্রবিরোধী, সংঘাতমূলক, আপসহীন কথাবার্তার লাগাম টেনে নগরের বিকাশ আর নাগরিকদের স্বস্তি তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে তার পরিকল্পনা আর অর্জনের বার্তার ভলিউম বাড়িয়ে দিতে হবে। প্রশান্ত কিশোরের মতে, বিজেপি তাকে গরম করার চেতানোর কৌশল নেবে। চটলেন তো হারলেন। বিজেপি আক্রমণ করলেও অরবিন্দ যেন তা উপেক্ষা করার নীতি নেন। না চটে, না চিল্লিয়ে নিজের উন্নয়নের ছবি তুলে ধরতে হবে। কেজরিওয়াল সে কথা মেনে নেন।

ভোট-কুশলী প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শে অরবিন্দ কেজরিওয়াল তার শাসনামলের এক আমলনামা বা রিপোর্ট কার্ড তৈরি করে ২৫ হাজার পরিবারের কাছে নিজের হাতে সে আমলনামা পৌঁছে দেন। আম পার্টির হয়ে ব্যক্তিগত চিঠি লেখেন দিল্লির প্রায় ১৫ হাজার গণ্যমান্য ব্যক্তির কাছে। তাদের অনেকে তার চিঠির জবাব দিয়েছেন, প্রশ্ন করেছেন, সেসব প্রশ্নেরও উত্তর তাকে দিতে হয়েছে। জবাবদিহির এমন আয়োজন দিল্লিবাসী আগে দেখেনি। পিকের আরেক পরামর্শ ছিল বিজেপির বাইরে ধর্মকর্মের প্রতি অন্য মানুষদেরও যে সম্মতি আছে সেটা দেখানো, প্রচার করা। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের যে ধর্মে মতি আছে, সেটা প্রমাণের জন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে হনুমান মন্দির দর্শন করতে হয়েছে। দিল্লির কয়েক হাজার বয়স্ক মানুষকে বিনা খরচে তীর্থ করানোর বিষয়টিও বড় করে প্রচারে নিয়ে আসেন। এভাবে জনতাকে প্রকাশ্যে কিন্তু কৌশলে জানিয়ে দেওয়া হয় হিন্দুত্ব বিজেপির একার সম্পত্তি নয়, অন্যরাও ধর্মচর্চা করেন।

বিহারের রথাস জেলার করানে ১৯৭৭ সালে জন্ম নেওয়া প্রশান্তের পড়াশোনা বক্সার জেলায়। জনস্বাস্থ্য বা পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞ হিসেবে চাকরি করতেন জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচিতে। সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ইলেকশন স্ট্র্যাটেজিস্ট (নির্বাচন কৌশলী) হিসেবে নির্বাচনপ্রত্যাশীদের কোচিং সেন্টার খুলে মিডিয়ায় জোরশোর প্রচার শুরু করেন। গুজরাটের তদকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদি তাকে ডেকে পাঠান। প্রশান্ত মোদিকে শেখান কীভাবে প্রেসের সঙ্গে বাতচিত করতে হয়, কীভাবে হাসিমুখে না রেগে জবাব দিতে হয় অস্বস্তিকর প্রশ্নের। একেবারে ওয়ান টু ওয়ান কোচিং। মোদি ছিলেন খুবই সিরিয়াস অনুগত ছাত্র। ফলও পান হাতেনাতে। ২০১৪ লোকসভার নির্বাচনে প্রশান্ত কিশোরকে সঙ্গে রাখেন মোদি। ফল পান হাতেনাতে। এভাবেই ভারতের ভোট-রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন প্রশান্ত কিশোর বা পিকে।

অর্থসূচক/কেএসআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