মিউচ্যুয়াল ফান্ডের পাশাপাশি ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো জরুরি
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

মিউচ্যুয়াল ফান্ডের পাশাপাশি ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো জরুরি

সৈয়দ হামজা আলমগীর। দেশের অন্যতম শীর্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ইউনিভার্সাল ফিন্যান্সিয়াল সলিউশনস (ইউএফএস) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পরে বোস্টনে বিনিয়োগ ব্যাংক আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটস এ কাজ করেন। তিনি বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। সম্প্রতি মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন অর্থসূচকের সঙ্গে। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার গিয়াস উদ্দিন ও সাদিয়া খান

অর্থসূচকঃ মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতের বর্তমান অবস্থাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

হামজাঃ মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতের বর্তমান অবস্থাকে খুব একটা সন্তোষজনক বলা যাবে না। এ খাতটি অনেকটা অবমূল্যায়িত। মিউচ্যুয়াল ফান্ডের যে সম্ভাবনা আছে, তা থেকে অনেক পিছিয়ে এই খাত।

অনেক দেশেই বাজারমূলধনে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের অংশ ৫০ শতাংশের বেশি। এখানে তা মাত্র ২/৩ শতাংশের মতো।

দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে মিউচ্যুয়াল ফান্ড সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। এমনকি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষের বেশিরভাগও জানে না, মিউচ্যুয়াল ফান্ড কী, কেন, এর ভালো-খারাপ দিকগুলো কী? আসলে আমরা তাদের কাছে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ভালো-মন্দ তুলে ধরতে পারিনি।

মিউচ্যুয়াল ফান্ড সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই বলেই মানুষ ভালো রিটার্নের (আয় বা মুনাফা) সম্ভাবনা সত্ত্বেও সেখানে বিনিয়োগ না করে সঞ্চয়পত্র, এফডিআর ও ডিপিএসকে বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

Hamza UFS (2)

দেশের অন্যতম শীর্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ইউনিভার্সাল ফিন্যান্সিয়াল সলিউশনস (ইউএফএস) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হামজা আলমগীর। ছবি: মহুবার রহমান

অর্থসূচকঃ আপনি বললেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে মিউচ্যুয়াল ফান্ড সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। এর কারণ কী?

হামজাঃ এর জন্য প্রতিষ্ঠানসহ সবারই দায় রয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ পরিচিত গণ্ডির বাইরে যেতে ভয় পায়। তাই নতুন বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার আগ্রহ পর্যন্ত নেই বেশিরভাগ মানুষের। মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রেও তা ঘটেছে।

অন্যদিকে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোও এতদিন পর্যন্ত বেশ রক্ষণশীল পদ্ধতিতে কাজ করেছে। কেউ বড় আকারের ফান্ড নিয়ে আসতে চায়নি। তারা মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ব্র্যান্ডিং, প্রমোশনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। আমরা কেউই মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করিনি। তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করিনি, মিউচ্যুয়াল ফান্ড কী, কেন এখানে তারা বিনিয়োগ করবেন।

আবার যারা মিউচ্যুয়াল ফান্ড সম্পর্কে কিছুটা জানেন বা বিনিয়োগ করেছেন, তাদের অনেকের কাছে বিষয়টি নেতিবাচক ভাবমূর্তি নিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ সাল পরবর্তী মিউচ্যুয়াল ফান্ডের পারফরম্যান্সের কারণে। ২০১০ সালে বাজারে বাবল হয়েছিল। আমাদের বর্তমান বাজারের বেশিরভাগ মেয়াদী মিউচ্যুয়াল ফান্ড ওই সময়ের বা তার আগের। ২০১০ সালে ১০ টাকা এনএভির মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট ৪০/৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ইক্যুইটি পণ্যের মতো একই বিবেচনায় মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট কিনেছেন। কিন্তু  দুটি তো এক জিনিস নয়। পরবর্তীতে বাজারে ধস নামায় মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটের ব্যাপক মূল্য সংশোধন হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

অন্যদিকে ২০১০, ১১, ১২ সালের দিকে উচ্চ মূল্যে শেয়ার কিনেছেন অনেক সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে ফান্ডের ৭৫ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে রাখতে হয়। পরবর্তীতে বাজারের ব্যাপক দরপতনে শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর ইউনিটের সম্পদ মূল্যও (এনএভি) কমেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও আস্থা কমে যায়।

অর্থসূচকঃ পাশের দেশ ভারতেও পুঁজিবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের যে শক্ত অবস্থান, তার তুলনায় আমাদের এখানে একেবারেই নগন্য। এর পেছনে কারণ কী?

