ArthoSuchak
মঙ্গলবার, ৩১শে মার্চ, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

‘রাজনৈতিক বিবেচনার ব্যাংক অস্থিরতা ছড়াবে’

অর্থসূচক সম্পাদক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক জিয়াউর রহমান বলেছেন, অর্থনীতিকে অর্থনীতির মতো করে চলতে দেওয়া উচিত। এখানে রাজনৈতিক বিবেচনার আলোকে কোনো কাজ করা উচিত নয়। সম্প্রতি রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন করে তিনটি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি অর্থনীতির জন্যে কোনো বিবেচনাতেই ইতিবাচক নয়। বরং নতুন ব্যাংকের অনুমোদনের ফলে ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা বাড়বে। যা শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনীতিকেই অস্থির ও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ব্যবসাপাতি সারাদিন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। এর আগের দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে নতুন তিনটি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। ব্যাংক ৩টি হলো বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, সিটিজেন ব্যাংক ও পিপলস ব্যাংক।বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের প্রস্তাবিত চেয়ারম্যান হিসাবে রয়েছেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি জসীম উদ্দিন। তিনি বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান। সঙ্গে আছেন তার ভাই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মোর্শেদ আলম। সিটিজেন ব্যাংকের প্রস্তাবিত চেয়ারম্যান আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মা জাহানারা হক। আর পিপলস ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসাবে নাম প্রস্তাব করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা এমএ কাশেম। এ তিনটি ব্যাংক নিয়ে দেশে তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২টি।

Zia-Independent-4

অর্থসূচক সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার আগে সরকার  দেশে নতুন ব্যাংকের কোনো প্রয়োজন আছে কি-না, সে বিষয়ে কোনো সমীক্ষা চালায়নি। বরং কয়েক বছর আগে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থমন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক মতামতে জানিয়েছিল, দেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় পর্যাপ্ত ব্যাংক আছে।তাই নতুন করে কোনো ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

তিনি বলেন, যদি আমরা নিশ্চিত হতে পারতাম যে, আলোচিত ব্যাংকগুলো কোনো উদ্ভাবনী ব্যাংকিং এর পরিকল্পনা করেছে, অর্থনীতির বিশেষ কোনো অংশ প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে প্রয়োজনীয় সুবিধা পাচ্ছে না, তারা সেই অংশের জন্য সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে, তাহলে কিন্তু কারোরই কিছু বলার থাকতো না।যদি একটি ব্যাংকও জানাতে পারতো যে, তারা ব্যাংকিং সেবা দিলে অর্থনীতিতে বিশেষ কী প্রভাব পড়বে, দেশে কতগুলো কর্মসংস্থান তৈরি হবে, রপ্তানি আয় কী পরিমাণে বাড়বে-তাহলেও কিন্তু এদের লাইসেন্স প্রাপ্তির কিছু যৌক্তিকতা পাওয়া যেতো।     কিন্তু আমরা কিন্তু এমন কোনো পরিকল্পনার কথা শুনিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকও বলেনি, ওই ব্যাংকগুলোকে কোন বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়া দরকার।যদি এ ব্যাংকগুলো গতানুগতিক ব্যাংকিং-ই করে, তাহলে এগুলোকে লাইসেন্স দিয়ে পুরো ব্যাংকিং খাতকে অসুস্থ প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দেওয়ার কী দরকার ছিল?

