ঐতিহ্যবাহী পিসার হেলানো টাওয়ার
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

ঐতিহ্যবাহী পিসার হেলানো টাওয়ার

বিপুল এই পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের পরিধি খুবই স্বল্প। এই পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কতই না অবাক করা বিষয়। কোথাও প্রকৃতির তৈরি করা বিস্ময়কর নানা উপাদান, আবার কোথাও মানুষের তৈরি অদ্ভুত সব বিষয়বস্তু।
পিসার টাওয়ার মানুষের তৈরি তেমনই এক আশ্চর্য অসম্পূর্ণতা। মূলত ভুল নির্মাণ কৌশলে তৈরি এই পিসার টাওয়ার, যা নির্মিত হয় আজ থেকে প্রায় কয়েক শতাব্দী আগে। পৃথিবীর আশ্চর্য স্থাপত্যের মধ্যে অনন্য এক স্থাপত্য হচ্ছে পিসার টাওয়ার। মানুষের ভুল থেকেই তৈরি এই হেলানো টাওয়ারটি যেন পিসার এই বেল-টাওয়ারকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

চলুন জেনে নিই কীভাবে টাওয়ারটি হেলে পড়লো, কেনই বা টাওয়ারটি ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে এতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে অজানা সব কাহিনী।

শিল্পীর হাতে আঁকা ছবি।

পিসা ইতালির প্রাচীন এক গৌরবময় প্রসিদ্ধ নগরী। ঐশ্বর্যের দিক দিয়ে শহরটি ছিল খুবই সমৃদ্ধশালী। এটা সেই শহর যেখানে ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নিয়েছিলেন জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলেই। সেই পিসা নগরীর ঐশ্বর্যময় জাঁকজমক ও উৎকর্ষতা পৃথিবীর মানুষের সামনে তুলে ধরার জন্য নির্মাণ করা হয় সূক্ষ্ম কারুকার্যে পূর্ণ অপূর্ব এক স্থাপনা। পিসা শহরের ক্যাথিড্রাল স্কয়ারের তৃতীয় প্রাচীনতম স্থাপনার একটি পিসার হেলানো টাওয়ার। এটি অবশ্যই পৃথিবীর অদ্ভুত দালানগুলোর একটি। আমাদের অনেকের কাছে যা ‘লিনিং টাওয়ার অব পিসা’ নামে পরিচিত। স্থাপত্যটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সার্চিও ও আর্নো নামের দুই নদী।

১৪ আগস্ট ১১৭৩ সালে এই টাওয়ার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। অভিজ্ঞ স্থাপত্যকর্মী এবং শত শত শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে গড়ে উঠে আকাশচুম্বী এই টাওয়ার। মধ্যযুগীয় এই স্থাপত্যশৈলী নির্মাণের প্রকৃত কারিগর কে ছিলেন সে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে গাগলিমো এবং বোনানো পিসানোকে এর নকশাকার হিসেবে ধারণা করা হয়। এই দুজন ছিলেন সেই সময়কার ইতালির পিসা নগরীর অধিবাসী ও নামজাদা শিল্পী।

পুরনো ছবিতে হেলানো টাওয়ার।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা যায়, দিওতিসালভি নামের একজন ব্যক্তি এই টাওয়ার নির্মাণের প্রকৃত স্থাপত্যবিদ। এছাড়াও স্যান নিকোলা নামের আরও একজন স্থাপত্যশিল্পী মিনারের ঘণ্টা স্থাপনের মূল কাজটি করেন। তবে পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে জিওভান্যি পিসানো এবং জিওভান্যি ডি সিমোনের মতো আরো কয়েকজন স্থাপত্যশিল্পীও এর নির্মাণ কাজে নিজেদের যুক্ত করেন। পরিকল্পনায় থাকা আটতলা বিশিষ্ট গোলাকার এই টাওয়ারের তৃতীয় তলার কাজ শেষ হতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ বছর।