হামজাঃ এর কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত মানুষ বিশ্বাসই করে না যে, মিউচ্যুয়াল ফান্ডে টাকা বিনিয়োগ করলে ভালো রিটার্ন পাওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কি-না তা নিয়েও অনেকের মধ্যে সন্দেহ আছে। অনেক মেয়াদি ফান্ডের ইউনিট অভিহিত মূল্যের অনেক কম দামে কেনাবেচা হয় বাজারে। অনেক ফান্ড বছরের পর বছর ধরে যে লভ্যাংশ দিয়ে আসছে, তা-ও বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা পূরণ করার মতো নয়। এসব কারণে মিউচ্যুয়াল ফান্ড সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের ধারণা ভালো নয়। কিন্তু এর বাইরে বে-মেয়াদি অনেক ফান্ড যে ভালো পারফরম করছে, সে খোঁজ অনেকে রাখেনই না। অন্যদিকে আমারা বাজারের বর্তমান বিনিয়োগকারীদের বাইরে কাউকে মিউচ্যুয়াল ফান্ড সম্পর্কে ধারণা দিতে পারিনি, তাদের কাছে যাইনি। তাই এ শিল্প ততটা বড় হয়নি।

তবে বেশ কয়েকটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি বড় পরিসরে কাজ শুরু করেছে। আমাদের সবার ফান্ডগুলো যদি ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে পারে, তাহলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে থাকবে। ভালো রিটার্নের খবর নতুন নতুন বিনিয়োগকারীকে বাজারে টেনে আনবে। মূলত পারফরম্যান্স আর সেবা দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করতে হবে। বেমেয়াদি ফান্ডের ক্ষেত্রে ইউনিট সারেন্ডারের (ইউনিট ফেরত দেওয়া) ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে বিনিয়োগকারীর অর্থ ফেরত দিতে হবে, যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থসূচকঃ মেয়াদি এবং বে-মেয়াদি ফান্ডের মধ্যে চ্যালেঞ্জ কোথায়?

হামজাঃ মেয়াদি ফান্ডে আসলে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। কারণ একটি ফান্ড ১০ বছরের জন্য গঠিত হয়। স্পন্সর ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে ফান্ড গঠনের পর তা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত চলতে থাকে। এখানে ফান্ড থেকে সরাসরি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই। ফান্ডগুলো তালিকাভুক্ত হয় বলে সেকেন্ডারি মার্কেটে ইউনিট বিক্রি করে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে হয়। ফলে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ফান্ড ম্যানেজাররা কোনো বাড়তি টেনশন ছাড়াই ওই ফান্ড পরিচালনা করতে পারেন। ফান্ডের আকার যেহেতু নির্ধারিত, তাই ফান্ড ম্যানেজারদের আয়ও থাকে অপরিবর্তিত।

বে-মেয়াদী ফান্ডের ক্ষেত্রে কিন্তু চিত্রটা পুরো ভিন্ন। এখানে একজন বিনিয়োগকারী যে কোনো সময় ইউনিট সারেন্ডার (ইউনিট ফেরত দেওয়া) করতে পারেন। ফান্ডের পারফরম্যান্স তাদের আশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে সারেন্ডারের হার অনেক বেড়ে যেতে পারে। এতে দু’ধরনের সমস্যা। ফান্ডের অর্থ অলস থাকে না, বিনিয়োগে থাকে। বেশি পরিমাণ অর্থ ফেরত দিতে হলে শেয়ার বিক্রি করে দিতে হয়। বাজার পরিস্থিতি অনুকূল না থাকলে অনেক সময় লোকসানে শেয়ার বিক্রি করতে হতে পারে। অন্যদিকে সারেন্ডারের বিপরীতে সমহারে নতুন ইউনিট বিক্রি না হলে ফান্ডের আকার ছোটো হয়ে যায়।

তবে বে-মেয়াদি ফান্ডের এসব চ্যালেঞ্জই ফান্ড ম্যানেজারের শক্তি। তাকে সব সময় তৎপর থাকতে হয়, কীভাবে ফান্ডের পারফরম্যান্স আরও ভালো করা যায়। আরও ভালো সেবা দিয়ে বিনিয়োগকারীর আস্থা অর্জন করা যায়।

Hamza UFS (3)

অর্থসূচকের প্রতিবেদকের সঙ্গে দেশের অন্যতম শীর্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ইউনিভার্সাল ফিন্যান্সিয়াল সলিউশনস (ইউএফএস) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হামজা আলমগীর। ছবি: মহুবার রহমান

অর্থসূচকঃ সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্লান (সিআইপি) জন্য ইউএফএস কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে কী না?

