৯-৯৯ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ খেলাপি যেসব ব্যাংকের

খেলাপি ঋণের চাপে সংকুচিত দেশের পুরো আর্থিক খাত। গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ। সেপ্টেম্বর শেষে মোট ২১ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত। যা দেশের আর্থিক খাতের জন্য হুমকি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

খেলাপির তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে বিদেশি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। সেপ্টেম্বর শেষে বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৯৯ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে ব্যাংকটির। অপর বিদেশি ব্যাংক হাবিব ব্যাংকের খেলাপি ১০ শতাংশ।


অর্থসূচকে প্রকাশিত পুঁজিবাজার ও ব্যাংক-বিমার খবর গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো এখন নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে আমাদের ফেসবুক গ্রুপ Sharebazaar-News & Analysis এ। প্রিয় পাঠক, গ্রুপটিতে যোগ দিয়ে সহজেই থাকতে পারেন আপডেট।


বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ব্যাংকের মোট খালাপি ১০ শতাংশের অধিক হলে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের ঝামালায় পড়তে হয়। উচ্চ খেলাপির ব্যাংগুলোর সাথে বিদেশি ক্রেতারা লেনদেন করতে চান না। দেশের মোট খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণেই সব ব্যাংকের খেলাপি বৃদ্ধি পেয়েছে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরকারি ব্যাংকের সবগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিতরণের ১৬ শতাংশের উপরে। একক ব্যাংকের বিবেচনায় বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের খেলাপি হয়ে গেছে বিতরণের ৫৭ শতাংশ, বেসিক ব্যাংকের ৫৯ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ৪৫ শতাংশ, রূপালী ব্যাংকের ১৭ শতাংশ, সোনালী ব্যাংকের ২৯ শতাংশ এবং অগ্রণী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিতরণের ১৬ শতাংশ।

বিশেষায়ীত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের খেলাপি বিতরণের ১৭ শতাংশ, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ২০ শতাংশ।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে উত্তরা ব্যাংকের ১০ শতাংশ, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৯ শতাংশ, পদ্মা ব্যাংকের ৭২ শতাংশ, ওয়ান ব্যাংকের ১০ শতাংশ, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৯ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১০ শতাংশ, মেঘনা ব্যাংকের ১১ শতাংশ, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৮৩ শতাংশ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৪৪ শতাংশ এবং এবি ব্যাংকের ২৪ শতাংশ।

এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১২ শতাংশ। টাকার অংকে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এই তালিকায় সরকারি ব্যাংকগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত বেশি। একটি দেশের অর্থনীতির জন্য এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। অতিরিক্ত ঋণ খেলাপির কারণে ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী মূলধন সংরক্ষণ, অ্যাডভান্স ডিপোজিট (এডিআর) সমন্বয় এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। চাপ কমাতে ব্যাংকিং খাতের উপর আস্থা ফিরিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য ব্যাংকিং খাতে সচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ভাল গ্রাহক বাছাই ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা তৎপরতার পরও কমছে না খেলাপি ঋণ। উল্টো বেড়েই চলেছে আর্থিক খাতের ‘বিষফোড়া’ খ্যাত খেলাপি ঋণের পরিমাণ। নতুন অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকাররা অনেক সময় ভাল-মন্দ যাচাই বাছাই না করেই বৃহৎ অংকের ঋণ বিতরণ করে ফেলেন। এসব টাকা নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হচ্ছে কিনা সে বিষয়েও কোনো খবর রাখা হয় না। এতে করে সত্যিকারের উদ্যোক্তার ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা। এই সমস্যা সমাধানে শুধু সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ না দিয়ে যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়ার পরামর্শ এই অর্থনীতিবিদের।

অর্থসূচক/কেএসআর