খুবই চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে সিমেন্ট খাতঃ মাসুদ খান
রবিবার, ১৭ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page
অর্থসূচকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতকারে ক্রাউন সিমেন্টের সিইও

খুবই চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে সিমেন্ট খাতঃ মাসুদ খান

মাসুদ খান দেশের একজন প্রথিতযশা চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। একাধারে তিনি একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট এবং কস্ট ও ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট।  পেশাগতভাবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সিমেন্ট শিল্পের সঙ্গে আছে। বর্তমানে এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি লিমিটেডের (ক্রাউন সিমেন্ট) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ খান ১৬ বছরেরও বেশি সময় বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিম এর প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগেও তিনি বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি বহুজাতিক কোম্পানি গ্ল্যাক্সো স্মিথক্লাইন বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ম্যারিকো বাংলাদেশসহ কয়েকটি কোম্পানিতে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে পর্ষদে আছেন। সম্প্রতি অর্থসূচককে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে দেশের সিমেন্ট খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ো আলোকপাত করেছেন। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার জয়নাল আবেদিন ও কমিউনিকেশন অফিসার আনিকা হোসেন ভুইয়া

আপনি দীর্ঘদিন ধরে সিমেন্ট শিল্পের সঙ্গে আছেন। দেশে সিমেন্ট খাতের বর্তমান চিত্র কেমন?

বর্তমানে দেশের বাজারে সিমেন্টের চাহিদা আছে কিন্তু মুনাফার হার কম। কারণ বর্তমানে দেশে সিমেন্টের চাহিদার চেয়ে মোট উৎপাদনক্ষমতা অনেক বেশি। বর্তমানে দেশের সিমেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর মোট ইফেক্টিভ ক্যাপাসিটি ৫ কোটি ৮০ লাখ টন। কিন্তু গত বছর সিমেন্টের চাহিদা ছিল ৩ কোটি ১০ লাখ টন। উৎপাদনক্ষমতা ও চাহিদার মধ্যে এত একটি বড় পার্থক্য সত্ত্বেও সবাই নিজেদের মতো করে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। আমরাও বাড়িয়েছি। যার কারণে দামের উপর একটা চাপ রয়েই গেছে। তাছাড়া অন্যান্য বছর একটি পিক পিরিয়ড (জানুয়ারি-মার্চ) ছিল। যে সময়ে সিমেন্টের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। চাহিদার বড় উল্লম্ফনের কারণে কোম্পানিগুলো কিছুটা বাড়তি দামে সিমেন্ট বিক্রি করতে পারে। মৌসুম শেষে আবার ধীরে ধীরে দাম কমে আসে। নানা কারণে এবছর পিক পিরিয়ড বলতে কিছু ছিল না। বরং ওই সময়েও অফার বা ছাড় দিয়ে সিমেন্ট বিক্রি করতে হয়েছে।

সিমেন্টের মূল্য কমে গেলেও কাঁচামালের মূল্য কিন্তু বেড়েছে। ক্লিংকার, ফ্লাই অ্যাশসহ প্রায় সব কাঁচামালের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য হ্রাস ও ব্যাংক ঋণের সুদহারের কারণে মুনাফার হারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আগে ৯০ শতাংশ ক্লিংকার ভিয়েতনাম থেকে বাংলাদেশে আমদানি হলেও এখন ইন্দোনেশিয়া, সৌদিআরব, লিবিয়া, ওমান ও ইরান থেকে সিমেন্টের এই মূল উপাদান আমদানি করা শুরু হয়েছে।

Masud-khanদেশে সিমেন্টের চাহিদা কি হারে বাড়ছে?

