ArthoSuchak
শনিবার, ৪ঠা এপ্রিল, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page
বোনাস-রিজার্ভে কর নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

‘পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক’- ‘বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে’

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বোনাস লভ্যাংশ ও রিজার্ভে কর আরোপ সংক্রান্ত সংশোধিত প্রস্তাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। পুঁজিবাজারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত স্টেকহোল্ডারদের বেশিরভাগ সংশোধিত প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে অর্থনীতিবিদসহ কোনো কোনো স্টেকহোল্ডারের মতে, লভ্যাংশ ও বোনাসে কর আরোপের প্রস্তাব কার্যকর হলে বেসরকারি বিনিয়োগ, বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। তাদের মতে, কোম্পানি ব্যবস্থাপনার ব্যাষ্টিক পর্যায়ে রাষ্ট্রের এমন নিয়ন্ত্রণ না থাকা-ই ভালো।

উল্লেখ, গত ১৩ জানুয়ারি ২০১৯-২০ অর্থবছরের ঘোষিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল বোনাস লভ্যাংশ এবং নির্দিষ্ট সীমার অতিরিক্ত রিজার্ভের উপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করার প্রস্তাব করেন। আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে এই প্রস্তাব দুটির কিছু সংশোধনের প্রস্তাব করেন।

Rakib-Mansur-Shakil-Nasir.jpg

 

অর্থমন্ত্রী ঘোষিত বাজেটে বোনাস লভ্যাংশের উপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করেছিলেন।পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানির রিটেইন্ড আর্নিংস ও রিজার্ভের সমষ্টি মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি হলে বাড়তি অঙ্কের উপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুসারে,কোনো কোম্পানি নগদ লভ্যাংশের সমপরিমাণ বোনাস দিলে বোনাসের উপর কর দিতে হবে না।আর শুধু বোনাস দিলে অথবা নগদ লভ্যাংশের চেয়ে বেশি বোনাস দিলে ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।অন্যদিকে নিট মুনাফার ৭০ শতাংশের বেশি রিটেইন্ড আর্নিংস ও রিজার্ভ হিসেবে স্থানান্তর করা না হলে তার জন্য কোনো কর দিতে হবে না।কিন্তু ৭০ শতাংশের বেশি স্থানান্তর করা হলে ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

মোঃ রকিবুর রহমান

বোনাস ও রিজার্ভে করের সংশোধনী প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মো: রকিবুর রহমান। তিনি এই প্রস্তাবকে পুঁজিবাজারের জন্য যুগান্তকারী হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এর ফলে বিনিয়োগকারীরা আবার বাজারমুখী হবেন।

রকিবুর রহমান বলেন, এতদিন যেসব অসাধু কোম্পানি বিনিয়োগকারীদেরকে বোনাসের নামে শুধু কাগজ ধরিয়ে দিত, সেগুলো এখন একটু চাপে পড়বে। তারা বিনিয়োগকারীদেরকে নগদ লভ্যাংশ দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু ভালো কোম্পানিগুলোর উপর এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

তিনি বলেন, রিজার্ভে করের নতুন প্রস্তাবের ফলে কোম্পানিগুলো বেশি করে লভ্যাংশ দিতে বাধ্য হবে। এতদিন অনেক কোম্পানি অকারণেই মুনাফার বড় অংশ রিজার্ভে সরিয়ে নিত। অনেক কোম্পানিতে শত শত কোটি টাকা রিজার্ভ আছে, কিন্তু তারা ব্যবসা সম্প্রসারণে যায়নি। তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বঞ্চিত করে এমন রিজার্ভ বাড়িয়ে কি লাভ?

