তবে কী অভিশংসন?
রবিবার, ১৭ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

তবে কী অভিশংসন?

২০১৫ সালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অভিশংসন চেয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী। সেই চিঠিতে চিঠিতে সংবিধান লঙ্ঘন, শপথভঙ্গ ও অসদাচরণের অভিযোগ তুলে অভিশংসন চান আপিল বিভাগের  ওই বিচারক।

চিঠিতে তার সঙ্গে প্রধান বিচারপতির কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করে লেখেন, আমি প্রধান বিচারপতি জনাব সুরেন্দ্র কুমার সিনহার একজন সহকর্মী। মাননীয় প্রধান বিচারপতি তাহার সহকর্মী বিচারপতি হিসেবে আমার প্রতি বিরাগের বশবর্তী হইয়া যেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছেন, তাহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে তিনি যে কোনো মামলায় অনুরাগ ও বিরাগের ঊর্ধ্বে থাকিয়া বিচারকার্য্য পরিচালনা করতে অক্ষম।

তিনি লেখেন, মাননীয় প্রধান বিচারপতির এই রূপ আচরণ ভয়াবহভাবে বৈষম্যমূলক ও প্রতিহিংসামূলক। ব্যক্তিগত বিরাগের বশবর্তী হইয়ার তিনি কর্মরত বিচারক হিসেবে আমাকে বিচারকার্য থেকে বঞ্চিত করিয়া অসদাচরণ করিয়াছেন, যাহা অভিশংসন যোগ্য।

তবে সারা দেশের নানা ঘটনার ডামাডোলে চাপা পড়ে যায় সেই খবর ও আলোচনা।

তবে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে কেন্দ্র করে সরকারের নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে সাম্প্রতিক বিরোধ, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ছুটিতে যাওয়া এবং এইসব ঘটনা নিয়ে বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতির এক পর্যায়ে গত শুক্রবার রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন সিনহা। আগামী ১০ নভেম্বর ছুটি শেষ হবে তার।

ঢাকা ছাড়ার আগে তিনি একটি লিখিত বিবৃতিও সাংবাদিকদের দেন। তার সেই বিবৃতি গণমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।

এর মধ্যেই গতকাল শনিবার সুপ্রিম কোর্ট এক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিষয়ে এক ‘নজিরবিহীন’ বিবৃতি দেয়।

তাতে বলা হয়, মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সুপ্রিম কোর্টের চার বিচারপতির কাছে এস কে সিনহার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনসহ ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সম্বলিত দালিলিক তথ্য  হস্তান্তর করেছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ব্যাতিত আপিল বিভাগের অপর পাঁচ বিচারপতিকে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানান। বিচারপতি মো. ইমান আলী দেশের বাইরে থাকায় ওই আমন্ত্রণে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি। বিচারপতি মো, আবদুল ওয়াহাব মিয়া, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচাপরতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেন হায়দার রাষ্টপতির সঙ্গে সাক্ষাত করেন। দীর্ঘ আলোচনার এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সম্বলিত দালিলিক তথ্যাদি হস্তান্তর করেন। তারমধ্যে বিদেশে অর্থপচার, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলনসহ আরও সুনির্দিষ্ট গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

বিচারপতি মো. ইমান আলী ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের পর গত ১ অক্টোর আপিল বিভাগের উল্লিখিত ৫ বিচারপতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ কুমার সিনহার অনুমতি নিয়ে ৫ বিচারপতি প্রধান বিচারপতির হেয়ার রোডের বাসভবনে সাক্ষাত করে অভিযোগসমূহ নিয়ে বিষদভাবে আলোচনা করেন। দীর্ঘ আলোচনার পরে তার নিকট হতে কোনো প্রকার গ্রহণযোগ্য ব্যাখা বা সদুত্তর না পেয়ে আপিল বিভাগের উল্লিখিত ৫ জন বিচারপতি তাকে সুষ্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, এমতাবস্থায় ওই অভিযোগসমূহের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে তাদের (৫ বিচারপতি) পক্ষে বিচারকাজ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।

এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা সুষ্পষ্টভাবে বলেন যে, সেক্ষেত্রে তিনি পদত্যাগ করবেন। তবে এ ব্যাপারে পরের দিন ২ অক্টোবর তিনি তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন। ২ অক্টোবর তিনি উল্লিখিত বিচারপতিদের কোনো কিছু অবহিত না করে রাষ্ট্রপতির কাছে এক মাসের ছুটির দরখাস্ত প্রদান করলে রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন করেন।

সুপ্রিম কোর্টের ওই বিবৃতি ও প্রধান বিচারপতির দেশ ত্যাগের আগের সেই চিঠি বিষয়ে আজ সরকারের তরফে সংবাদ সম্মেলন করেন আইন মন্ত্রী আনিসুল হক।

রোববাররে সংবাদ সম্মেলনে এস কে সিনহাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে স্বীকার করে নিয়েই মন্ত্রী বলেছেন, তিনি কেবল ব্যক্তি না, একটি প্রতিষ্ঠান। এরপরেও তার বিরুদ্ধে যেহেতু সুনির্দষ্ট কিছু অভিযোগ রয়েছে তাই সেগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত নিজের চেয়ারে বসতে পারবে না।

এছাড়া দেশ ত্যাগের আগে লিখিত চিঠিতে সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নিজের সুস্থতার দাবি প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী হতভম্ব হয়েছেন।

তিনি বলেছেন, প্রধান বিচারপতি সম্পূর্ণ সুস্থ বলে উল্লেখ করায় আমরা হতভম্ব। তিনি অসুস্থতার কথা বর্ণনা করে চিঠি দেয়ার ৭ দিন পর আবার জানালেন তিনি সুস্থ। কিন্তু অসুস্থতার কথা বলে তিনি যে চিঠি দিয়েছেন সে তারিখেই দেশ ত্যাগ করেছেন। এ নিয়ে কোনো বিতর্ক হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছিল না।

আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিভারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনাহা ১০ অক্টোবর ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে তার একান্ত সচিব বলেন, প্রধান বিচারপতি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করায় মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত। এজন্য তিনি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ভ্রমণে যেতে চান। এই দুই চিঠি পাওয়ার পর পদক্ষেপ নিয়েছি। যা করতে হয় তাই করেছি।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আনিসুল হকও সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতির কথাগুলোই উল্লেখ করে বলেন, এখনও প্রধান বিচারপতির পদ খালি না। তিনি এখন দেশের প্রধান বিচারপতি। দুর্নীতিগুলোর তদন্ত হোক, দেশে ফিরে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি তার বক্তব্য দেন তারপর কী হয় দেখা যাবে। সব কিছু আইনের নিয়মেই হবে। আবার মহামান্য রাষ্ট্রপতি চাইলে কিছু করতে পারেন। তার সেই পাওয়ার আছে।

এ সময় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে পরিবর্তনে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য আইন সমন্মত নয় বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

ঘটনার ধারাবাহিকতায় মেয়াদ, ছুটি, অভিযোগ, তদন্ত, ইত্যাদির প্রেক্ষিতে এখন মহামান্য রাষ্ট্রপতি চাইলে অভিসংশনের মতো পদক্ষেপ নিলেও নিতে পারেন।

টি

এই বিভাগের আরো সংবাদ