গত বছর সিমেন্টের চাহিদায় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ শতাংশ। কিন্তু এ বছর তা মাত্র ৮ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় অর্ধেক। তবে দুই বছরের গড় করলে ১২ শতাংশ দাঁড়ায়। আমরা মনে করি ১২ শতাংশ গ্রোথ আমাদের জন্য খুব ভালো। কিন্তু চাহিদায় প্রবৃদ্ধি হলেও মার্জিন (Margin) বা মুনাফার হার কিন্তু বাড়ছে না। বরং কিছুটা কমছে। কারণ আগেই বলেছি। চাহিদার তুলনায় উৎপাদনক্ষমতা বেশি হয়ে যাওয়ায় মার্জিনের উপর প্রভাব পড়েছে।

বর্তমানে অনেক কোম্পানি তার উৎপাদনক্ষমতার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করতে পারছে না বলে জানা যায়। এর পরও সবাই উৎপাদনক্ষমতা বাড়াচ্ছে বলে জানালেন আপনি। এভাবে উৎপাদনক্ষমতা বাড়লে কিছু কারখানা তো রুগ্ন হয়ে যেতে পারে। অসুস্থ প্রতিযোগিতায়  ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ভালো কোম্পানিগুলোও। আপনার কী মনে হয়?

উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির এই প্রবণতা অবশ্যই সিমেন্ট খাতের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোমধ্যেই এই খাত বেশ চাপে পড়েছে। তবে তুলনামুলক ছোট কোম্পানিতে চাপটা বেশি। সবাইকে একটা বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে যে, শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই চলবে না। সেবাটা সম্পূর্ণ করতে হলে শুরু থেকে জেড পর্যন্ত নিশ্চিত করতে হবে। এখন যেসব ছোট কোম্পানি আছে তারা রীতিমতো সংগ্রাম করছে। কারণ ক্লিংকার কিনতে পারলেও পরিবহণ খরচ তাদের জন্য একটা বড় বাধা। যেসব বড় কোম্পানির নিজস্ব জাহাজ আছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো তারা দিন দিন আরও বড় হচ্ছে। আর ছোট কোম্পানিগুলো আরও চাপের মুখে পড়ছে।

কিছু মেগা প্রকল্পের কারণে সিমেন্টের চাহিদায় বড় ধরনের উল্লম্ফন হয়েছে। মূলত মেগা প্রকল্পকে সামনে রেখে প্রায় সব বড় কোম্পানি উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছে বা বাড়াচ্ছে। প্রকল্পগুলো শেষ হয়ে গেলে চাহিদার তো বড় ধরনের পতন হতে পারে। তখন কী বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি হবে না?

আমি মনে করি সিমেন্টের এই বর্ধিত চাহিদা অনেক বছর থাকবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের মাথাপিছু সিমেন্ট ব্যবহারের পরিমাণ অনেক কম। উন্নত দেশে উন্নীত হতে গেলে সিমেন্টের ব্যবহার বাড়তেই হবে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদেরকে আরও অনেক বড় বড় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তাই বর্তমানে চলমান বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কাজ শেষ হওয়ার আগেই আরও অনেক প্রকল্প চলে আসবে। যেমন মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ও চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের ইপিজেডকে কেন্দ্র করে প্রচুর বিনিয়োগ আসছে। সুতরাং অবকাঠামো খাতে ব্যবহৃত পণ্যের চাহিদা কমবে না। এটা বাড়তেই থাকবে।

আমাদের সিমেন্ট শিল্পের প্রয়োজনীয় ক্লিংকারের বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। এখানে ক্লিংকার ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার সুযোগ কতটুকু আছে?

বাংলাদেশে ক্লিংকার ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠার সম্ভাবনা খুবই কম। এর প্রধান কারণ হচ্ছে ক্লিংকারের প্রধান উপাদান বা কাঁচামাল লাইমস্টোন (চুনাপাথর) এর নিজস্ব যোগান নেই আমাদের। ক্লিংকার ইন্ডাস্ট্রি করতে হলে লাইমস্টোনের চাহিদার পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। কিন্তু লাইমস্টোন আমদানি করে ক্লিংকার উৎপাদন করে বাজারজাত করতে যে খরচ হবে সরাসরি ক্লিংকার আমদানি করলে তার চেয়ে কম খরচ পড়বে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের কোনো কোনো জায়গায় লাইমস্টোনের সন্ধান পাওয়া গেলেও সেগুলো ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ মিটার বা তারচেয়ে বেশি নিচে অবস্থিত। এই লাইমস্টোন উত্তোলন করতেও অনেক খরচ পড়ে যাবে বলে তা লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

এমআই সিমেন্ট তো দেশের প্রথম সিমেন্ট কোম্পানি, যেটি ভারতে সিমেন্ট রপ্তানি করছে। রপ্তানির বাজার বাড়ানোর আরও কোনো সুযোগ আছে বলে কী মনে করেন?

