'ইন্টারনাল অডিটররা অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন'
রবিবার, ১৭ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page
একান্ত সাক্ষাতকার আইআইএবির জেনারেল সেক্রেটারি

‘ইন্টারনাল অডিটররা অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন’

এম নূরুল আলম, এফসিএস, সিসিইপি-আই ইন্টারনাল অডিটরদের সংগঠন দি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারনাল অডিটরস, বাংলাদেশ (আইআইএবি) এর সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস লিমিটেডের চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষে সম্পন্ন করেন সার্টিফাইড কমপ্লায়েন্স অ্যান্ড ইথিকস প্রফেশনাল-ইন্টারন্যাশনাল (সিসিইপি-আই) ও চার্টার্ড সেক্রেটারি পেশাগত ডিগ্রি।

ইন্টারনাল অডিট বিষয়ে তিনি দেশ-বিদেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। একাধিক আন্তর্জাতিক সেমিনারে তিনি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন, আলোচক হিসেবে অংশ নিয়েছেন। অর্থসূচকের সঙ্গে তিনি ইন্টারনাল অডিট পেশা ও আইআইএবির কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার জয়নাল আবেদিন ও কমিউনিকেশন অফিসার আনিকা নাওয়ার প্রমি। 

কোন কোন লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইনস্টিটিউট অব ইন্টারনাল অডিটরস,বাংলাদেশ (আইআইএবি) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে? বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা কত?

বেশ কিছু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে ইনস্টিটিউট অব ইন্টারনাল অডিটরস,বাংলাদেশ (আইআইএবি) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে-

ইন্টারনাল অডিট প্রফেশনালদের দক্ষতা বৃদ্ধি। এই লক্ষ্যে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা; সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন।

ইন্টারনাল অডিটরদের আন্তর্জাতিক সনদ সিআইএ (Certified Internal Auditor -CIA)  অর্জনে উদ্বুদ্ধ করা।

ইন্টারনাল অডিট প্রফেশনকে দেশের কর্পোরেট সেক্টরে গ্রহনযোগ্য করার জন্য অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম আয়োজন করা।

সর্বোপরি ইন্টারনাল অডিট পেশার মর্যাদা বাড়ানো, অডিটরদের দক্ষতার উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক চর্চাগুলোর সঙ্গে সদস্যদের পরিচিত করানো, সদস্যদের জন্য কাজের ক্ষেত্র বাড়ানো ইত্যাদি লক্ষ্য রয়েছে আইআইএবি’র।

কী ধরনের কাজ করছে এই সংগঠন?

আইআইএবি নিয়মিত অডিট প্রফেশনালদের জন্য কন্টিনিউয়িং প্রফেশনাল এডুকেশনস (সিপিই) আয়োজন করে। অডিটিং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে। সিআইএ সনদের জন্য পরীক্ষা দিতে আগ্রহীদের গাইড করে থাকে, তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করে থাকে আইআইএবি।

এম নূরুল আলম, এফসিএস

আইআইএবিতে ইন্টারনাল কন্ট্রোল ও রিস্ক ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। করপোরেট গভর্নেন্সের ওপর কোর্স করানো হয়। করপোরেট সেক্টরে কোর্সগুলো গুরুত্বপূর্ণ। আইআইএবি’র সদস্য হলে আইআইএ গ্লোবাল থেকে সদস্য নম্বর দেওয়া হয়, যা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আইআইএবি’র সদস্যরা সিআইএ অ্যাপ্লিকেশন ও এক্সাম ফি সাবসিডি পেয়ে থাকেন। আইআইএ ওয়েবসাইট ব্রাউজ করতে পারে। এছাড়া আইআইএবি সদস্যপ্রতি ১৭ দশমিক পাঁচ ডলার বার্ষিক অ্যাফিলিয়েশন ফি পরিশোধ করে আইআইএ গ্লোবালকে। ফলে সদস্যরা গ্লোবাল মেম্বার স্ট্যাটাস উপভোগ করতে পারেন।

আইআইএবি’র সদস্য হওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা কী?

ইন্টারনাল অডিট কাজে অভিজ্ঞতা আছে এবং ন্যুনতম স্নাতক পাস-এমন যে কেউ আইআইএবির সদস্য হতে পারেন। সদস্য পদে আবেদন করার জন্য আইআইএ সার্টিফিকেশনের কোনো বাধ্যকতা নেই।  নির্দিষ্ট ফর্মে আবেদন করার পর আইআইএবি বোর্ড সেটি যাচাই করে যদি অনুমোদন করে, তাহলেই আইআইএবি’র সদস্য হওয়া যায়।

একটি কোম্পানিতে ইন্টারনাল অডিটরের কাজ কী?

