পেরিফাইটন পদ্ধতিতে মাছ চাষ
শনিবার, ১৪ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » টিপস (কৃষি)

পেরিফাইটন পদ্ধতিতে মাছ চাষ

পেরিফাইটন এমন এক মাছ চাষ পদ্ধতি যার মাধ্যমে অল্প খরচে স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে প্রাকৃতিক উপায়ে পাওয়া মাছ আমাদের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। তাই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দ্রুতবর্ধনশীল ও অধিক উৎপাদনশীল মাছের চাষ করা শুরু হয়। এক্ষেত্রে মাছকে আলাদাভাবে খাবার সরবরাহ করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে মাছের খাবারের মূল্য দিন দিন বাড়তে থাকায় মাছ চাষীরা লাভবান হতে পারছেন না। এসব দিক বিবেচনা করে মাৎস্য বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এরই একটি হচ্ছে পেরিফাইটন পদ্ধতি।

এ পদ্ধতিতে মাছ চাষীরা সহজ ও স্বল্পব্যয়ে অনেক বেশি মাছ উৎপাদন করতে পারেন। এক্ষেত্রে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় পেরিফাইটন নামক এক ধরনের শৈবাল। বিভিন্ন জলজ জীব-অণুজীবের জটিল মিশ্রণ এই পেরিফাইটন; যা জলাশয়ের পানিতে অবস্থিত কোনো কিছুর গায়ে লেগে থাকে।

পেরিফাইটন পদ্ধতিতে খামারিরা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করে থাকে। স্বল্পব্যয়ের কারণে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে দেশিয় প্রযুক্তটিতে উদ্ভাবিত এ পদ্ধতি। দীর্ঘ গবেষণার পর পেরিফাইটন পদ্ধতিতে মাছ চাষের এ প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেছেন মাৎস্যবিজ্ঞানী ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল ওহাব।

রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস, তেলাপিয়া ও চিংড়ি চাষের জন্য পেরিফাইটন পদ্ধতিটি বেশ উপযোগী।
পেরিফাইটন পদ্ধতিতে রুই মাছের উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ১৯শ কেজি পর্যন্ত সম্ভব। তবে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে রুই মাছের উৎপাদন হেক্টরপ্রতি এক হাজার কেজিরও কম থাকে। এ পদ্ধতিতে তেলাপিয়া ও চিংড়ি মিশ্রচাষ করে ১৪৫ দিনে সর্বোচ্চ মোট উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ২ হাজার ৪শ ৪৫ কেজি তেলাপিয়া ও ১৪১ কেজি চিংড়ি পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

গবেষক ড.ওহাব বলেন, স্বল্পমূল্যে ও অল্প জমিতে বেশি সংখ্যক মাৎস্য উৎপাদনের লক্ষ নিয়ে ১৯৯৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদে শুরু হয় গবেষণা। যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ড ও ভারতীয় বিজ্ঞানিদের যৌথ উদ্যোগে ‌‌‌‌‍‌পেরিফাইটন ভিত্তিক মাছ চাষ’ প্রকল্পের আওতায় গবেষণা শুরু হয়। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন বছর পর এ কাজে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেন তারা।

তিনি বলেন, পেরিফাইটন এক ধরনের শৈবাল যা মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন জলজ জীব-অনুজীবের জটিল মিশ্রণ এই পেরিফাইটন, যা জলাশয়ের পানিতে অবস্থিত কোনো কিছুর গায়ে লেগে থাকে।

তিনি আরও বলেন, এ সকল জীব-অনুজীবের মধ্যে রয়েছে- ব্যাকটেরিয়া, এককোষি প্রাণি, ছত্রাক, ফাইটোপ্লাংটন, জুপ্লাংটনসহ বিভিন্ন তলদেশিয় ও অমেরুদণ্ডী প্রাণী।

পেরিফাইটন বিভিন্ন প্রজাতির মাছকে শুধু আকৃষ্টই করে না, বরং এসব অনুজীব মাছ ও চিংড়ি জাতীয় মাছের খুবই প্রিয় খাদ্য। তাছাড়া এটি পুষ্টিকরও বটে। সাধারণত যেসব মাছ গ্রেজিং বা কোনো কিছুর সঙ্গে লেগে থাকা খাবার চেঁচে খায়, সেসব মাছই পেরিফাইটন পদ্ধতিতে চাষের জন্য উপযোগী।

পেরিফাইটন এক ধরনের শৈবাল হলেও সাধারণ পানিতে এবং সব পরিবেশে এটা জন্মায় না। সাবস্ট্রেট বা ভিত্তি-মূলের উপর পেরিফাইটন জন্মে থাকে। এক্ষেত্রে হিজল ডাল সবচেয়ে উপযোগী। তবে বাঁশ, কঞ্চি, শেওড়া ইত্যাদি গাছের ডাল, এমনকি পাটের খড়ি, গ্লাস রড, প্লাস্টিক দণ্ডও ব্যবহার করা যেতে পারে।

মাৎস্যবিজ্ঞানি আরও বলেন, এগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে শৈবাল জাতীয় জুপ্লাংটন বা ফাইটোপ্লাংটন জন্মে থাকে এবং সবুজ রঙের একটি আস্তরণ পরে। এছাড়া অন্যান্য প্রাণিজ খাবারও তৈরি হয়। ওইসব ডালপালার উপর জন্মানো আস্তরণ বা শৈবালই পেরিফাইটন যা মাছের প্রিয় খাবার।

গবেষক ড. ওহাব প্রযুক্তিটির গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, পরিবেশবান্ধব, ব্যয়স্বল্পতা ও সহজে সম্পাদনযোগ্য প্রযুক্তিটি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বর্তমানে বিদেশের মাটিতেও বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ঘানাসহ বেশ কয়েকটি দেশে পদ্ধতিটির পরীক্ষামূলক ব্যবহারও চলছে। তবে সম্প্রসারণ সুবিধার অভাবে দেশের অনেক জায়গায়ই এ প্রযুক্তির ব্যবহার জানেন না অনেক মাছচাষি। এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সক্রিয় ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

কেএফ

এই বিভাগের আরো সংবাদ