হামজাঃ মিউচ্যুয়াল ফান্ডের চরিত্র হলো এখানে দীর্ঘ মেয়াদী বিনিয়োগ। এখানে হাইনেটওয়ার্থ বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগ করবে। আমরা মধ্য আয়ের লোকদের দিকে নজর দিচ্ছি। কারণ এখন এফডিআর রেট অনেক কমে গেছে। বিনিয়োগের ভালো জায়গা হতে পারে মিউচ্যুয়াল ফান্ড। তাদের লক্ষ্য করে আমরা পণ্যের ডিজাইন করছি। তবে বাজারে ওইভাবে প্রচার শুরু করিনি।

অর্থসূচকঃ আপনি বলছেন মিউচ্যুয়াল ফান্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে। আস্থা ফিরানোর জন্য আপানাদের অ্যাসোসিয়েশন থেকে কিছু করছেন বা পরিকল্পনা আছে?

হামজাঃ অ্যাসোসিশেন আছে। এতোদিন এর তেমন কোনো কার্যক্রম ছিল না। এখন সক্রিয় হচ্ছে। আমাদের বাজারের বেশির ভাগ ফান্ড ২০১০ সালের পরে এসেছে। ওই সময় থেকেই বাজারের খারাপ অবস্থা। লভ্যাংশ দেবে কোন জায়গা থেকে। তবে এর মধ্যেও ভিআইপিবি, ইউএফএসসহ কয়েকটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ভালো পারফরম্যান্স করে নিজেদের ভাবমূর্তি তৈরি করেছে।

আসলে বিজ্ঞাপন দিয়ে বা সভা সমাবেশ করে তো আস্থা ফেরানো যায় না। এর জন্য প্রয়োজন ফান্ডের ভালো পারফরম্যান্স। আমার মনে হয় প্রত্যকটি প্রতিষ্ঠান যার যার জায়গা থেকে আস্থা ফেরানোর জন্য কাজ করছে। পারফরম্যান্স আরও ভালো করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

তবে অ্যাসোসিয়েশন নানাভাবে ফান্ডের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। নীতি সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালাতে পারে।

অর্থসূচকঃ আমি যতটুকু জানি আপনাদের কয়েকটি ফান্ড অপারেশনে আছে এবং কয়েকটি প্রক্রিয়াধীন। আপনাদের ফান্ডগুলো অবস্থা কেমন?

হামজাঃ অপারেশনে থাকা আমাদের সবগুলো ফান্ড ভালো করছে। ইউএফএস পপুলার ইউনিট ফান্ড গত বছরের জুনের শেষের দিকে শুরু করেছি। ৭ মাস অপারেশন চালিয়ে ৮ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছি। বছর হিসাব করলে এটি ১২ বা সাড়ে ১২ শতাংশের মত হয়। প্রথম বছর লভ্যাংশ দেওয়া খুবই কঠিন। কারণ একটি ফান্ড বাজারে নিয়ে এসে অপারেশন শুরু করে লভ্যাংশ দেওয়া অনেক কঠিন। তবে আমরা খুশি। পদ্মা ইসলামী লাইফ গত বছরে আড়াই মাস অপারেশনে ছিল। আমরা ইতোমধ্যে অনেক মুনাফা রিয়ালাইজ করেছি। ফান্ডগুলোর এনএভি ভালো আছে।

অর্থসূচকঃ মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বোনাস বা রি-ইনভেস্টমেন্ট ইউনিট নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

হামজাঃ আমি মনে করে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ভালোর জন্য বোনাস বা রি-ইনভেস্টমেন্ট ইউনিট বাদ দেওয়া সময়ের দাবী। কোনোভাবেই এটি করা উচিত না। বোনাস দেওয়া মানে ফান্ডের সাইজ বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই না। নগদ লভ্যাংশই দেওয়া উচিত। যার ভালো লাগে সে বিনিয়োগ করবে। যার ভালো লাগবে না, তারা বিনিয়োগ করবে না। কারণ এটি হলো এফডিআরের মতো একটি পণ্য, যারা এখানে বিনিয়োগ করে তারা রিটার্নটা নগদই চায়। এফডিআরের মতই এটিকে ম্যানেজ করতে হবে। এই শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য নগদ লভ্যাংশের বিকল্প নেই।

অর্থসূচকঃ ইউএফএস মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বাইরেও কর্পোরেট অ্যাডভাইজরি সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। কী ধরণের সার্ভিস দিচ্ছে ইউএফএস?