রকিবুর রহমান বলেন, নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাজার গতিশীল হবে।

তিনি বলেন, অনেকে বোনাস শেয়ারের সুযোগ রাখার যুক্তি হিসেবে গুগল, অ্যাপল এর উদাহরণ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এই উদাহরণে বাস্তবতা প্রতিফলিত হয় না। অ্যাপল বোনাস দিলেও বোনাসের কারণে কখনো শেয়ারের দাম পড়ে যায়নি, বিনিয়োগকারীরা বোনাসের পরও ক্যাপিটাল গেইন পেয়েছেন। কিন্তু এখানে তো বোনাস দিলে শেয়ারের দাম কমে যায়। তাই বোনাস দিলে কোম্পানিগুলোকে এমনভাবে বোনাস দেওয়া উচিত, যাতে শেয়ারের দামে তার নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।

আহসান এইচ মনসুর

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক বোনাস লভ্যাংশ ও রিজার্ভের উপর কর আরোপের প্রস্তাবকে একটি ভুল প্রস্তাব মনে করেন। তার মতে, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি মনে করেন, কোম্পানি ব্যবস্থাপনার ব্যাষ্টিক পর্যায়ে রাষ্ট্রের এমন নিয়ন্ত্রণ না থাকা-ই ভালো। কোম্পানি পরিচালনায় যদি উদ্যোক্তাদের স্বাধীনতা না থেকে, চারদিক থেকে আটসাট পরিবেশ সৃষ্টি করা হয় তাহলে তারা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ হারাবেন। এমনকি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতেও তাদের আগ্রহ কমে যাবে।

বিনিয়োগকারীদের কাছে নগদ লভ্যাংশের চাহিদা প্রসঙ্গে বলেন, অবশ্যই বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গীতে ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু তাদের জন্যও বিকল্পও আছে। যারা নগদ লভ্যাংশ বেশি পছন্দ করেন, তারা যেসব কোম্পানি বেশি হারে নগদ লভ্যাংশ দেয়, সেগুলোতে বিনিয়োগ করতে পারেন। আবার যারা দীর্ঘ মেয়াদী বিনিয়োগ করতে চান তারা যেসব কোম্পানির প্রবৃদ্ধি আছে, যারা ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে রিজার্ভ বাড়িয়ে মূলধনভিত্তি শক্ত রাখতে চায়, সে কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হলে না উদ্যোক্তাদের কাছে সহজ বিকল্প থাকবে, না বিনিয়োগকারীদের কাছে।

শাকিল রিজভী

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) এর সভাপতি মোঃ শাকিল রিজভী সংশোধিত প্রস্তাবকে ইতিবাচক ও বিনিয়োগকারীবান্ধব হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেছেন, বোনাস ও রিজার্ভে করের নতুন হার কার্যকর হলে হলে কোম্পানিগুলোর মধ্যে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার প্রবণতা বাড়বে। এতে বিনিয়োগকারীরা লাভবান হবেন। সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তিনি আরও বলেন,বেশিরভাগ ভাল কোম্পানির মধে ্য নগদ দিয়ে থাকে। বহুজাতিক ক‌োম্পানিগুলো বোনাস লভ্যাংশ দেয় না বললেই চলে। গত ৬/৭ বছরে যে সব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে,যেগুলোর মৌলভিত্তি তুলনামুলক দুর্বল,সেগুলোর মধে ্য বোনাস দেওয়ার প্রবণতা বেশি।

ডিবিএ  সভাপতি বলেন,কোম্পানির প্রবৃদ্ধি নেই, ব্যবসার জন্য দরকার নেই, তবু বোনাস দেওয়া হয়েছে মালিকদের শেয়ার বেচার সুবিধার্থে।এখন এই  প্রবণতা একটু কমবে আশা করা যায়।

মোঃ ছায়েদুর রহমান

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মোঃ ছায়েদুর রহমানের দৃষ্টিতে বোনাস লভ্যাংশ ও রিজার্ভের উপর করের সংশোধিত হার মন্দের ভালো। আগের প্রস্তাবের চেয়ে এটি কিছুটা ভালো।