প্রথম থেকেই কিন্তু এই টাওয়ারটিকে হেলানোভাবে তৈরি করা হয়নি। তিন তলা পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর থেকেই টাওয়ারটিকে ঘিরে ঘটে অদ্ভুত এক ঘটনা। হঠাৎই হেলতে শুরু করে টাওয়ারটি। বিশেষজ্ঞরা দেখতে পান, টাওয়ারটির নির্মাণ কৌশলে ভুল ছিল। টাওয়ারের নীচের নরম মাটি ও অগভীর ভিত এই অস্বাভাবিক হেলে পড়ার জন্যে দায়ী বলে ধারণা করা হয়। অদ্ভুত উপায়ে সেই হেলানো অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে রইল টাওয়ারটি, ভেঙেও পড়লো না। স্থপতিরাও হাল ছেড়ে না দিয়ে হেলে যাওয়ার মধ্যেই গড়তে থাকেন একের পর এক তলা।

বিজ্ঞানীদের নানা চিন্তা-ভাবনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণার মধ্যে চেষ্টা চলতে লাগলো কীভাবে আশ্চর্য এই স্থাপত্যকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, ফিরিয়ে দেওয়া যায় তার প্রারম্ভিক অবস্থান। অবশেষে ১৯৯৮ সালে এসে একটি উপায় খুঁজে পেলেন প্রকৌশলীরা। ২০০১ সালে প্রকৌশলীরা এক বিশেষ কাঠামোর মধ্য দিয়ে এই স্থাপনার নিচের আলগা মাটি সরিয়ে নেন। পাশাপাশি বিশাল পরিমাণ ওজনদার বস্তু হেলে পড়ার উল্টো দিকে চাপিয়ে দেয়া হয়। এতে রক্ষা পায় টাওয়ারটি।

বর্তমানে টাওয়ারটির হেলে পড়া বন্ধ হয়েছে এবং ৪০ সেন্টিমিটারেরও বেশি হেলানো অবস্থা থেকে সোজা অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে কয়েকশ বছর ধরে হেলে পড়তে পড়তে এখনো প্রায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ৯৯ ডিগ্রি কোণে হেলে আছে টাওয়ারটি। আর এটাই নাকি হেলানো টাওয়ারের স্বাভাবিক অবস্থা। ২০০৮ সালে ইঞ্জিনিয়াররা সর্বশেষ পরীক্ষা করে ঘোষণা দেন যে, ২০০ বছরের জন্য স্থাপত্যটি স্থিতিশীল রয়েছে এবং এখন থেকে টাওয়ারটি পর্যটকদের জন্য নিরাপদ। ফলে পর্যটকদের আনাগোনা পুনরায় বাড়তে থাকে এখানে।

অনুমান করা হয়, ১৬৫৪ সালে ভিভিয়ানী গ্যালিলিওর জীবনী লেখার সময় বেশ কিছু কাল্পনিক কাহিনীর আশ্রয় নেন। সূক্ষ্ম কারুকার্যময় টাওয়ারের সারি সারি কলাম আর একের পর এক খিলান উঠে গেছে চক্রাকারে। ২৯৪টি সিঁড়ি রয়েছে টাওয়ারটিতে। ১৮৩ ফুট উচ্চতার নয়নাভিরাম পিসার টাওয়ারটি হেলানো অবস্থার কারণেই আজও বিশ্বের এক অনন্য বিস্ময়!

ক্যাথিড্রাল স্কয়ার ও পিসার হেলানো টাওয়ার।

পিসার হেলানো টাওয়ার

টাওয়ারের ভিতরের প্যাঁচানো সিঁড়ি

স্থাপনাটি রক্ষার লক্ষ্যে ওজনদার বস্তু টাওয়ারের উল্টোদিকে চাপানো হয়।

টাওয়ারের ভিতরের দৃশ্য।

তথ্য : ইন্টারনেট

অর্থসূচক/ টি এম

এই বিভাগের আরো সংবাদ