হামজাঃ কর্পোরেট অ্যাডভাইজরি অনেক বড় শব্দ। কোম্পানির প্রাথমিক আর্থিক প্রতিবেদন, কোম্পনি গুছিয়ে দেওয়ার জন্য প্রি-আইপিও অ্যাডভাইজরি, ফান্ড রেইজিংসহ অনেক কিছু এর মধ্যে পড়ে। ইউএফএস ইতোমধ্যে প্রাণের জন্য একটি কমার্শিয়াল পেপার, ট্রাস্ট ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক এবং রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের বন্ডের কাজ করেছে। এই মুহুর্তে সবচেয়ে বড় বন্ড করছি বেস্টহোল্ডিংস লিমিটেডের (লা-মেরেডিয়ান) জন্য। এটির লিড অ্যারেঞ্জার ইউএফএস, আর আলফা ক্যাপিটাল হলো ইস্যু-ম্যানেজার।

অর্থসূচকঃ কমার্শিয়াল পেপার সম্পর্কে একটু বলেন।

হামজাঃ কমার্শিয়াল পেপার হচ্ছে অর্থায়নের একটি নমনীয় মাধ্যম। এটি এক ধরনের স্বল্প মেয়াদী ঋণপত্র। সাময়িক কিছু প্রয়োজন মেটানোর জন্যে অনেক সময় বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের জরুরি তহবিলের প্রয়োজন হয়। এ ধরনের চাহিদা পূরণের জন্য ব্যাংক ঋণ তেমন উপযোগী নয়। কারণ ব্যাংক ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়া তুলনামূলক জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এ ক্ষেত্রে কমার্শিয়াল পেপার নামের ঋণপত্র ইস্যু করে তুলনামূলক কম সময়ে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব।

Hamza UFS (1)

দেশের অন্যতম শীর্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ইউনিভার্সাল ফিন্যান্সিয়াল সলিউশনস (ইউএফএস) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হামজা আলমগীর। ছবি: মহুবার রহমান

অর্থসূচকঃ আপনারা তো বন্ড নিয়েও কাজ করছেন। আগামী দিনে বন্ডের সম্ভাবনা কেমন?

হামজাঃ বন্ড খুবই সম্ভাবনাময় একটি প্রোডাক্ট। আমাদের অর্থনীতি যে হারে বড় হচ্ছে সে গতি ধরে রাখতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ করে অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য বড় ও দীর্ঘ মেয়াদী তহবিল দরকার। শুধু ব্যাংক অর্থায়নের মাধ্যমে এই চাহিদা পূরণ করা যাবে না। তাছাড়া ব্যাংকের জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন বেশ ঝুঁকিপূর্ণও বটে। বন্ডের মাধ্যমে সহজেই এ ধরনের অর্থায়ন করা যায়।

বন্ডের সমস্যা হলো হাইনেটওয়ার্থ (আর্থিকভাবে অনেক সক্ষম) বিনিয়োগকারীরা এখানে আসতে চায় না। কারণ বন্ড কিনলে ৮ থেকে ১০ বছরের জন্য বিনিয়োগ আটকে যায়। বন্ড অবসায়িত না হওয়া পর্যন্ত পুরো বিনিয়োগ ফেরত পাওয়া যায় না। যে কোনো বিনিয়োগকারী কিন্তু নমনীয়তা চায়। বিনিয়োগ প্রত্যাহারের কতটা সহজ সুযোগ আছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চায়। বন্ডের একটি কার্যকর সেকেন্ডারি মার্কেট থাকলে হয়তো এই সমস্যা থাকতো না।

অর্থসূচকঃ গত কয়েক বছরে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করেছে। কিন্তু এদের কোনোটিই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। সেটি হলে তো বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সহজ সুযোগ তৈরি হতো।

