বিলুপ্তির পথে ভৈরবের বাঁশ-বেত শিল্প
শুক্রবার, ৫ই জুন, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

বিলুপ্তির পথে ভৈরবের বাঁশ-বেত শিল্প

প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা, বাঁশের চাষাবাদ কমে যাওয়া এবং প্লাস্টিক পণ্য সামগ্রীর ভিড়ে বাঁশ-বেত সামগ্রীর চাহিদা বাজারে কমে যাওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেত শিল্প।

এ পেশায় নিয়োজিত শত শত পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে আবার বংশ পরম্পরার এ পেশা ছেড়ে নিয়োজিত হচ্ছে ভিন্ন পেশায়। সরকারি সহায়তা পেলে ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশ বান্ধব এ কুঠির শিল্প রক্ষাসহ এর সাথে জড়িতরা আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।

প্লাস্টিক পণ্য সামগ্রীর ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেত শিল্প।

ভৈরব উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের বাঁশগাড়ি, মানিকদী, পূবেরকান্দা, বাঘাইকান্দি, পূবেরকান্দা, চাতালচরসহ বিভিন্ন গ্রামে বাঁশ-বেত শিল্পের প্রসার ঘটে অনেক আগেই। এসব গ্রামের মানুষের প্রধান পেশা বাঁশ-বেত শিল্প নির্ভর হওয়ায় আশে-পাশে দ্রুত এ শিল্পের পরিচিতি পায়। এখানকার বাঁশ-বেত শিল্পীরা তাদের সুনিপুণ হাতের কারুকাজে তৈরী করতো নানা সৌখিন ও নিত্য প্রয়োজনীয় হরেক সামগ্রী। শীতলপাটি, চাটাই, ডুল, জাবার, হাতপাখা, ডুলা, খলই, ওড়া, পাইছা, ঝুঁড়ি, চালনা, কুলা, মোড়া, চাঁই ইত্যাদি নানা প্রয়োজনীয় ও বাহারী দ্রব্য। পরিবারের ছেলে, বুড়ো, নারী, শিশু সবাই মিলে পারিবারিক পরিবেশে এ কাজ করা যায় বলে সকলেই কর্মজীবি হওয়ায় তাদের জীবন চলতো বেশ স্বাচ্ছ্যন্দে। ফলে এ কুটির শিল্পের কাজ দ্রুত প্রসারিত হয় ভৈরবের পার্শ্ববর্তী কুলিয়ারচর উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামেও। এ শিল্পের অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী হিসেবে বাঁশের চাষও হতে থাকে বাড়ি বাড়ি।

কিন্তু ওইসব এলাকার বাঁশ-বেত শিল্পের সে ঐতিহ্য বর্তমানে আর নেই। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নতুন আবাসন তৈরিতে জমির ব্যবহার হতে থাকায় বাঁশ চাষের প্রয়োজনীয় ভূমি একদিকে কমে যাওয়ার পাশাপাশি অপরদিকে বাজারে এ শিল্প সামগ্রীর বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিকের নানা দ্রব্যের সহজলভ্যতা ধীরে ধীরে এ কুটির শিল্পে ধ্স নেমে আসে। ফলে অধিক পরিশ্রম করে এ সামগ্রী তৈরি করে সংসার চালানোর মতো টাকা রোজগার করতে না পারায় এ কর্ম ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। আর যারা নিরুপায় হয়ে এ পেশায় জড়িয়ে আছেন, তারা যাপন করছেন মানবেতর জীবন।

সরকারি সহায়তা পেলে ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশ বান্ধব এ শিল্প রক্ষাসহ এর সাথে জড়িতরা আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।

মানিকদী গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আদম আলী জানান, জমিজমা না থাকায় এখনও এ পেশায় জড়িয়ে আছেন তিনি। প্রায় একই বক্তব্য বাঘাইকান্দির সিরাজ মিয়ার। তিনি জানান, অন্য কোন কাজ পারেন না বলেই তিনি এখনও এ পেশায় আছেন।

তবে ভিন্ন কথা বললেন চকবাজার এলাকার কুদ্দুস মিয়া। তিনি জানান, তিনি তার তিন ছেলে ও ছেলে বউদের নিয়ে বাঁশ-বেত শিল্পের সাথে জড়িত থেকে বেশ আছেন। তবে পুঁজির অভাবে অনেক সময় বাজারের চাহিদা মতো সামগ্রী তারা সরবরাহ করতে পারেন না।

এদিকে এলাকার সমাজকর্মী রইছ মিয়া, সাবেক ইউপি সদস্য জাফর ইশবাল ও কৃষক রেনু মিয়া অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, ভৈরবের ঐতিহ্যবাহী এ কুটির শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে সংশ্লিষ্টদের ঋণ প্রদানের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে এ শিল্প আবারও জেগে ওঠবে। কর্মসংস্থান হবে বহু লোকের। তাছাড়া এ শিল্পের প্রধান অনুষঙ্গ বাঁশের চাষ বৃদ্ধি পেলে ঝড়-তুফানসহ প্রাকৃতিক অনেক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাবে এলাকার মানুষসহ অনেক সম্পদ।

প্লাস্টিক পণ্য সামগ্রীর ভিড়ে বাঁশ-বেত সামগ্রীর চাহিদা বাজারে কমে যাওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে।

তার ইউনিয়নভুক্ত গ্রামগুলোর ঐতিহ্যবাহী এ বাঁশ-বেত শিল্পটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান গজারিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজী গোলাম সারোয়ার। তিনিও এ শিল্প রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের সহজ এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

এদিকে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিলরুবা আহমেদ জানান, বাঁশ-বেত শিল্পসহ হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন কুটির শিল্প রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে যুব উন্নয়ন, সমাজ সেবা ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এইসব দপ্তরসহ উপজেলা পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন ঋণ প্রদান কর্মসূচী থেকে সংশ্লিষ্টরা সহজ শর্তে ও অল্পসুদে ঋণ গ্রহণ করতে পারেন।

এই বিষয়ে কারো কোনো সহায়তার প্রয়োজন হলে তার দপ্তর সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে বলেও জানান ইউএনও।

অর্থসূচক/মোস্তাফিজ /কে এম

এই বিভাগের আরো সংবাদ