আজ রথযাত্রা
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

আজ রথযাত্রা

‘রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,/ ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।/ পথ ভাবে আমি দেব রথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব—হাসে অন্তর্যামী।/’ কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর রথযাত্রার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবেই।

সনাতন ধর্মালম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ‘রথ যাত্রা’। রথ শব্দটি বলতেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে ৩টি সিংহাসনে জগন্নাথ, বলরাম ও তাদের বোন সুভদ্রা নিয়ে সাত বার ঘোরার ছবি। তারপর অন্য একটি রথে উঠিয়ে দড়ি ধরে টেনে হাজারো মানুষের তিন ভাইবোনকে মাসীর বাড়ি পৌঁছানোর দৃশ্য। আবার ৯ দিনের দিন আবার একই ভাবে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য। একে উল্টো রথ যাত্রা।

Roth 1

রথযাত্রা। ছবি মহুবার রহমান।

প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ ‘ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ’ ও ‘পদ্মপুরাণ’এ এই রথযাত্রা সম্পর্কে বলা হয়েছে, আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা অনুষ্ঠান শুরু করে একাদশীর দিন পূর্ণযাত্রা বা উল্টোরথ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যদিও আষাঢ় মাসের পুষ্যানক্ষত্রযুক্ত শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার নিয়ম। কিন্তু প্রতি বছর পুষ্যানক্ষত্রের সঙ্গে আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথির না হওয়ার কারণে শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই রথযাত্রা শুরু হয়ে থাকে। শ্রীকৃষ্ণের দ্বাপর যুগে লীলা সম্ভরণের পরবর্তীতে রথে থাকেন জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা, যা খর্বাকৃতি। ভক্তবৃন্দ ভক্তি সহকারে রথরজ্জুর মাধ্যমে রথকে টেনে এগিয়ে নিয়ে যান।

সনাতন ধর্মে রথযাত্রার ইতিহাস খুঁজতে দেখা যায়, পদ্মপুরাণে রথযাত্রায় শ্রীবিষ্ণুর মূর্তিকে রথারোহণ করানোর কথা বলা হয়েছে। আর পুরীর জগন্নাথদেবের মূর্তি যে শ্রীকৃষ্ণ তথা শ্রীবিষ্ণুরই আর একটি রূপ তা সকলেই স্বীকার করেন। তবে স্কন্ধপুরাণে সরাসরিভাবে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার কথা রয়েছে। সেখানে ‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র মাহাত্ম্য’ কথাটি উল্লেখ করে মহর্ষি জৈমিনি রথের আকার, সাজসজ্জা, পরিমাপ ইত্যাদির বর্ণনা দিয়েছেন। ‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র’ বা ‘শ্রীক্ষেত্র’ বলতে পুরীকেই বোঝায়।

উড়িষ্যার ‘উৎকলখণ্ড’ এবং ‘দেউল তোলা’ নামক প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল সত্যযুগে। সে সময় উড়িষ্যার নাম ছিল মালবদেশ। সেই মালবদেশের অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন, যিনি ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন।

Roth

রথযাত্রা উপলক্ষে র‍্যালি। ছবি মহুবার রহমান।

রথযাত্রার মূলে রয়েছে বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ ‘ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ’ ও ‘পদ্মপুরাণে’ও এই রথযাত্রার সম্পর্কে আরও  বিস্তারিত লেখা হয়েছে। কালের পরিক্রমায় হিন্দু সভ্যতার উত্থানকালে এ রথযাত্রা ‘শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা’ হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে। ‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র’ বা ‘শ্রীক্ষেত্র’ বলতে পুরীকেই বোঝায়। চৈতন্য মহাপ্রভুই মূলত নীলাচলে ভক্তিবাদের প্রবর্তন করেছিলেন। তাকে শ্রীকৃষ্ণের অবতার বলা হয়ে থাকে। তার প্রেম, ভক্তি ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এসব মূলমন্ত্রই ছিল তার জীবন দর্শন। আর মহাপ্রভুর জীবন-দর্শন শ্রী জগন্নাথের জীবন-দর্শন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।