হামজাঃ তালিকাভুক্তির একটি বড় সমস্যা হলো খরচ। সাইজ বড় হলে এই খরচ আরও বাড়ে। কিছু সুযোগ সুবিধা দিয়ে যদি এটি করা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ অনেক উপকৃত হবে। তাতে বন্ডের বাজারও বড় হবে। আরও সহজে বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবেন উদ্যোক্তারা। সরকারও এই সুযোগ নিতে পারবে। তখন সরকারি-বেসরকারি খাতে অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্প-কারখানার আধুনিকায়ন, নতুন ইউনিট স্থাপন ইত্যাদিতে নতুন গতি আসবে।

অর্থসূচকঃ পুঁজিবাজারের জন্য একটা ভালো খবর যে, সম্প্রতি নতুন-পুরনো সব অ্যাসেট ম্যানেজার সক্রিয় হয়েছে। এক বছরে কয়েকটি ফান্ড এসেছে বাজারে। আরও কয়েকটি বাজারে আসার প্রক্রিয়ায় আছে। কিন্তু এতো ফান্ড বিনিয়োগের জন্য কী পর্যাপ্ত স্ক্রিপ্ট আছে?

হামজাঃ স্ক্রিপ্টের কিছু সমস্যা তো আছেই। তবে আমরা আশা করি, এ সমস্যার সমাধানে সবাই যার যার অবস্থান থেকে উদ্যোগ নেবেন। দেশে লাভজনক বড় কোম্পানিগুলোর বড় অংশ এখনো পুঁজিবাজারের বাইরে। এদেরকে বাজারে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি অনেকগুলো কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার কথা। কিন্তু অনেক বছর ধরে কোনো অগ্রগতি নেই। এই বিষয়ে একটু জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন। ভালো কোম্পানি বাজারে আনার জন্য অর্থমন্ত্রণালয়,এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি এবং আইডিআরএসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) পরিবেশ নিয়ে অনেক উদ্যোক্তার উদ্বেগ রয়েছে। বিনিয়োগকারী নামধারী কিছু মুখচেনা লোক কোম্পানিগুলোকে টাকা-পয়সা দিয়ে তাদের সঙ্গে সমঝোতায় আসার জন্য চাপ দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় তাদের হাতে এজিএমে উদ্যোক্তারা হেনস্থার শিকারও হন। এই সমস্যাটির সমাধান কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে।

তাহলে যার যার জায়গা থেকে সমস্যা সমাধান করলে বাজারে ভালো কোম্পানি আনা সম্ভব। অন্যদিকে বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) ভয়ে অনেক ভালো কোম্পানি বাজারে আসছে না। এটি প্রতিরোধ করা গেলে দেশীয় অনেক ভালো কোম্পানিসহ বহুজাতীক কোম্পানি বাজারে আনা যাবে। বহুজাতীক কোম্পানিগুলো বাজারে আনতে পারলে লোকাল বিনিয়োগকারীদের জন্য অনেক সুখের খবর হবে।

অর্থসূচকঃ ইউএফএস নিয়ে আগামী দিনের পরিকল্পনা কী?

হামজা: পুরো বাজার গ্রো করলে ইউএফএসও গ্রো করবে। আমি একা ইউএফএসকে কোনো জায়গায় নিতে পারবো না। আমার লক্ষ্য হলো যে প্রফিট রিয়ালাইজ করবো, তার কমপক্ষ্যে ৭০ শতাংশ ইউনিটহোল্ডারদের দিয়ে দেওয়া। বাকীটা ফান্ডের ভালোর জন্যই রেখে দেব। আমি বিশ্বাস করি যারা আমার এখানে বিনিয়োগ করছে, তাদের খুশি করতে পারলে আমার ফান্ডের সমস্যা হবে না। আমার পরিকল্পনার কথা যদি বলি, তাহলে ইউনিটহোল্ডারদের যতটুকু সুবিধা দেওয়া যায়, তাই দিবে। বোন

অর্থসূচকঃ মিউচ্যুয়াল ফান্ড নিয়ে ব্র্যান্ডিং করার কোনো পরিকল্পনা আছে কী?

হামজাঃ অবশ্যই আছে। তবে আমি বিশ্বাস করি মানুষের কানে-মুখে যে ব্র্যান্ডিং হবে, সেটি হবে সবচেয়ে বড় মার্কেটিং। আমি ইউএফএসকে কানে-মুখে করে মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাই। আমার ভিত্তি শক্তিশালী করার পর পর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছে যাবো। তখন তাদের জন্য আলাদা পণ্য নিয়ে যাবো।

অর্থসূচক/গিয়াস

এই বিভাগের আরো সংবাদ