ArthoSuchak
সোমবার, ৩০শে মার্চ, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

চাহিদা থাকলেও বাইরে পাওয়া যায় না কারাপণ্য

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় এবারও এসেছে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দীদের তৈরি হরেক রকমের পণ্য। কাঠের চেয়ার, টেবিল, বেতের চেয়ার, টেবিল, মোড়া, নকশী কাঁথা, জামদানি শাড়ি, গামছা-তোয়ালে, পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, নানা ধরনের কাঠের শো-পিস, ক্রিস্টাল পুঁতির শো-পিস, পাটের ব্যাগ, দোলনা, টি-শার্টসহ গৃহসজ্জা সামগ্রী থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহার্য গৃহস্থালী সামগ্রীও রয়েছে কারাপণ্যের স্টলে।

আজ বুধবার সরেজমিনে বাণিজ্য মেলা ঘুরে দেখা গেছে, বাণিজ্য মেলার ভিআইপি গেট থেকে একটু ভেতরে কারাপণ্যের প্যাভিলিয়ন। সেখানে প্রদর্শন করা হয়েছে, বাঁশ ও বেতের বুননে তৈরি বসার মোড়া। আছে পাটের তৈরি টেবিল ও চেয়ার। হাল ফ্যাশনের ডাইনিং টেবিলও প্রদর্শন করা হয়েছে সেখানে। এছাড়াও আছে জুতা, বিছানার চাদর, পাপোশ, মানিব্যাগ ও বাহারি রঙের পোশাক। রয়েছে আলমিরা, মোড়া, খাবারের ঢাকনা। প্যাভিলিয়নের একটি অংশে রাখা আছে কৃত্রিম ফুল, মালা, রেজিস্টার খাতা ও নোটবুক। রয়েছে হাল ফ্যাশনের ভ্যানিটি ব্যাগ, টিস্যুবক্স ও প্লাস্টিকের খেলনা। বাদ পড়েনি কার্পেট ম্যাটরেসও। আর ক্রেতাদেরও বেশ আগ্রহের সঙ্গে এসব পণ্য কিনতে দেখা গেছে।

এদিকে কারাপণ্য প্যাভিলিয়নে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্যাভিলিয়নে প্রতিটি মোড়া বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮৫০ টাকা। সিংহাসন চেয়ার আড়াই হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। কুলা ও চালনি ১০০ থেকে ৩০০ টাকা। ফুল ও ফলের ঝুড়ি ১০০ থেকে ২৫০ টাকা। পানদানি এবং কমলদানি ও ফুড কভার ৩০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া টিশার্ট ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। নকশিকাঁথা আড়াই হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। বুটিক ও বাটিকের থ্রিপিস ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকা। গামছা ও লুঙ্গি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। বেডশিট ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্য ছাড়াও পাটের তৈরি বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ ১২০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েদিদের কাঠের তৈরি খাট ২২ হাজার টাকা, আলমারি ও ওয়্যারড্রব ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। ড্রেসিং টেবিল ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কারাপণ্যের সাশ্রয়ী দাম এবং মান ভালো হওয়ায় চাহিদা রয়েছে অনেক। যারা একবার কারাপণ্য ব্যাবহার করেছেন তারা সেই পণ্য সংগ্রহ করার জন্য কারাগারে ছুটে যান। এদিকে এই কারাপণ্য শুধু বিভিন্ন কারাগারের স্টলেই পাওয়া যায়। কারো প্রয়োজন হলে তাকে এই পণ্যের জন্য কারাগারে যেতে হয়। কারাগার ছাড়া রাজধানীসহ সারাদেশে কোন শোরুম নেই কারাপণ্যের।

কারাপণ্যের বাইরে কোন শোরুম না থাকায় এই পণ্যের ক্রেতাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা যায়। খিলগাও থেকে কারাপণ্যের স্টলে আসা বেসরকারী চাকুরিজীবী সালাউদ্দিন বলেন, আমি বাণিজ্য মেলায় আসলেই এই স্টলে আসি। কারাপণ্যের মানগুলো অনেক ভালো। আমি মেলায় আসলেই একানকার পণ্য কিনি। কিন্তু মেলা ছাড়া বাইরে কোথাও এই কারাপণ্য পাওয়া যায় না। তাই কিনতে চাইলেও কিনতে পারি না।

