ঝুঁকিতে ঋণ অধিগ্রহণ
রবিবার, ৫ই জুলাই, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » অর্থনীতি

ঝুঁকিতে ঋণ অধিগ্রহণ

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৫৬টি ঋণ অধিগ্রহণ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। যার অংক প্রায় ৩ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। তবে বর্তমানে এসব ব্যাংকের সুদাসলে ৫ হাজার ২০১ কোটি টাকা ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে তিন ব্যাংকের খেলাপি হয়ে পড়েছে ১ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। যার সিংহ ভাগই জনতা ব্যাংকের।

ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণ অধীগ্রহণকে ব্যাংকি পরিভাষায় ‘লোন টেকওভার’  বলা হয়। অর্থাৎ এক ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাকে অন্য ব্যাংক পেতে চায়। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের সাবেক ব্যাংকের থাকা সব দায়-দেনা পরিশোধ করে দেয় বর্তমান ব্যাংক। এভাবে ঋণ অধীগ্রহণে আইনগত কোনো বাধা নেই। কিন্তু এই পদ্ধতির অপব্যবহার হচ্ছে।  এটা কয়েক বছর আগে সব চেয়ে বেশি ছিল। তখন এক ধরণের অসম প্রতিযোগিতা লেগে যায় ব্যাংকারদের মধ্যে। এক ব্যাংকের গ্রাহক অন্য ব্যাংক নানা প্রলোভন দেখিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে যেত। কিছু ক্ষেত্রে কমিশন বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কমিশন খেয়ে খেলাপি ঋণ অধীগ্রহণেরও অভিযোগ উঠে তখন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঙ্খিত পর্যায়ে আদায় না হওয়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে অধীগ্রহণকৃত ঋণগুলো। সব চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে জনতা ব্যাংক। কারণ ব্যাংকটির অধীগ্রহণকৃত ঋণের এক টাকাও আদায় হয়নি। উল্টো খেলাপির বোঝা ভারি হচ্ছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, লোন টেকওভার বা ঋণ অধীগ্রহণ খারাপ কিছু নয়। ব্যাংক আর গ্রাহকের সম্পর্কের ভিত্তিতে এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে যেতে পারে বা নিতে পারে। কিন্তু সেটা হতে হবে ভালো ঋণ। কোনো খেলাপি ঋণ অধীগ্রহণ করার সুযোগ নেই। যদি কেউ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায় তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৩২টি ঋণ অধীগ্রহণ করেছে জনতা ব্যাংক। যা প্রায় ৯৮৫ কোটি টাকা। বর্তমানে তা সুদাসলে ২ হাজার ৭৭০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে মন্দমানের খেলাপি হয়ে পড়েছে ১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। যা আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে বিন্দু পরিমাণও ব্যাংকিং ছিল না। হয়েছে কেবল জালিয়াতি। ঋণ অধীগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো যাচাই-বাছাই করা হয়নি। ব্যক্তি পর্যায়ে সুবিধা ছাড়া এ ধরণের ঋণ অধীগ্রহণের সুযোগ নেই। কেউ কেউ বলছেন,  কী এমন ঋণ অধীগ্রহণ করেছে জনতা; যে এক টাকাও আদায় হবে না! এখানে বড় ধরণের শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখলে কেচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে। জনগণের করের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং পরিচালনা পর্ষদ। কোনোভাবেই এ দায় এড়াতে পারেন না তারা।

জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, এটা অনেক পুরোনো ঘটনা। ২০০৯, ১০, ১১ ও ১২ সালে অধীগ্রহণ করা হয়েছে এসব ঋণ। অনেক চেষ্টা করেও আদায় করা যাচ্ছে না।

শুধু জনতা ব্যাংক একা নন, এ ধরণের ঋণ অধীগ্রহণ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকও। তবে এসব ব্যাংকে জনতার মতো বাছ-বিচার ছাড়া ঋণ কেনা হয়নি। সোনালী ব্যাংক চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৫টি ঋণ অধীগ্রহণ করেছে। টাকার অংক ৫৩০ কোটি টাকা। বর্তমানে ঋণস্থিতি ১৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত ৩৫০ কোটি টাকা আদায় করেছে সোনালী ব্যাংক। তবে বকেয়া থাকা ঋণের মধ্যে ১২৩ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে ব্যাংকটির।

অগ্রণী ব্যাংক জুন পর্যন্ত ৯টি ঋণ অধীগ্রহণ করেছে। টাকার অংকে ১৫৩ কোটি টাকা। সুদাসলে বর্তমান স্থিতি ২৪৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ কোনো টাকা আদায় হয়নি। এর মধ্যে খেলাপি আছে ৯৮ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শামস উল ইসলাম বলেন, ৯টি ঋণ অধীগ্রহণ করা হয়েছে আমি দায়িত্ব নেয়ারও আগে। আমার মেয়াদে মাত্র দু’টি ঋণ অধীগ্রহণ করেছি। এগুলো ভালো, কোনো অসুবিধা হবে না। আগের ঋণগুলো আদায়ের চেষ্টা করছি।

রূপালী ব্যাংক জুন পর্যন্ত ঋণ অধীগ্রহণ করেছে ১০টি। টাকার অংকে যা ২ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। কিছু টাকা আদায়ের পর বর্তমান ঋণস্থিতি ২ হাজার ৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির অধীগ্রহণকৃত ঋণে কোনো খেলাপি নেই। তাই অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে আছে রূপালী ব্যাংক। তবে খেলাপি না হলেও আদায় সন্তোষজনক নয়। সে ক্ষেত্রে ঝুঁকিমুক্ত বলার সুযোগ নেই।

অর্থসূচক

এই বিভাগের আরো সংবাদ