সঠিকভাবে কৃষিঋণ বিতরণ ও সংগ্রহ করাই বড় চ্যালেঞ্জ
সোমবার, ৯ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

সঠিকভাবে কৃষিঋণ বিতরণ ও সংগ্রহ করাই বড় চ্যালেঞ্জ

অনেক সময় কৃষি খাতের নির্ধারিত ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়না। বর্তমানে সার্বিকভাবে ক্লাসিফাইড লোন রয়েছে ১০.৮ শতাংশ। কিন্তু এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী কৃষি খাতে ওভার ডিউ বা বিলম্বিত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৭ শতাংশ। তবে এই খাতে ঋণ বিতরণ ও সংগ্রহ করা এক ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

আমাদের দেশে কৃষি খাতের আয় খুব একটা বেশি নয়। এর জন্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। উৎপাদন বাড়লে কৃষি মজুরিও বাড়বে। কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে বিনিয়োগ দরকার। তাই সময়মত কৃষকরা যাতে লোন পায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে বলেও জানান তিনি।

আমাদের দেশের কৃষি ঋণের জন্য কৃষকরা মূলত রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংগুলোর উপর বেশি নির্ভরশীল। বিশেষ করে কৃষি ব্যাংক। সেখানে আবার ব্যবস্থাপনা ঘাটতিও বেশি। অনেক সময় অভিযোগ আসে মাঠ পর্যায়ের চাষীরা বেশি সুদের বিনিময়ে ঋণ গ্রহণ করেন। যা সরকারি ব্যাংগুলোর প্রাথমিক সুদের চেয়ে অনেক বেশি। বিভিন্ন হাত ঘুরে বেড়ে যায় এই সুদের হার। এমনটাই বলছিলেন এই অর্থনীতিবিদ।

এক সময় কৃষি ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। আস্তে আস্তে সেটা শিল্পের দিকে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। জিডিপির প্রায় ১৬.৩৩  শতাংশ অর্জিত হয় কৃষি থেকে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ৩.৩৫ শতাংশ। দেশের প্রায় ১৬.৮৯ কোটি মানুষের খাদ্য যোগান আসে কৃষি খাত থেকে। এছাড়াও প্রতি বছর প্রায় ২.২ মিলিয়ন নতুন মুখের জন্য ৩ লাখ টন অতিরিক্ত খাদ্যের জোগান দিতে হয় এই খাতকে।

কৃষি খাতকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ১৫.১৮ মিলিয়ন পরিবারের জীবিকা অর্জনে কখনো কখনো অস্থিতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। কর্মসংস্থানের জন্য বিপুলসংখ্যক ভূমিহীন পরিবারের কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে পরিস্থিতির জটিলতা আরও বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের সংখ্যাধিক্য, মাটির স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি, পানির অপ্রতুলতা ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, দানাদার ফসল উৎপাদনে অধিক গুরুত্ব প্রদান, কৃষকের চলতি মূলধনের অপ্রতুলতা, কৃষি নিয়ন্ত্রণে ধীরগতি এখাতের মূল সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি তথা অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘমেয়াদী খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততার আগ্রাসন এবং অন্যান্য সমস্যা কৃষিখাতের সাফল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়াও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যেমন কৃষি জমিতে শিল্পবর্জ্য, কৃষি জমি অকৃষি জমিতে রূপান্তর অত্যাধিক কীটনাশক ব্যবহার ইত্যাদি কারণে খাদ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।

ড.জাহিদ হোসেন অর্থসূচককে বলেন, দিন দিন আমাদের দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিল্প কলকারখানা বাড়ছে। কিন্তু দেশের কৃষি জমির পরিমাণ কমে আসছে। এই অবস্থায় দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হলে চাষীদের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে হবে। নতুন পদ্ধতিতে সেচ, নতুন ধরণের সার, উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করাটা কৃষি খাতের জন্য উপকারী হবে। তাছাড়া দেশের কৃষি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না।

দেশের কর্মসংস্থানের যোগান দিতে কৃষি একটি অন্যতম খাত বলে মনে করে বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি। সংগঠনটি বলছে, গত পাঁচ বছরে কৃষি ঋণের বাজেট বাড়ানো হলেও এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ সীমাবদ্ধ রয়েছে। গত পাঁচ বছর ধরে ৯ হাজার কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রয়েছে কৃষিখাতে ভর্তুকির পরিমাণ। এটাই নির্দেশ করে যে প্রকৃতপক্ষে সরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি।

কৃষিকে শিল্প খাতের সঙ্গে তুলনা করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের বেকারত্ব কমাতে হলে শিল্পায়নের বিকল্প নেই। তার মানে এই নয় যে কৃষিক্ষেত্রের গুরুত্ব কমে যাবে। প্রয়োজনের তাগিদেই দেশব্যাপী নগরায়ন বাড়বে। সেদিক থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট ২১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬.৮৬ শতাংশ বেশি। কৃষি ও পল্লী ঋণ এর ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় চলতি অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক সমূহের জন্য ৯ লাখ ৮ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের জন্য ১১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।  সে ক্ষেত্রে ২১ হাজার ৩৯৩.৫৫ কোটি টাকা বিতরণে সক্ষম হয় ব্যাংকগুলো। যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ১০৫ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে একই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সে বছরে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করতে সক্ষম হয় ব্যাংকগুলো। সে দিক থেকে বর্তমানে কৃষিঋণ বিতরণের অবস্থা অনেক ভালো। কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এই খাত দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেজন্য আরও অধিক পরিমাণে কৃষি ঋণে গুরুত্ব দেয়া দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থসূচক/জেডএ/জেডআর

এই বিভাগের আরো সংবাদ