বঙ্গজের ২০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

বঙ্গজের ২০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি

বিস্কুট উৎপাদনকারী কোম্পানি বঙ্গজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে মোটা অংকের ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটির ২০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার ঘটনা উদঘাটন করেছে বলে দাবি করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

bangas

বঙ্গজ লিমিটেডের লোগো ও কয়েকটি ব্র্যান্ডের বিস্কুটের মোড়ক

বহু বছর ধরে বঙ্গজ লিমিটেড গ্র্যান্ড চয়েজ বঙ্গজ সল্টেড বিস্কুট, বঙ্গজ ফ্রুটি ক্রিম, গ্র্যান্ড চয়েজ ম্যাঙ্গো স্যালাইন্স, বঙ্গজ চকো ক্রিম বিস্কুটসহ মুখরোচক ও বাঙালীর স্বাদের ঐহিত্যবাহী সব বিস্কুট উৎপাদন করছে। বাজারে এসব বিস্কুট বেশ জনপ্রিয় হলেও কোম্পানিটি বছরের পর বছর নানা কৌশলে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগে জানা যায়, বঙ্গজ লিমিটেড পণ্য বিক্রির (সরবরাহ) প্রতিটি ক্ষেত্রে ভ্যাট চালান দেয় না। দৈনিক পণ্য বিক্রির তথ্য বিক্রয় হিসাবে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও মাসিক দাখিলপত্র (ভ্যাট রিটার্ন) সঠিকভাবে প্রদর্শন করে না।

প্রকৃত বিক্রির তথ্য গোপন ও বার্ষিক প্রতিবেদনে (সিএ ফার্ম কর্তৃক সত্যায়িত) প্রকৃত বিক্রয় তথ্য প্রদর্শন না করাসহ নানা কৌশলে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে শেয়ারবাজার তালিকাভূক্ত প্রতিষ্ঠানটি।

এসব অভিযোগে সম্প্রতি (৮ মে ২০১৭) মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর গুলশানে বঙ্গজের কর্পোরেট অফিসে অভিযান চালিয়ে কাগজপত্র ও বাণিজ্যিক দলিলাদি জব্দ করে।

পর্যালোচনা শেষে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ২০ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায়। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যশোর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটে মামলার সুপারিশ করা হয়।

চুয়াডাঙ্গার অটোমেটিক মডার্ন ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট কোম্পানি বঙ্গজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে এর আগে ২০১৪ সালে একইভাবে ৭৫ লাখ ৩০ হাজার টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ উঠে।

মূসক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বঙ্গজ লিমিটেড উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট চালান প্রদান না করে পণ্যমূল্য গোপন করে দীর্ঘদিন ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই প্রেক্ষিতে গত ৮ মে এনবিআরের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটির গুলশানের কর্পোরেট অফিসে (বাড়ি-৫০, রোড-০৩, গুলশান এভিনিউ টাওয়ার) অভিযান চালায় মূসক গোয়েন্দার একটি দল।

মূসক গোয়েন্দার দল প্রতিষ্ঠানের এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (একাউন্টস, কস্টিং এন্ড কর্মাশিয়াল) মো. রকিবুল হাসানকে ভ্যাট পরিশোধের দলিলাদি দেখানোর অনুরোধ জানান।

মো. রকিবুল হাসান জানান, ভ্যাট সংক্রান্ত দলিলাদি চুয়াডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠানের কারখানায় সংরক্ষণ করা হয়। পরে মূসক কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের মাসিক বিক্রয় তথ্য দেখানোর অনুরোধ জানান।

হাসান জানান প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় তথ্য সফটওয়্যারে (TALLY.ERP9) সংরক্ষণ করা হয়। পরে সফটওয়্যার থেকে এক মাসের তথ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাব রেজিস্টারের সাথে মেলানো হয়।

এতে ব্যাপক গরমিল পাওয়া যায়। পরে মূসক কর্মকর্তারা সফটওয়্যারে তথ্য যাচাই করে দেখতে পায়, সফটওয়্যারে প্রতিটি পণ্যের বিক্রয় তথ্য পণ্য, তারিখ ও মাস অনুযায়ী সংরক্ষিত রয়েছে।