অর্থসূচক সম্পাদক বলেন, ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক খবরের অভাব নেই। এই খাতের জন্য নতুন একটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এই পড়তি আমানতে যখন নতুন ব্যাংকগুলো ভাগ বসাবে, তখন সবার ভাগই কমে যাবে। বাধ্য হয়ে সুদের হার বাড়িয়ে যে কোনো উপায়ে আমানত সংগ্রহের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামবে তারা। অন্যদিকে ব্যবসার সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই যেনতেনভাবে ঋণ বিতরণ করবে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ব্যাংকিং খাত ভারসাম্য হারাবে, এমন কী যে ব্যাংকগুলো আগে ভালো পারফর্ম করছিল, যাদের অবস্থা স্থিতিশীল ছিল, সেগুলোও কিন্তু সমস্যায় পড়বে।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হলে তার পরিণতি কী হয়, সে উদাহরণ কিন্তু আমাদের চোখের সামনেই আছে। আগের দফায় যে ব্যাংকগুলোর লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বেশিরভাগেরই অবস্থা কিন্তু ভালো নয়। একটি ব্যাংকের উদ্যোক্তারা নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন, খেয়ে ফেলেছেন ব্যাংকের মূলধন। ব্যাংকটিকে বাঁচাতে সরকার জনগণের করের টাকায় নতুন করে মূলধনের যোগান দিয়েছে। অন্য একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডিকে সরিয়ে দিতে হয়েছে। যদি এমন অবস্থা চলতে থাকে, যদি একাধিক ব্যাংক কলাপস করে, তাহলে কিন্তু অর্থনীতি বেশ সংকটে পড়বে। তাই এখন থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

পুঁজিবাজার পরিস্থিতি:

পুঁজিবাজার পরিস্থিতি সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে জিয়াউর রহমান বলেন, বাজারের বর্তমান অবস্থাকে মোটেও আশাব্যঞ্জক বলা যাবে না। বাজারে সূচক কমছে, এই বিষয়টি যতটা না উদ্বেগের, তারচেয়ে উদ্বেগের হচ্ছে লেনদেন কমে যাওয়া। চলতি বছরের শুরুর দিকে ডিএসইতে লেনদেন ৭/৮ শ কোটি টাকায় উঠলেও বর্তমানে তা ৫শ কোটিতে নেমে এসেছে।

তিনি বলেন, বাজারে লেনদেন বাড়াতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে হবে, ভালো কোম্পানি নিয়ে আসতে হবে বাজারে। পাশাপাশি ব্রোকারহাউজগুলোকে নতুন শাখা খোলার মাধ্যমে নেটওয়ার্ক বাড়ানোর সুযোগ দিতে হবে।

অর্থসূচক সম্পাদক বলেন, ২০১০ সালের ধসের পর থেকে ব্রোকারহাউজের শাখা খোলার অনুমতি দেওয়া একরকম বন্ধ আছে। মাঝখানে ৫/৭টি প্রতিষ্ঠানকে একটি করে শাখা খোলার অনুমোদন দেওয়া হলেও বর্তমানে তা আবার বন্ধ আছে। এই জায়গায় অতিরক্ষণশীলতা থেকে বের হয়ে আসা উচিত। ব্রোকারহাউজগুলো যদি সারাদেশে নেটওয়ার্ক বিস্তার করতে না পারে তাহলে বিভিন্ন অঞ্চলের অলস সঞ্চয়গুলোকে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে চ্যানেলাইজ করে জাতীয় মূলধনে রূপান্তরের সুযোগ থাকবে না।

Zia-Independent-3.jpg

তিনি বলেন, পুঁজিবাজার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা কম থাকায় ঝুঁকি এড়াতেই হয়তো ব্রোকারহাউজের শাখা খোলা বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেই আমাদের বিশ্বাস। কারণ বিএসইসির উদ্যোগে এই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। যেসব অঞ্চলে এই কার্যক্রম চালানো হয়েছে, সেসব অঞ্চলে অন্তত শাখা খোলার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। ছোট শহরে না হোক, বড় শহরের ক্ষেত্রে হলেও বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এসিআই, জেএমআই সিরিঞ্জ ও গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের প্রতারণা:

অর্থসূচক সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, কিছু অসাধু কোম্পানির কর্মকাণ্ডের কারণে বাজারের বিনিয়োগকারীদের আস্থা বার বার নষ্ট হচ্ছে। সম্প্রতি এমন তিনটি ঘটনা ঘটেছে। এক সময়ের ব্লুচিপ কোম্পানি এসিআই লিমিটেড বেশ কিছুদিন ধরে নানা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড করছে। কোম্পানিটি সর্বশেষ প্রান্তিকে লোকসান দেখিয়েছে। এর জন্য তারা ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়া, ডলারের দাম বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, ট্যাক্স বার্ডেনের অজুহাত দেখিয়েছে।

