ভারতে সূচক শুধু কমে না, বাড়েও
শুক্রবার, ১৫ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

ভারতে সূচক শুধু কমে না, বাড়েও

দেশের পুঁজিবাজারের তীব্র মন্দাকে আড়াল করতে আমাদের নীতিনির্ধারকদের অনেকেই একটা কমন অস্ত্র ব্যবহারের চেষ্টা করেন। কথায় কথায় তারা ভারতের উদাহরণ টেনে আনেন। বলেন, ভারতে ২০০৮ সালে মূল্যসূচক (সেনসেক্স) ২১ হাজার পয়েন্ট থেকে মাত্র ৭ হাজার পয়েন্টে নেমে এসেছিল।

এই উদাহরণের শানে নযুল হয়ত এমন- ভারতে তো সূচক তিন ভাগের এক ভাগে নেমেছিল, সে তুলনায় আমাদের বাজারে তেমন কিছুই হয়নি। যা হচ্ছে, তার সবই স্বাভাবিক।

হ্যাঁ, পুঁজিবাজারে শেয়ারের দাম ও মূল্যসূচক বাড়বে-কমবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আমাদের বাজারের গত কয়েক বছরের ধারা কি স্বাভাবিক? বিশ্বের কোন বাজার এত দীর্ঘ সময় মন্দার বৃত্তে ঘুরপাক খেয়েছে বা খাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তরটা কখনোই পাওয়া যায়নি। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তা বরাবরই এড়িয়ে যাওয়া হয়। যেমন- এড়িয়ে যাওয়া হয় ভারতের বাজারে সূচক পুনরুদ্ধারের কথা।

বাস্তবে কী হয়েছিল ভারতে? মূল্যসূচক কোথা থেকে কোথায় নেমেছিল, এখনই-বা কোথায় আছে? তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে যে চিত্র পাওয়া যায় তা আমাদের হতাশা বাড়িয়ে দেওয়ার মত। কারণ দেশটির পুঁজিবাজারে ২০০৮ সালে বড়সড় ধস নামলেও মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় তারা। তৃতীয় বছরের মাথাতেই মূল্যসূচক আগের অবস্থানে উঠে আসে, যদিও বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তা টেকসই হয়নি। ফের বড় পতন হয়। তবে পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে তা আবার ঘুরে দাঁড়ায়। সেখানে এসে স্থিতিশীল হয় বাজার, পর্যায়ক্রমে তা আরও বেড়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠার রেকর্ড গড়ে।

ভারতের বাজারের যে সূচকটির উদাহরণ আমরা হরহামেশা টেনে আনি সেটি হচ্ছে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সেনসেক্স মূল্যসূচক। এই সূচকটির পূর্ণ নাম The S&P Bombay Stock Exchange Sensitive Index. তবে এটি সেনসেক্স (SENSEX) নামেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

১৯৭৯ সালের ১ এপ্রিল বাজার মূলধনে সেরা ৩০ কোম্পানি নিয়ে সেনসেক্স সূচকটি চালু হয়। এর ভিত্তি ঠিক করা হয় ১০০ পয়েন্ট।

২০০৮ সালের ১০ জানুয়ারি সেনসেক্স সর্বোচ্চ ২১ হাজার ২০৬ পয়েন্টে উঠে। অবশ্য ক্লোজিংয়ে সেদিন সূচকটি কিছুটা কমে ২০ হাজার ৫৮২ পয়েন্টে স্থির হয়। একই বছরে ভারতের বাজারে অবিশ্বাস্যরকম তীব্র পতন দেখা দেয়; যার কারণ ছিল বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা। এতে মাত্র ১০ মাসের মাথায়, ২৭ অক্টোবর সূচকটি ৭ হাজার ৬৯৭ পয়েন্ট বা প্রায় তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসে।

sensex-history

গত কয়েক বছরে সেনসেক্স সূচকের উঠা-নামা

যেমন অবিশ্বাস্য গতিতে সেনসেক্সের পতন হয়েছিল, তেমনই প্রায় কাছাকাছি গতিতে দুই বছরের মধ্যে তা আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসে। ২০১০ সালের ৫ নভেম্বর দিন শেষে সূচকটির অবস্থান দাঁড়ায় ২১ হাজার ৪ পয়েন্ট। তবে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা চলমান থাকায় সেটি স্থিতিশীল হতে পারেনি। পরের বছর সূচক কমে ১৫ হাজারে নেমে আসে। সেখান থেকে ২০১৩ সালে আবার ২১ হাজার ছাড়ায় সেনসেক্স।