ইন্টারনাল অডিট প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় বা শেষ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সঠিকভাবে কার্যকরী কি-না তা ইন্টারনাল অডিটর নিয়মিত পরীক্ষা করে এবং পলিসি ও প্রসেসসমুহ সঠিকভাবে কার্যকরী কি-না তা যাচাই করে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয় অবগত করানো এবং উপদেশ প্রদান ইন্টারনাল অডিট বিভাগের কাজ।

কোম্পানিতে ইন্টারনাল অডিট বিভাগের গুরুত্ব কতটুকু?

একটি কোম্পানিতে ইন্টারনাল অডিটের গুরুত্ব অপরিসীম। আগেই বলেছি, এই বিভাগ একটি কোম্পানির শেষ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কোম্পানির কোনো আর্থিক অনিয়ম হলো কি-না, কী ধরনের পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে নিয়ম ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব সে বিষয়ে গাইড করে থাকে ইন্টারনাল অডিট বিভাগ। তাতে কোম্পানির আর্থিক ঝুঁকি কমে আসে, এর স্থায়িত্বশীলতার সম্ভাবনা বাড়বে। এছাড়া আর্থিক বিষয় বাদেও টেকনিক্যাল অডিটেরও বিষয় আছে।

ইন্টারনাল অডিট বিভাগ কোম্পানির বিনিয়োগকারী বা উদ্যোক্তা, ভোক্তা, ব্যবস্থাপনাসহ সব স্টেকহোল্ডারের স্বার্থরক্ষায় কাজ। বিশ্বের সব উন্নত দেশে আইএ পেশা সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ ভূমিকা রাখে। আইএ ফাংশনের গুরুত্ব নির্ভর করে দেশের আইন ও প্রতিষ্ঠানের মালিক কিংবা ব্যবস্থাপনার ওপর।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং তালিকাবহির্ভুত কোম্পানি-সব ধরনের কোম্পানির জন্যেই একটি শক্তিশালী ইন্টারনাল অডিট বিভাগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে যেহেতু পাবলিক ইন্টারেস্ট বেশি, সে কারণে এগুলোতে কার্যকর ইন্টারনাল অডিট বিভাগ আরও বেশি জরুরি।

কোন বিষয়ে পড়াশোনা করলে ইন্টারনাল অডিটর হিসেবে চাকরি করা যায়?

অডিট দক্ষতা বিভিন্ন বিষয়ের উপর হয়। অতএব যে কোনো বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী থাকলেই ইন্টারনাল অডিটর হিসেবে কাজ করা য়ায়। সিআইএ ডিগ্রি ইন্টারনাল অডিটের গ্লোবাল উচ্চতর ডিগ্রী। সাধারণত হিসাব বিজ্ঞানে ডিগ্রিধারী প্রশিক্ষিতরাই ইন্টারনাল অডিট কাজে এসে থাকেন। এটা হয় থাকতে পারে মনস্তাত্ত্বিক কারণে। অডিট শব্দটি শুনেই দূর থেকে অনেকে এর সঙ্গে হিসাবের (Accounting)এর সম্পর্ক আছে। অন্যদেরও যে এ পেশা কাজ করার সুযোগ আছে সেটি বুঝতে পারেন না বলে অ্যাকাউন্টিংয়ের বাইরে অন্যান্য বিষয়ের ছেলে-মেয়েরা এ পেশায় কম আসেন। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। একটু একটু করে অন্যদেরও আগমন বাড়ছে।

ইন্টারনাল অডিটর হিসেবে ক্যারিয়ার গঠন করতে চাইলে আর কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন?

যে কোনো পেশার মতো ইন্টারনাল অডিটর হিসেবে কাজ করতে হলেও ন্যুনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা, সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা প্রয়োজন। কেউ এ পেশায় আসতে চাইলে প্রস্তুতি হিসেবে  হিসেবে সবার আগে মানসিক প্রস্তুতি দরকার। তিনি এ পেশা সম্পর্কে জানেন কি-না, নিজেকে এই পেশার যোগ্য মনে করছেন কি-না, পেশাটি উপভোগ করতে পারবেন কি-না, কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা আছে কি-না সে বিষয়টি নিজেই বুঝে নিতে হবে।

এ পেশায় ভালো করতে সিআইএ সার্টিফিকেশন পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিশ্রম করার মানসিক প্রস্ততি থাকতে হবে। ইন্টারনাল অডিটর হতে সিআইএ সার্টিফিকেট শুধু দেশে নয়, বিদেশেও ভালো চাকরি পাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

পেশা হিসেবে ইন্টারনাল অডিটর এর সুযোগ ও সম্ভাবনা কতটুকু?

