ArthoSuchak
সোমবার, ৩০শে মার্চ, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির বেহাল দশা

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বরে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের মাসে (নভেম্বর) যা ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাপি ঋণ লাগামহীনভাবে বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোকে বাড়তি নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে আশানুরূপ আমানত পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। ফলে ব্যাংকে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ নেই। বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়া এর অন্যতম কারণ।

এ ছাড়া আর্থিক খাতের নানা কেলেঙ্কারি ও সঞ্চয়পত্রে সুদ বেশি হওয়ায় ব্যাংকে আমানত প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ফলে একদিকে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ঋণ দিতে পারছে না ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে উচ্চ সুদহারের কারণে ঋণ নিতেও আগ্রহী নয় উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে বেসরকারি ঋণ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না।

চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছরের ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদ্রানীতিতে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত লক্ষ্য ঠিক করেছে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা গেল অর্থবছরের জুন পর্যন্ত লক্ষ্য ছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

অন্যদিকে চলতি অর্থবছর (জুলাই-জুন) পর্যন্ত সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু অস্বাভাবিক ভাবে বেসরকারি ঋণ বাড়তে থাকায় লক্ষ্যমাত্রা পরিবর্তন করে ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। আর অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ।

কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি ঋণের চাহিদাও বাড়বে বলে মত অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রক্ষেপণ ছিল সাড়ে ১৬ শতাংশ। এটি গত অর্থবছরের ঘোষিত মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ কম। এখন বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় এ বছর বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। নভেম্বরে যা ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অক্টোবরে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ০৪ শতাংশ। এর আগের মাস সেপ্টেম্বরে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগস্টে ছিল ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এর আগের মাস জুলাই শেষে ছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ।

জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ, মে মাসে যা ছিল ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর আগের মাস এপ্রিলে ছিল ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, মার্চে প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ। ফেব্রম্নয়ারিতে ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং জানুয়ারিতে ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জানুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে ৫২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা ধার করেছে সরকার। অর্থাৎ পুরো অর্থবছরে (১ জুলাই থেকে ৩০ জুন) ব্যাংক থেকে সরকারের যে টাকা ধার করার কথা ছিল ছয় মাসেই সেই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে।

এদিকে, ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে আসার আগে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কে নেমে এসেছে, যাকে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বলছেন বিশ্লেষকরা।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ খরা কাটাতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংক ঋণের সুদহার কমিয়ে এক অঙ্কে (১০ শতাংশের কম) আনার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক মালিকরাও দেড় বছর ধরে এমন ঘোষণা দিয়ে নানা সুবিধা নিয়ে আসছেন, তবে সুদহার কমেনি।

সর্বশেষ গত ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এই সুদহার হবে ৯ শতাংশ।

নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে উৎপাদন খাতে অর্থাৎ শিল্প খাতে ৯ শতাংশ সুদে ব্যাংকগুলোকে ঋণ বিতরণের নির্দেশনা সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল বোর্ডসভায়। কিন্তু এক সপ্তাহ না যেতেই ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ঘোষণা দেন, ১ জানুয়ারি নয়, ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে ৯ শতাংশ সুদহার। বর্তমানে ব্যাংক ভেদে উৎপাদন খাতে সুদহার ১১ থেকে ১৪ শতাংশ।

মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। এর মানে, বিনিয়োগ হচ্ছে না। অন্যদিকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি আছে। এর মানে হচ্ছে শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছে না বলে মত বিশ্লেষকদের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে কলকারখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনি যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি কমেছে ১০ শতাংশ। শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ২০ শতাংশের মতো।

অর্থসূচক/জেডএ/এমএস

এই বিভাগের আরো সংবাদ