এর পরের যাত্রা রূপকথার মতো, কেবলই উত্থানের গল্প। একের পর এক উচ্চতার রেকর্ড ভেঙ্গে চলছে সেনসেক্স। আজ বৃহস্পতিবার এই সূচক ৩৯ হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশে গত ১০ বছরে সূচকের উত্থান পতনের চিত্র তুলে ধরা কঠিন। কারণ ২০১০ সালে যে সূচকে (ডিএসই জেনারেল ইনডেক্স বা ডিজেন) রেকর্ড হয়েছিল, ২০১৩ সালে সেটি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। চালু করা হয় নতুন সূচক-ডিএসইএক্স। ডিএসইএক্স এর ভিত্তি (Base) ধরলে বর্তমানে  সূচকের অবস্থা সেই সময়ের চেয়ে অনেক উপরে। কিন্তু ডিজেনের সঙ্গে তুলনা করলে শুভঙ্করের ফাঁকিটুকু উঠে আসে।

২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি ডিজেনের অবস্থান ছিল ৪ হাজার ১৭১ দশমিক ৪১ পয়েন্ট। ওইদিন চালু হওয়া ডিএসইএক্স ছিল ৪ হাজার ৫৫ দশমিক ৯০ পয়েন্ট, যা ডিজেনের চেয়ে ১১৬ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৮০ পয়েন্ট কম। ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ডিজেন ৮ হাজার ৯১৮ দশমিক ১৮ পয়েন্টে উন্নীত হয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠার রেকর্ড করে। সে সময় যদি ডিএইএক্স চালু থাকতো তাহলে ওদিন এর অবস্থান থাকতো ৮ হাজার ৬৭০ পয়েন্ট। সে হিসেবে ডিএসইএক্সের পতন হয়েছে (বুধবারের অবস্থান ধরে) ৩ হাজার ৪৩০ পয়েন্ট বা প্রায় ৪০ শতাংশ। গত ৮ বছরে সূচক আগের অবস্থানে তো বটেই ৬ হাজার পয়েন্টও অতিক্রম করতে পারেনি। তাই ভারতের সঙ্গে আমাদের সূচক পতনের তুলনা মোটেও যৌক্তিক হয় না।

অন্য কারণেও বাংলাদেশের সূচক পতনের যৌক্তিকতা বুঝাতে ভারতের সূচক পতনের উদাহরণ দেওয়া উচিত নয়। ভারতে ২০০৮ সালে সেনসেক্সের বড় পতন হয়েছিল মূলত বিশ্বঅর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কায়। আমাদের অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনীত‌ির সাথ‌ে  ভারতের মতো এতবেশি সম্পৃক্ত নয়। শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণও নামমাত্র।

তাছাড়া ভারতে সেনসেক্সের অবস্থান এখন ২০০৮ সালের চেয়ে ৪৪৫ শতাংশ উপরে। সে হিসেবে আমাদের সূচকেরও তো এত বেশি থাকার কথা। কিন্তু সেটি আগের অবস্থানেই ফিরতে পারছে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সোনালী যুগ পার করছে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জিডিপিতে ৬ শতাংশের মত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। প্রথমবারের প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ স্পর্শ করতে যাচ্ছে। অর্থনীতির এই শনৈ শনৈ উন্নতির কোনো ছোঁয়া-ই লাগছে না আমাদের পুঁজিবাজারে। এটা মোটেও যৌক্তিক নয়। তার মানে কোথাও না কোথাও কিছু সমস্যা আছে। তাই সূচকের খণ্ডিত উদাহরণ দিয়ে বাস্তবতাকে আড়াল করার চেষ্টা না করে সেটি মেনে নিয়ে সমস্যা চিহ্ণিত করা ও সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

এই বিভাগের আরো সংবাদ