এজিএম-পার্টির অত্যাচার থেকে বাঁচাতে র‍্যাব-পুলিশকে অনুরোধ
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page
চিঠিতে সেলিম রেজা, বাবু, টিটু, মেজবাহ, মতিনের নাম

এজিএম-পার্টির অত্যাচার থেকে বাঁচাতে র‍্যাব-পুলিশকে অনুরোধ

পুঁজিবাজারে এজিএম-পার্টি নামে পরিচিত মাস্তানচক্রের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ কোম্পানির পরিচালক ও কর্মকর্তারা। দিন দিন এদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। একটি গ্রুপ ভেঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন গ্রুপ। আর প্রতিটি গ্রুপই কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠানের আগে নানা ভয়-ভীতি দেখিয়ে কোম্পানির কাছ থেকে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ অবস্থায় তাদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করতে র‍্যাব ও পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন ভুক্তভুগীরা।

AGM-Party-Pic

এভাবেই বিভিন্ন কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা কথিত এজিএম-পার্টির দখলে চলে যায়

জানা গেছে, এজিএম-পার্টির খপ্পর থেকে বাঁচাতে গত ১৮ মে পুলিশের আইজির কাছে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এরপর গত ২৯ জুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

কোনো চিঠিতেই প্রেরক বা আবেদনকারীর নাম-ঠিকানা দেওয়া হয়নি। নাম ও ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভুগী হিসেবে নিজেদেরকে উল্লেখ করেন তারা। ধারণা করা হচ্ছে, তালিকাভুক্ত একাধিক কোম্পানি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে চিঠি দিয়ে সহায়তা চেয়েছে। নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়াতে তারা তাদের পরিচয় গোপন করেছেন। কারণ পরিচয় প্রকাশ পেলে তাণ্ডব চালাতে পারে এজিএম পার্টির সদস্যরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অর্থসূচককে বলেন, কে বা কারা চিঠি দুটি দিয়েছেন, তা তিনি জানেন না। তবে চিঠিতে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা শতভাগ সত্য।

তিনি বলেন, চিঠিতে প্রেরকের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করার বিষয়টি থেকেই বুঝা যায় কোম্পানিগুলো এজিএম পার্টির কাছে কতটা জিম্মি, কতটা অসহায়।

চিঠিতে সেলিম রেজা, বাবু, টিটো, বাদল, সুফিয়ান টিটু, জানে আলম, মতিন ও মেজবার নাম উল্লেখ করা হয়েছে

তিনি আরও বলেন, আপনার (অর্থসূচকের রিপোর্টার) কাছ থেকেই জানলাম প্রথম চিঠিটি পাঠানো হয় গত মে মাসের ১৮ তারিখে। এটি পুলিশের আইজির কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো অগ্রগতি যে হয়নি, সেটি স্পষ্ট। হলে জুন মাসে একই বিষয়ে সহায়তা চেয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যানকে চিঠি দিতে হতো না। এত চিঠি দেওয়ার পরও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেবেন কি-না সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান। যদি কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নেয় আর আবেদনকারীদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যায় তাহলে তাদের উপর এজিএম পার্টির অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যাবে। এই আশংকা থেকেই হয়তো চিঠিতে কোনো নাম-ঠিকানা দেওয়া হয়নি।

আইজিপি ও বিএসইসি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে এজিএম-পার্টির বিভিন্ন গ্রুপের নেতাদের নাম ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন-সেলিম রেজা, শাহ আলম বাবু, লুৎফল গনি টিটো, বাদল, আবু সুফিয়ান টিটু, জানে আলম, মতিন শহীদ ও মেজবা উদ্দিন।

এদিকে ভুক্তভুগী বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে এজিএম-পার্টির আরও কয়েকজন উল্লেখযোগ্য সদস্যের নাম পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে রয়েছেন- ডা. কবির আহমেদ রিয়াজ, মো. জামিল আহমেদ, মো. সাজ্জাদ হোসেন খোকন, মো. শামসুল হক ব্যাপারী, আমিনুল ইসলাম ভুইয়া, এ এম মাহবুবুর রহমান, মো. বজলুর রহমান, হাসান মো. শাহরিয়ার আলম, মো. জাহিদুল ইসলাম, মো. আফাজ উদ্দিন, নুরুল ইসলাম ও মো. মহসিন।

