ArthoSuchak
বৃহস্পতিবার, ৯ই এপ্রিল, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

রপ্তানিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পাটশিল্প

দিন দিন বাড়ছে পাটপণ্যের ব্যাবহার। আর এই পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাটকে আরও কত আকর্ষণীয়ভাবে ব্যবহার করা যায় সেটাই বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে রপ্তানি আয় বাড়াতে সরকারি উদ্যোগ, পাটপণ্যের বৈচিত্রায়ন, মানসম্পন্ন কাঁচামালের সহজলভ্যতা ও শক্ত ব্যবস্থাপনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে থাকা পাটশিল্প এবার রপ্তানিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য খাদ্যগুলো যখন পণ্য রপ্তানিতে খারাপ সময় পার করছে সেই সময়ে গত বছরের তুলনায় পাটপণ্য রপ্তানিতে সাড়ে ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এছাড়া লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই বহুল আলোচিত খাতটি ২৭ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর ছয় মাসে পাটপণ্য রপ্তানিতে ৫১ কোটি ১৭ লাখ ডলার আয় করেছে। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। আর চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে সক্ষমতার অভাবকে এই খাতের মূল সমস্যা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পাট খাতের রপ্তানি আয় কমেছিল ২০ শতাংশ। ওই সময়ে ৮১ কোটি ৬২ লাখ ডলারের পাটপণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ, যা আগের অর্থবছরের (২০১৭-১৮) অর্থবছরের তুলনায় অনেক কম। ওই অর্থবছরে (২০১৭-১৮) মোট ১০২ কোটি ২৬ লাখ টাকার পাটপণ্য রপ্তানি হয়।

বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান আবদুর রউফ বলেন, পাটপণ্য উৎপাদনে এবং রপ্তানিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর খুব ভালো অবদান রয়েছে। তবে পাটপণ্য রপ্তানিতে ভালো অবস্থানের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো অবদান রেখেছে। বেসরকারি খাতের ভালো অবদানের ফলে রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সেক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আগের অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব মার্কেটে পাটপণ্যের একটি বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে অনেক ভালো করা যাবে। আমাদের পাটের ডোমেস্টিক একটা বিশাল মার্কেট হয়েছে। আমরা যেটাকে কাজে লাগাতে পারছি না। এটাকে কাজে লাগাতে পারলে একটা ভালো অবস্থানে যাওয়া যাবে।

তবে পাট পণ্যের নতুন নতুন উপযোগ এখানে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি নতুন পাটপণ্য বাজারে আসতে চলেছে। যা বিশ্ববাজারে একটি ভালো প্রভাব ফেলবে। এ সম্পর্কে বিজেএমসি চেয়ারম্যান বলেন, নতুন এই পণ্যগুলো নিয়ে এখনও আমরা উৎপাদনে যেতে পারি নাই। এক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগবে। এ পণ্যগুলোকে মার্কেটে নিয়ে যেতে হলে এর উৎপাদন খরচ কমাতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশ জুট গুডস এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি লুৎফুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পাট সুতার দাম বাড়া ও ডলারের ভ্যালুয়েশন এই দুটো কারণেই পাট খাতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তবে এই খাতটি এখনও শঙ্কামুক্ত নয়। পাট খাতে সামান্য প্রবৃদ্ধি হলেও ভালো নেই রপ্তানিকারকরা। পলিথিনের সহজলভ্যতার কারণে পাটের দিকে মানুষের আগ্রহ কম।

দেশের রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে পোশাক ও চামড়া খাতের পরই পাট খাতের অবস্থান। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) তথ্যমতে, ২০১৭ সালে ৯ দশমিক ২ মিলিয়ন বেল পাট উৎপাদন হয়েছিল, যা ২০১৬ সালের চেয়ে ৫ মিলিয়ন বেল বেশি। দেশের বাজারে ২৪০ প্রকারের পাটপণ্য উৎপাদন হয়ে থাকে। গড়ে প্রতি বছর ৬ লাখ ৬৩ হাজার ইউনিট পণ্য উৎপাদিত হয়।

ভারতের অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে পাটপণ্য রপ্তানিতে মন্দাভাব বিরাজ করছিল বহুদিন থেকেই। তবে রপ্তানি উন্নয়ন বু্রোর (ইপিবি) তথ্য বলছে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ।

পাট খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় পোশাক খাত থেকে হলেও পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির গুরুত্ব অনেক বেশি। পোশাক খাত থেকে অর্জিত রপ্তানি আয়ের বড় অংশ চলে যায় কাঁচামাল আমদানিসহ কনসালটেন্সি ফি ও অন্যান্য সেবা বাবদ। অন্যদিকে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি আয়ের পুরো অংশই দেশে থেকে যায়। তাই এ বিষয়ে সরকার ও পাট খাতের সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদন যেহেতু শ্রমঘন তাই এ খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

জানা গেছে, ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশের জনগণ প্রাকৃতিক তন্তু ব্যবহারের প্রতি সচেতন হওয়ায় সেখানে পাটপণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে মোট ২২টি পাটকল চালু রয়েছে এবং বেসরকারি খাতে প্রায় ২০০ পাটকল আছে। বর্তমানে আফগানিস্তান, আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, বেনিন, ব্রাজিল, বুলগেরিয়া, কানাডা, চিলি, চীন, কংগো, কোস্টারিকা, মিসর, ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, ইথোপিয়া, গাম্বিয়া, জার্মানি, গোয়েতেমালা, হাইতি, ভারত, আয়ারল্যান্ড, ইরান, জাপান, জর্ডান, কোরিয়া, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, মরক্কো, মিয়ানমার, নেদারল্যান্ড, পাকিস্তান, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, রোমানিয়া, রাশিয়া, সৌদি আরব, সুদান, দক্ষিণ আফ্রিকা, তাইওয়ান, তাজাকিস্তান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনামে বাংলাদেশ পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি করছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য মোট ৮২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পাটপণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ইপিবি। এর মধ্যে ৫১ কোটি ১৭ লাখ ডলারের পাটপণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। তবে রপ্তানি বাড়াতে পণ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন জুট মিলস করপোরেশনের কর্মকর্তারা। বিশ্বের ৫০টি দেশে পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। রপ্তানি বাড়াতে নতুন বাজার খোঁজার প্রয়োজন দেখছে জুট মিলস করপোরেশন।

এদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি আয় বাড়লেও পূরণ হয়নি লক্ষ্যমাত্রা। নভেম্বরে যেখানে মোট রপ্তানি আয় হয়েছিল ৩০৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার, সেখানে ডিসেম্বরে আয় বেড়ে হয়েছে ৩৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আর এ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। তবে অর্থবছরে প্রথম কয়েক মাসের তুলনায় আলোচ্য মাসে আয় বেশি হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের (জুলাই-ডিসেম্বর) ১ হাজার ৯৩০ কোটি ২১ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ২১ শতাংশ কম। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমেছে ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে ১ হাজার ৬০২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ কম। একই সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কমেছে ১৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

অর্থসূচক/এমআরএম/এএইচআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