তিনি বলেন, নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার শর্তসাপেক্ষে বোনাসে কর অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগের কারণে কোম্পানিগুলো বোনাসের পাশাপাশি নগদ লভ্যাংশও দেবে। যারা স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে বিনিয়োগ করেন তাদের জন্য লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু বোনাস নিরুৎসাহিত করার কারণে কিছু দুর্বল কোম্পানির অসাধু কর্মকাণ্ডে লাগাম পড়ার পাশাপাশি সত্যিকার অর্থে ভালো কোম্পানি, যাদের প্রবৃদ্ধি হার ভালো, ব্যবসা সম্প্রসারণের অনেক সুযোগ আছে, সেগুলোও কিন্তু কিছুটা চাপে পড়বে। তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের ব্যয় বেড়ে গেলে মুনাফার হার কমে যাবে।

তিনি আরও বলেন, গুগল, অ্যাপলসহ অনেক কোম্পানি কিন্তু বছরের পর বছর নগদ লভ্যাংশ দেয়নি। কোম্পানির টাকা পে-আউটের মাধ্যমে বেরিয়ে না গিয়ে কোম্পানিতে থেকে যাওয়ায় সে কোম্পানিগুলো এত বড় হতে পেরেছে। ওয়ারেন বাফেটের কোম্পানি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে এ যাবতকালে মাত্র একবার নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে।

তবে তিনি বলেন, আমাদের বেশিরভাগ বিনিয়োগকারীর চাওয়া ছিল নগদ লভ্যাংশ। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে নতুন কর কাঠামো তাদের জন্য ভালোই হয়েছে। তাছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও নগদ লভ্যাংশ পছন্দ করে। সব মিলিয়ে খারাপ নয়।

মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী বোনাস ও রিজার্ভের নতুন করবিন্যাসকে স্বাগত জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, করের নতুন বিন্যাস বিনিয়োগকারী ও পুঁজিবাজার-উভয়ের জন্য কল্যাণকর হবে। কোম্পানিগুলো নগদ লভ্যাংশ দিতে উৎসাহিত হবে। এর মধ্য দিয়ে কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আর্থিক শক্তি বুঝা যাবে। বিনিয়োগকারীরা যে নগদ লভ্যাংশ পাবেন, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাজারে পুনর্বিনিয়োগ হবে।

আহমেদ রশিদ লালী

ডিবিএ’র সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী মনে করেন, বোনাস লভ্যাংশ ও রিজার্ভে করের বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের জন্য মঙ্গল আনবে না। পুঁজিবাজার ও বেসরকারি বিনিয়োগে এই কর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তিনি বলেন, রিজার্ভ হচ্ছে একটি কোম্পানির অন্যতম শক্তি। তার ব্যবসা সম্প্রসারণ ও প্রবৃদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার। করের কারণে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর নগদ লভ্যাংশ না দিয়ে কোম্পানির তহবিলে ওই অর্থ রেখেছে। সেই অর্থ ব্যবহার করে তারা নিজেদের ব্যবসা বাড়িয়েছে। করের কারণে এখানে রিজার্ভ নিরুৎসাহিত হবে। ফলে কোম্পানিগুলোর বড় হওয়াও কঠিন হবে। এমনটি হলে আমাদের পুঁজিবাজারের কোনো কোম্পানিকে বেশি বড় হতে দেখতে পারবো না। এটি বেশ হতাশার।

শহিদুল ইসলাম সিএফএ

ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম সিএফএ বলেন, বোনাস লভ্যাংশ এবং রিটেইন্ড আর্নিংস ও রিজার্ভের করহার সংশোধনের বিষয়টি মোটামুটি ইতিবাচক। রিটেইনড আর্নিংস ও রিজার্ভের মোট স্থিতির পরিবর্তে প্রতি বছরের রিটেইনড আর্নিস এর উপর কর আরোপের বিষয়টি একটু স্বস্তি দেবে সবাইকে।

তিনি বলেন, করহার সংশোধনের ফলে একটু ভারসাম্য এসেছে। এখন কোম্পানিগুলো বোনাস দিলেও তার সঙ্গে সমপরিমাণ নগদ লভ্যাংশও দেবে। এর ফলে কোম্পানির উপর বেশি চাপ পড়বে না, আবার বিনিয়োগকারীদের সুবিধা হবে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