উল্লেখ, কোম্পানি আইন ও সিকিউরিটিজ আইন অনুসারে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিটি কোম্পানিকে নিজ নিজ হিসাববছর শেষ হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে হয়। কোম্পানির প্রত্যেক শেয়ারহোল্ডারকে এজিএমে অংশ নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হয়। এজিএমে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোম্পানির প্রতিবেদন  পেশ করেন। এতে আলোচ্য বছরে কোম্পানির কর্মকাণ্ড, আর্থিকচিত্র ও ভবিষ্যত পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ের উল্লেখ থাকে। পরে এই রিপোর্টের উপর সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদেরকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।

এজিএমে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, ঘোষিত লভ্যাংশ, পরিচালক পদে মনোনয়ন, নীরিক্ষক নিয়োগ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগসহ বেশ বিষয় শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়।


বিভিন্ন কোম্পানির এজিএম বা ইজিএমকে সামনে রেখে এজিএম পার্টিগুলো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

তারা কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে এজিএম ‘পার’ করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।

বিনিময়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে।

রাজি না হলে এজিএমে নাজেহাল করা, বিভিন্ন এজেন্ডার অনুমোদন ঠেকিয়ে দেওয়ার হুমকিসহ নানা ভয়-ভীতি দেখায়।


অন্যদিকে কোম্পানির অনুমোদিত মূলধন বাড়ানো, রাইট শেয়ার ইস্যু, বন্ড ইস্যু, অন্য কোম্পানির সঙ্গে একীভূতকরণ (Merger বা Amalgamation), অন্য কোনো কোম্পানি অধিগ্রহণ (Take-over) সংঘস্মারক ও সংঘবিধি পরিবর্তনসহ কিছু বিষয়ে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য বিশেষ সাধারণ সভা বা ইজিএম (Extra Ordinary General Meeting- EGM) এর আয়োজন করা হয়।

শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের ইস্যুটিকে হাতিয়ার বানিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে লিপ্ত কয়েকটি গ্রুপ। এই গ্রুপগুলো সাধারণভাবে এজিএম পার্টি নামে পরিচিত। একেকটি গ্রুপে ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য আছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন কোম্পানির এজিএম বা ইজিএমকে সামনে রেখে এজিএম পার্টিগুলো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে এজিএম ‘পার’ করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। বিনিময়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ রাজি না হলে এজিএমে নাজেহাল করা, বিভিন্ন এজেন্ডার অনুমোদন ঠেকিয়ে দেওয়ার হুমকিসহ নানা ভয়-ভীতি দেখায়। বেশিরভাগ কোম্পানি উটকো ঝামেলা থেকে বাঁচতে এজিএম পার্টিকে চাঁদা তাদের তুষ্ট করে।

তবে কিছু অসাধু কোম্পানি তাদের আর্থিক জালিয়াতি, অনিয়ম ঢাকতে এবং উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রস্তাব পাশ করিয়ে নিতে স্বেচ্ছায় এজিএম পার্টির প্রস্তাবে সাড়া দেয়। কেউ কেউ নিজে থেকে তাদেরকে ভাড়া করে।

কোনো মূলধন ছাড়াই বিশাল আয়ের এই ‘লাভজনক ব্যবসা’ করে এজিএম পার্টির অনেক নেতা দামি গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে গেছেন। এতে প্রলুব্ধ হয়ে নতুন নতুন পার্টি গজিয়ে উঠছে। এক গ্রুপ ভেঙ্গে একাধিক গ্রুপ তৈরি হচ্ছে। বাড়ছে গ্রুপের সংখ্যা। আর সেইসঙ্গে ভোগান্তি বাড়ছে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর। বাধ্য  হয়ে তাদেরকে সবগুলো গ্রুপকে টাকা দিতে হচ্ছে।

জানা গেছে,  প্রতিটি এজিএম/ইজিএমের জন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে সর্বনিম্ন ৫ লাখ টাকা থেকে ২৫/৩০ লাখ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। ব্যাংকের মতো বড় কোম্পানির ক্ষেত্রে তা কোটিতে গিয়েও ঠেকে।


পড়ুন এজিএম-পার্টি সংক্রান্ত কয়েকটি সংবাদ-

শেয়ারহোল্ডার নামধারী এরা কারা?