নানা কারণে ভারতের সেভেন সিস্টারস নামে পরিচিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ছাড়া সিমেন্ট রপ্তানির সুযোগ খুবই কম। কারণ সিমেন্ট খুবই ভারি একটি পণ্য। রপ্তানি করতে গেলে এর জাহাজ ভাড়া পড়ে যাবে অনেক বেশি, যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিয়োগিতার সক্ষমতা থাকবে না।

আমরা মূলত ভারতের ত্রিপুরায় সিমেন্ট রপ্তানি করি। এটি পারছি কারণ ত্রিপুরার আশেপাশে কোনো সিমেন্ট প্ল্যান্ট (কারখানা) নেই। কাছাকাছি সিমেন্ট প্ল্যান্ট আছে মেঘালয়ে অবস্থিত। কিন্তু পার্বত্য এই অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয় বলে সেখান থেকে সিমেন্ট ত্রিপুরায় পাঠানো খুব একটা সহজ নয়। আর আমাদের সিমেন্ট মানের দিক থেকে ওই সিমেন্টের চেয়ে অনেক অনেক দূর এগিয়ে। তবে সেভেন সিস্টারসে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে নানামুখী কাজ চলছে। তাই আগামী দিনে ত্রিপুরার পাশাপাশি বাকি ৬ রাজ্যেও আমাদের ক্রাউন সিমেন্ট রপ্তানি করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি। সেভাবে প্রস্তুতও হচ্ছি আমরা।

ক্রাউন সিমেন্ট নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?

ক্রাউন সিমেন্ট তার ব্যবসা সম্প্রসারণের নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। আমাদের মূল সিমেন্টের উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে শীর্ষে উঠে আসা। পাশাপাশি বাল্ক সিমেন্ট হ্যান্ডেলিং এ আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি। সক্ষমতা বাড়াচ্ছি। লজিস্টিকসটা আরও ভালোভাবে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছি। এরই সাথে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও মনোযোগ দিচ্ছি।

সম্প্রতি নতুন অর্থবছরের বাজেট কার্যকর হয়েছে। সিমেন্ট খাতে এই বাজেটের বিশেষ কোনো প্রভাব পড়বে কী?

যে কোনো শিল্পের জন্য জাতীয় বাজেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যেসব আর্থিক ব্যবস্থা নেয় শিল্পের উপর তার একটি বড় প্রভাব পড়ে। আর্থিক ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে একটি থাকে আমদানি পর্যায়ে, অন্যটি স্থানীয় পর্যায়ে। এবারের বাজেটে এ্যাডভান্স ট্যাক্স নামে ৫ শতাংশ আগাম ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে মূল্য সংযোজনের বিপরীতে তা সমন্বয়ের সুযোগ আছে। কিন্তু এতে দুটি সমস্যা রয়েছে। প্রথমত আগাম ভ্যাট দেওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ ক্যাশ প্রয়োজন, এতে কোম্পানির ক্যাশ ফ্লোতে চাপ পড়বে। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশে ভ্যাট বা ট্যাক্স ফেরত পাওয়ার কাজটি সহজ নয়।

মাল আমদানি করার সময় উৎসে কর দিতে হয় ৫ শতাংশ। এছা মাল প্রস্তুত করার সময়ও কছিু আগাম ট্যাক্স টাকা হয়। সব মিলিয়ে যা ৭ থেকে ৮ শতাংশ হয়ে যায়। এই ট্যাক্সটা হবে মিনিমাম ট্যাক্স। এটি পুষিয়ে নিতে হলে গ্রস প্রফিট মার্জিন হতে হবে ৪০ শতাংশ, যা খুবই দরুহ ।

এই বিভাগের আরো সংবাদ