পেশা হিসাবে ইন্টারনাল অডিটরের সম্ভাবনা অনেক বেশি। দেশের অর্থনীতি ও বেসরকারি খাত বড় হচ্ছে। কোম্পানিগুলো পুরনো ধ্যানধারণার বাইরে এসে আন্তর্জাতিক মান অর্জনের চেষ্টা করছে, ধীরে ধীরে তাদের ভালো প্র্যাক্টিসগুলো নিচ্ছে। তাই দেশে ইন্টারনাল অডিটরের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

অন্যদিকে এই পেশা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ সিআইএ সার্টিফিকেশন অর্জন করতে পারলে কাজের দিগন্ত অনেক বড় হয়ে যায়। সিআইএ একমাত্র সার্টিফিকেশন যা দিয়ে বিশ্বের যে কোনো দেশে কাজ করার সুযোগ আছে।

যতদূর জানা যায়,আর্থিক খাত ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাইরে খুব বেশি সংখ্যক কোম্পানিতে ইন্টারনাল অডিট বিভাগ নেই বা থাকলেও সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।  এর কারণ কী বলে মনে হয়?

ঠিকই বলেছেন। ইন্টারনাল অডিট কীভাবে ভ্যাল্যু অ্যাড করে সে বিষয়ে এখনো সবাই সচেতন নন। উদ্যোক্তারা যখন এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করবেন, তখন কিন্তু ইন্টারনাল অডিট  বিভাগ চালু এবং ইন্টারনাল অডিটর নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ত থাকবে।  উপকারিতা না বুঝায় খরচ বেশি হবে এমন ভয়ে অনেক কোম্পানি ইন্টারনাল অডিটর নিয়োগ দেয় না। তবে এখানেও পরিস্থিতির উন্নয়ন হচ্ছে। ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছেন সবাই। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আমাদের (আইআইএবি) বার্ষিক সম্মেলনে অনেক ফিডব্যাক পেয়েছি।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন ইন্টারনাল অডিটরকে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হতে হয়?

চ্যালেঞ্জ আছে। তবে অডিটর যদি প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হন এবং প্রিন্সিপল্স,রুল্স অব কন্ডাক্ট জানেন এবং স্ট্যান্ডার্ড বুঝেন তাহল তার পক্ষে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা কঠিন নয়। কারণ অডিটর আসলে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই কাজ করেন।

করপোরেট গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠায় ইন্টারনাল অডিটরের কতটুকু ভূমিকা আছে?

কর্পোরেট গভর্নেন্স সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত আছে কি-না এবং তা সঠিক পথে চলছে কি-না একজন  অডিটর তা ব্যবস্থাপনা অবগত করেন এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় গাইলাইন ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে আইআইএবি কী ভূমি রাখতে পারে?

আইআইএবি দক্ষ পেশাজীবী তথা মানবসম্পদ গড়ে তোলায় সাহায্য করার মাধ্যমে দেশের  অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ইন্টারনাল অডিটরদের দক্ষতা যত বাড়বে, ততই প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়িত্বশীলতাও বাড়বে, কমবে ঝুঁকি। এতে সরকারি-বেসরকারি খাতের আরও বিকাশ হবে। তৈরি হবে নতুন নতুন কর্মসংস্থান।

ইন্টারনাল অডিটিং সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কী কী সংস্থা বা ফোরাম রয়েছে? এর কোনোটির সঙ্গে কি আইআইএবি’র সম্পৃক্ততা আছে?

ইন্টারনাল অডিটিং সংক্রান্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফোরাম হচ্ছে-দ্যা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারনাল অডিটরস (আইআইএ)। আইআইএবি ২০০৪ সালে এফেলিয়েটড হয়েয়ে। আইআইএ গ্লোবালের ১৬৫ দেশ এবং টেরিটরিতে অবস্থান আছে এবং এর সদস্য সংখ্যা এক লাখ ৮৫ হাজার, যার মধ্যে বাংলাদেশে আছে ৩২১ জন ।

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