পরে কর্মকর্তারা ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদিত সকল পণ্যের মাসভিত্তিক বিক্রয় তথ্য নিয়ে আসে। এছাড়া তল্লাশি করে আরো কিছু দলিলাদি জব্দ করা হয়।

কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বঙ্গজ লিমিটেড তার উৎপাদিত বিস্কুট সরাসরি নিজে বিক্রি না করে ঢাকা কমোডিটি ইম্পোর্ট লিমিটেড নামের অপর একটি প্রতিষ্ঠানের চালান ও মেমোর মাধ্যমে তা বিক্রি করে থাকে।

বঙ্গজ লিমিটেডের পণ্য ঢাকা কমোডিটি ইম্পোর্ট লিমিটেডের মাধ্যমে সরবরাহ বা বাজারজাত করার বিষয়টি ভ্যাট কর্মকর্তাদের বেশ দ্বিধায় ফেলে দেয়। সব কিছু পর্যালোচনা করে তারা এমন সিদ্ধান্তে আসেন, ভ্যাট ফাঁকি দেয়ার জন্য বঙ্গজ লিমিটেড এই কৌশলের আশ্রয় নিয়ে আসছে।

এ বিষয়ে বঙ্গজ লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. রবিউল হাসান জানান, ঢাকা কমোডিটি ইম্পোর্ট লিমিটেড বঙ্গজ লিমিটেডের একটি বিক্রয় কেন্দ্র। তবে এর আলাদা ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন রয়েছে।

বঙ্গজ লিমিটেড সরাসরি ভ্যাট দেয় না, ঢাকা কমোডিটির মাধ্যমে বিক্রয়কৃত পণ্যের বিপরীতে পৃথকভাবে ভ্যাট দিয়ে আসছে বলে জানানো হয়।

মূসক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সফটওয়্যারে ঢাকা কমোডিটি ইম্পোর্ট লিমিটেডের একই তথ্য দেখতে পায়। পরে ঢাকা কমোডিটি থেকে ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত সময়ের তথ্য নেয়া হয়।

এছাড়া মূসক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সেখান থেকে বিক্রয় তথ্যের প্রিন্ট কপি, মূসক-১৬, মূসক-১৭, মূসক-১৮, মূসক-১১, নিজস্ব ডেলিভারি চালান, সিএ রিপোর্ট ও রেজিস্টার বই জব্দ করে।

সূত্র আরো জানায়, কম্পিউটার সফটওয়্যারে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে দাখিলপত্রে প্রদর্শিত বিক্রয় তথ্যের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। আবার সিএ ফার্মের রিপোর্টের তথ্যের সাথেও দাখিলপত্রের তথ্যের কোনো মিল নেই। কম্পিউটার সফটওয়্যারের তথ্যের সাথেও সিএ ফার্মের রিপোর্টে প্রদর্শিত তথ্যের ব্যাপক অমিল।

এছাড়া ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কম্পিউটার সফটওয়্যারে প্রাপ্ত বিক্রয় তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রে সরবরাহকৃত পণ্যের কার্টন সংখ্যা, প্রতি একক পণ্যের ওজন ও বাণিজ্যিক মূল্য লিপিবদ্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে বঙ্গজ থেকে জানানো হয়, কম্পিউটার সফটওয়্যারে রক্ষিত বিক্রয় তথ্যের মধ্যে উল্লিখিত বাণিজ্যিক মূল্য অনুযায়ী মূসক প্রদান করা হয় না। কারণ অধিকাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে ট্যারিফ মূল্য বিদ্যমান রয়েছে।

বঙ্গজ লিমিটেড ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত

৭৯ কোটি ৮১ লাখ পণ্য বিক্রয়মূল্য গোপন করে।

বঙ্গজ লিমিটেড ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৭৯ কোটি ৮১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৬ টাকা ৫৮ পয়সা পণ্য বিক্রয়মূল্য গোপন করে। এসময় প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট চালান না দিয়ে ১১ কোটি ৯৭ লাখ ২৬ হাজার ৭০৯ টাকা ৯৯ পয়সা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।