কারাপণ্যের স্টলে আসা সোলায়মান নামের এক ব্যবসায়ী জানান, রাজধানীতে কারাপণ্যের কোন শোরুম থাকলে অনেকেই এতে আকৃষ্ট হবে। অনেকেই এই পণ্য পছন্দ করেন। আমি আশা করবো কারাপণ্যের একটি শোরুম হবে ঢাকায়।

কারাপণ্যের স্টলে দায়িত্বে থাকা ডেপুটি জেলার মাসুদ ভিকি বলেন, সশ্রম কারাদন্ড প্রাপ্ত বন্দীরাই এইসব পণ্য তৈরি করে। এত তাদের সাজা কিছুটা মওকুফ হয়। পাশাপাশি তারা একটি কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকে। এবং এই পণ্য বিক্রির লাভের একটা অংশ কারাবন্দীরাও পান। পাশাপাশি তারা একটি কাজ শিখতে পারেন। অনেকেই কারাগার থেকে বেরিয়ে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ব্যবসাও করছেন।

তিনি বলেন, যেহেতু এসব পণ্য উৎপাদনে শ্রমের দাম কম, তাই পণ্যের দাম অন্যান্যদের চেয়ে বেশ কম। সে কারণে ক্রেতাদের আগ্রহও ভালো। আমরা কারাগারের দোকানগুলোতেই এইসব পণ্য বিক্রি করি। এছাড়া কেউ যদি অর্ডর দেয় তাহলে আমরা পণ্য তৈরি করে দেই। মেলা উপলক্ষে গত তিন চার বছর ধরে বানিজ্য মেলায় আসছি।

ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে কোন কারাপণ্যের শোরুম দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখনও এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। আর আমরাও এখনো খুব বেশি সেভাবে উৎপাদনে যেতে পারিনি। যেহেতু বাইরে কারাপণ্যের ভালো চাহিদা রয়েছে তাই বিষয়টি ভেবে দেখা হবে।

কারাগারকে এখন আর শাস্তি প্রদানের জায়গা বিবেচনা করা হয় না। বলা হয় সংশোধনাগার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কারাবন্দীদের বিভিন্ন কাজে লাগানো হয়। জেলের মধ‌্যেই তাদের দিয়ে বিভিন্ন পণ‌্য উৎপাদন করানো হয়। এর একটি উদ্দেশ‌্য মুক্ত জীবনে তারা যেন অলস সময় না কাটায় বা ভালোভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।

২০১৮ সালে চীনের কারাগারগুলোতে মোট বন্দীর সংখ্যা ছিল ১.৭ মিলিয়ন। সেখানকার আইনানুযায়ী শাস্তি হিসেবে বন্দীদের কাজ করতে বাধ্য করা হতো। প্রতিদিন একজন বন্দীকে ৮ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। তবে এর সঙ্গে তাদের নৈতিক শিক্ষাও দেয়া হতো। যুক্তরাষ্ট্রেও কারাবন্দীরা উৎপাদনকাজে শ্রম দেয়।

কারাগারে যেসব পণ্য তৈরি হয় তারম্যেধ্য কোনটি হস্তশিল্পের তৈরি, আবার কোনটি তৈরি করা হয়েছে যন্ত্রের সাহায‌্য নিয়ে। প্রতিটি পণ‌্যের গায়ে নির্দিষ্ট মূল্য ও উৎপাদনের স্থান উল্লেখ করা আছে। দৃষ্টিনন্দন এসব পণ্য নজর কাড়ছে মেলায় আগত দর্শনার্থীদের।

কারাবন্দীর শ্রম কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে সরকার কারা-অভ্যন্তরে কয়েদীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। এ লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ করাগারে চালু হয়েছে একটি গার্মেন্টস কারখানা। এছাড়া দেশের অন্যান্য কারাগারগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপণ্য উৎপাদন শুরু হয়েছে। সেখানে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীসহ বিচারাধীন বন্দীরাও অংশগ্রহণ করছেন উৎপাদন কার্যক্রমে। বিভিন্ন কারাগারে কারা পুলিশের স্টলে এসব পণ্য বিপণন হচ্ছে। বিক্রিত পণ্যের অর্ধেক লভ্যাংশ পাবেন উৎপাদনকারী বন্দীরা।

অর্থসূচক/এমআরএম/এমএস

এই বিভাগের আরো সংবাদ