বিখ্যাত চীনা পর্যটক ফা হিউয়ান খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতকে তৎকালীন মধ্য এশিয়ার খোটান নামক স্থানের যে বুদ্ধ রথযাত্রার বর্ণনা করেছেন তা অনেকাংশে পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফা হিউয়ানের বিবরণ অনুযায়ী ৩০ ফুট উঁচু ৪ চাকার একটি রথকে বিভিন্ন রত্ন, অলঙ্কার ও বস্ত্রে সুন্দরভাবে সাজানো হত। রথটির ৪ পাশে থাকত নানা দেবদেবীর মূর্তি। মাঝখানে স্থাপন করা হত বুদ্ধদেবের মূর্তি। এর পর সেই দেশের রাজা মুকুট খুলে, খালি পায়ে রথের সামনে এসে নতমস্তকে বুদ্ধদেবের উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলী দেওয়ার পর মহাসমারোহে রথযাত্রা শুরু হত। পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় আজও উদ্বোধন করেন সেখানকার রাজা। রাজপরিবারের নিয়ম অনুসারে যিনি রাজা উপাধি প্রাপ্ত হন, তিনি অর্থাৎ পুরীর রাজা জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাদেবীর পর পর তিনটি রথের সামনে এসে পুষ্পাঞ্জলী প্রদান ও সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথের সম্মুখভাগ ঝাঁট দেওয়ার পরই পুরীর রথের রশিতে টান দিয়ে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা শুরু হতো।

যশোরের অভয়নগরের ভাটপাড়া শ্রী শ্রী গুপ্তপুরি জগন্নাথ ধামের অধ্যক্ষ শ্রী রবীন্দ্রনাথ গোস্বামী অর্থসূচককে বলেন, শাস্ত্রে বলা আছে ‘রথস্থ বাম নং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’, অর্থাৎ রথের উপরে খর্বাকৃতি বামন জগন্নাথকে দর্শন করলে তার পুনর্জন্ম হয় না। তাই রথরজ্জু ধরে রথটানা মহাপুণ্য কর্ম বলে সনাতন ধর্মে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

Roth Zatra

রথযাত্রা উপলক্ষে ভক্তদের জমায়েত। ছবি মহুবার রহমান।

তিনি বলেন, উড়িষ্যার পুরীর জগন্নাথ ধামের রথযাত্রা জগদ্বিখ্যাত। রথযাত্রার প্রথমে পুরীতে শুরু হয়। তারপর পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে রথটান শুরু হয়ে থাকে। পুরীর রথযাত্রা উৎসব হচ্ছে বড় ভাই বলরাম বা বলভদ্র ও বোন সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন যাত্রার স্মারক। তিন জনের জন্য আলাদা আলাদা তিনটি রথ। রথযাত্রা উৎসবের মূল দর্শনীয় হল এই রথ তিনটি। প্রথমে যাত্রা শুরু করে বড় ভাই বলভদ্রের রথ। এই রথের নাম ‘তালধ্বজ’। রথটির ১৪টি চাকা। উচ্চতা ৪৪ ফুট। রথের আবরণের রঙ নীল। তারপর যাত্রা করে সুভদ্রার রথ। রথের নাম ‘দর্পদলন’। উচ্চতা প্রায় ৪৩ ফুট। এই রথের মোট ১২ চাকা। যেহেতু রথটির ধ্বজা বা পতাকায় পদ্মচিহ্ন আঁকা রয়েছে তাই রথটিকে ‘পদ্মধ্বজ’ও বলা হয়ে থাকে। রথের আবরণের রঙ লাল। সবশেষে থাকে জগন্নাথদেবের রথ। রথটির নাম ‘নন্দীঘোষ’। পতাকায় কপিরাজ হনুমানের মূর্তি আঁকা রয়েছে তাই এই রথের আর একটি নাম ‘কপিধ্বজ’। রথটির উচ্চতা ৪৫ ফুট। এতে ১৬টি চাকা আছে। প্রতিটি চাকার ব্যাস ৭ ফুট। রথটির আবরণের রঙ হলুদ। ৩টি রথের আবরণীর রঙ আলাদা হলেও প্রতিটি রথের উপরিভাগের রঙ লাল।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, যশোরসহ প্রতিটি জেলায় বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনসহ বিভিন্ন মন্দিরের পক্ষ থেকে রথযাত্রার আয়োজন করা হয়ে থাকে। রথযাত্রার অনুষ্ঠান কোথাও কোথাও ১ সপ্তাহ থেকে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত বিভিন্ন মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

অর্থসূচক/দেবব্রত/কে এম

এই বিভাগের আরো সংবাদ