তিনি বলেন, এসিআই যে কারণগুলোর কথা বলেছে, সে বিষয়গুলো কিন্তু এককভাবে শুধু তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু এই বিষয়গুলোর জন্য কিন্তু অন্য কোম্পানিগুলো লোকসান দিচ্ছে না। তাছাড়া এসিআই-ই শুধু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ কোম্পানি নয়। এখানে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস আছে, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস আছে, রেনাটা আছে। আলোচিত প্রান্তিকে এদের পারফরম্যান্স কিন্তু খারাপ হয়নি। একই দেশে, একই অর্থনীতিতে এবং একই সুদ ও ট্যাক্স স্ট্রাকচারে থেকে শুধু একটি কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী ফলাফল ঘটবে, এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আরও একটি বড় অভিযোগ হচ্ছে, এটি স্বপ্ন নামের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে প্রতিবছর বিপুল লোকসান দিয়ে চলেছে। মাত্র ৩৬ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের বিপরীতে স্বপ্নের পুঁঞ্জিভুত লোকসান ৮৯১ কোটি টাকা। বিষয়টিকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন। তাদের মতে, স্বপ্নের লোকসানের আড়ালে এসিআইয়ের উদ্যোক্তারা সম্ভবত অর্থ পাচার করছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ৫ পরিচালকের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে।

এসিআই কিন্তু কয়েক বছর আগেও এমন একটি জালিয়াতি করেছে। একই গ্রুপের মালিকানাধীন কোম্পানি এসিআই ফর্মুলেশন ভারতের রং উৎপাদনকারী কোম্পানি এক্সোনোবেলের সঙ্গে একটি উৎপাদন চুক্তি করলেও নির্ধারিত সময়ে এই তথ্য প্রকাশ করেনি। চুক্তি সই হওয়ার প্রায় এক মাস পরে তারা তথ্যটি প্রকাশ করেছিল, অথচ এক্সোনোবেল চুক্তি সই হবার দিনেই বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জকে ওই চুক্তির কথা জানিয়েছিল। সম্ভবত তথ্যটি আড়াল করার পেছনে সুবিধাভোগী লেনদেনের বিষয় ছিল। সে সময়ে বিষয়টির তদন্ত হলে এসিআই এর মালিকারা একটু হলেও সংযত হতে বাধ্য হতেন।

অন্যদিকে ফার্মাসিউটিক্যালস ও রসায়ন খাতের আরেকটি কোম্পানি জেএমআই সিরিঞ্জ মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বিকৃতভাবে প্রকাশ করে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। কোম্পানিটি জাপানি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে নতুন শেয়ার বিক্রির চুক্তি করেছে। ডিএসইকে তারা জানিয়েছিল, বিশেষ সাধারণ সভায় শেয়ারের দাম নির্ধারিত হবে। অন্যদিকে বাজারে গুজব ছড়ানো হয়েছিল, জাপানিদের কাছে ৪/৫শ টাকা দরে শেয়ার বিক্রি করা হবে। এই খবরে শেয়ারটির দাম দুই মাসের ব্যবধানে ২শ টাকা থেকে ৫শ টাকায় উন্নীত হয়। অথচ ইজিএমে জানানো হয়, ১৬৪ টাকা দরে জাপানিদের কাছে শেয়ার বিক্রি করা হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে ডিএসইও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেনি। তাদের উচিত ছিল, বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করে ওয়েবসাইটে তথ্যটি প্রকাশ করা। ইজিএমে শেয়ারের দর নির্ধারণের আইনী কোনো সুযোগ নেই। এটা সচেতন সবার জানা। অথচ ডিএসই অসচেতন আনাড়ির মতো কোম্পানির দেওয়া মূল্য সংবেদনশীল তথ্যটি ওয়েবসাইট ও ট্রেডিং প্লাটফরমে প্রকাশ করেছে।

গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স শেয়ারের কাঠামো নিয়ে জালিয়াতি করে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছে।

এ বিষয়গুলোর গভীর তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।

এই বিভাগের আরো সংবাদ