ফারইস্ট লাইফের এজিএমে যা হলো….

ইসলামী ব্যাংকের এজিএমঃ সরিয়ে দেওয়া হলো আহসানুল আলমকে


অন্যদিকে এজিএম-পার্টির দাপটের কারণে এজিএমে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনো কথা বলতে পারেন না। এজিএম কার্যত পাতানো খেলা হয়ে উঠে। এতে কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা ব্যহত হচ্ছে।

এছাড়া টাকার ভাগাভাগি অথবা ক্ষমতা জাহির করার বিষয়কে কেন্দ্র করে অনেক এজিএমে এজিএম-পার্টির একাধিক গ্রুপ নিজেদের মধ্যে কলহে জড়িয়ে পরে। কখনো কখনো সেটি হাতাহাতি, মারামারির ঘটনায় রূপ নেয়। বড় কোনো অঘটনের আশংকার মুখে পরতে হয় কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে।

পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠার কারণে ভুক্তভুগীরা পুলিশ, র‍্যাব ও বিএসইসির সহায়তা চেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

জানা গেছে, আইজিপির কাছে পাঠানো চিঠিটির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‍্যাব) এর মহাপরিচালক, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এর কমিশনার ও পুলিশের তদন্ত বিভাগ (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই) এর প্রধানের কাছে।

অন্যদিকে অর্থসচিব, ব্যাংক ও আর্থিক বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান, র‍্যাবের মহাপরিচালক, পুলিশের আইজি ও পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কাছে  বিএসইসি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে চিঠিতে এজিএম-পার্টির বিভিন্ন গ্রুপের নেতা হিসেবে যাবে নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যোগাযোগ করলে তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এজিএম ম্যানেজের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এ বিষয়ে সেলিম রেজা অর্থসূচককে বলেন, কে বা কারা এমন চিঠি দিয়েছে সেটি আমি জানি না। তবে অভিযোগগুলো সত্য নয়। আমি অনেক দিন ধরেই শেয়ার ব্যবসা করি।

তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো বাজার থেকে টাকা নিয়ে যেভাবে চলার কথা সেভাবে চলে না। বরং জনগণের টাকা নিয়ে তারা নিজেদের ইচ্ছা মতো ব্যবহার করে। এদের এই অপকর্মের কথা বললেই তারা বিভিন্ন অভিযোগ করে।

লুৎফুল গনি টিটুর মোবাইলে ফোন দেওয়া হলে তিনি ফোনটি রিসিভ করেন। কিন্তু এজিএম-পার্টি সংক্রান্ত ইস্যু তুলতেই কথা বুঝেন না বলে লাইন কেটে দেন। পরবর্তীতে তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি।

বাদল অর্থসূচককে বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা উচিত। ২২ থেকে ২৩ বছর ধরে পুঁজিবাজারের ব্যবসা বাদে অন্য ব্যবসাও করি। ব্যবসার খাতিরে বিভিন্ন লোকদের সঙ্গে চলতে হয়। এই চলার পথে অনেক শত্রু থাকতে পারে। এমন কেউ হয়তো বা অভিযোগ করেছে। আমার নাম আসার প্রশ্নই আসে না। এজিএমে সাধারণ মানুষ কথা বলে দাবি করেন তিনি।

আবু সুফিয়ন টিটুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোনো মন্ত্য না করে এই প্রতিবেদকে মামলার হুমকি দিয়ে লাইনটি কেটে দেন।

জানে আলম অর্থসূচককে বলেন, এগুলো যারা করছে,তাদেরকে বলেন সত্যতা বের করতে। কারা করছে, কেন করছে জানি না। তাদের স্বার্থে আঘাত লাগার কারণে তারা এসব করেছে।

মতিন শহীদ অর্থসূচককে বলেন, কী লিখছে, কে লিখছে আমি তা জানি না। তবে বিষয়টি সত্য নয়।

  • এজিএম-পার্টি সম্পর্কিত আরও দুটি নিউজ পড়তে চোখ রাখুন অর্থসূচকে অথবা আমাদের ফেসবুক-ফ্যান পেজে  www.facebook/arthosuchak

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