মূসক আইন, ১৯৯১ এর ধারা ৩৭ (৩) অনুযায়ী ফাঁকিকৃত ভ্যাটের সুদ ৭ কোটি ১৬ লাখ ৫১ হাজার ৬৯৪ টাকা ৩৪ পয়সা। সুদসহ ফাঁকিকৃত ভ্যাটের পরিমাণ ১৯ কোটি ১৩ লাখ ৭৮ হাজার ৪০৪ টাকা ৩৩ পয়সা।

ফাঁকিকৃত ভ্যাট আদায়ের জন্য সম্প্রতি মূসক নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকে যশোর কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটে মামলা দায়ের করা হয়।

সূত্র আরো জানায়, বঙ্গজ লিমিটেড এর আগেও ৭২ লাখ ৩০ হাজার টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত ৯ মাসে এ ভ্যাট ফাঁকি দেয়।

এরমধ্যে ৪৭ লাখ ৩০ হাজার ১০৬ টাকা ৭১ পয়সা ভ্যাট ও এর সুদ বাবদ ২৫ লাখ টাকা। ২০১৪ সালে মূসক নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে এ ভ্যাট ফাঁকি উঠে আসে।

পরে চুয়াডাঙ্গা ভ্যাট বিভাগ থেকে এ পাওনা আদায়ে দাবিনামা জারি করে।কিন্তু বঙ্গজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোজাম্মেল হক এতে আপত্তি জানিয়ে মামলা দায়ের করেন।

এ বিষয়ে বঙ্গজ লিমিটেডের জিএম (সেলস) নুরুল আমিন রিপন অর্থসূচককে বলেন, আমরা মূসক গোয়েন্দাকে ভুল ধরিয়ে দিয়েছি। আমরা সেলস প্রাইস হিসেবে ভ্যাট দেই। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ভ্যাট দেই। মূসক গোয়েন্দারা অভিযানের সময় খুচরা মূল্যের ওপর কাগজপত্র নিয়ে গেছে।

সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী আমরা ট্যারিফ মূল্যের ওপর ভ্যাট দেই। আমরা ভ্যাট গোয়েন্দাকে ট্যারিফ মূল্যের ওপর ভ্যাট দেওয়ার বিষয়ে কাগজপত্র দিয়েছি।মূসক গোয়েন্দা কি অ্যাসেসমেন্ট করেছে তা আমাদের জানায়নি।

ভ্যাট ফাঁকির বিষয়ে তিনি বলেন, মূসক গোয়েন্দা আমাদের বিক্রির ওপর ভ্যাট ধরেছে।আমরা সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ট্যারিফ মূল্যের ওপর ভ্যাট দেয়।আমরা ভ্যাট ফাঁকি দেয়নি।

উদাহরণ তিনি বলেন, একটি কার্টন এর মূল্য ৩৬০ টাকা। এক কার্টনে ২ কেজি ৪০০ গ্রাম বিস্কুট থাকে।সরকার ট্যারিফ মূল্য অনুযায়ী প্রতি কেজি ৬০ টাকা ধরে ১৫% ভ্যাট দিতে বলেছে। অর্থাৎ প্রতি কার্টনে ১৫০ টাকার ওপর ১৫% ভ্যাট দিতে বলেছে।কিন্তু মূসক গোয়েন্দা ৩৬০ টাকার কার্টনের ওপর ভ্যাট ধরেছে।বলেছে ইনভয়েসের ওপর ভ্যাট দিতে হবে।

রিপন বলেন, যেহেতু মূসক গোয়েন্দা ট্যারিফ মূল্যের ওপর ভ্যাট নির্ধারণ না করে বিক্রয় মূল্যের ওপর ভ্যাট ধরে যশোর কমিশনারেটে মামলা করেছে।আমরা যশোর কমিশনারেটে তা মোকাবেলা করবো।

১৯৮৪ সালে শেয়ারবাজারে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মোট শেয়ারের ৫০ শতাংশ উদ্যোক্তা-পরিচালকদের কাছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ শেয়ার এবং অবশিষ্ট ৪২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ শেয়ার আছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।

অর্থসূচক/রহমত

এই বিভাগের আরো সংবাদ