১৫% ভ্যাটে সংকুচিত হবে এলপিজির ব্যবহার, দুর্ভোগ বাড়বে ভোক্তাদের
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

১৫% ভ্যাটে সংকুচিত হবে এলপিজির ব্যবহার, দুর্ভোগ বাড়বে ভোক্তাদের

নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন কার্যকর হলে লিকুফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ভ্যাট হিসাবের নতুন পদ্ধতির কারণে এলপি গ্যাসের প্রতি সিলিন্ডারের দাম ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাবে। এতে পরিবেশবান্ধব এই জ্বালানির ব্যবহার সংকুচিত হবে। অন্যদিকে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভোক্তাদের বাড়বে দুর্ভোগ ।

জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাপক চাহিদা থাকলেও প্রাকৃতিক গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। ফলে দেশের জেলা শহর থেকে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত গৃহস্থালি ও হোটেল-রেস্তোঁরায় রান্নার কাজে এলপি গ্যাস ব্যবহার করা হয়। আবাসিক ভবনে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখায় গত কয়েক বছরে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতেও রান্নার কাজে এলপিজির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কিন্তু আগামী ১ জুলাই নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এই খাতে। কারণ এতে এলপিজির উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে।

LPGবর্তমানে এলপি গ্যাসের প্রধান ভোক্তা হচ্ছেন মফস্বল শহর ও গ্রামীণ জনপদের মানুষ, যেখানে পাইপবেইজড গ্যাস (তিতাস, বাখরাবাদ, কর্ণফুলি প্রমুখ কোম্পানির গ্যাস) যায়নি। আর এই ভোক্তাদের বড় অংশই নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত। ভ্যাটের কারণে মাসে ৩শ টাকা ব্যয় বেড়ে গেলে সেটি তাদের জীবনযাত্রার উপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এজাজ আহমেদ।

এদিকে এলপি গ্যাসের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকরের বিষয়ে এ খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশও (এলওএবি) উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যে সংগঠনের পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে চিঠি দিয়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে অব্যাহতি চাওয়া হয়েছে। তারা আশা করছেন, দেশের সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে সরকার এলপি গ্যাসের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করবে।

অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ বলছেন, এলপিজির ব্যবহার জনপ্রিয় করার জন্য বিশ্বের অনেক দেশেই সরকার ভর্তুকি দেয়। এমনকি পাশের দেশ ভারতও সিলিন্ডার প্রতি প্রায় ৩শ টাকা ভর্তুকী দেয়। এখানে ভর্তুকি তো নেই-ই, উল্টো ভ্যাট নামের করের চাপে ব্যয় বাড়ার আশংকা রয়েছে। এটি এই খাতের সম্ভাবনাকে নষ্ট করবে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াবে। তাছাড়া এলপিজির পরিবর্তে মানুষ আবার গাছের ডালপালা ও কাঠের খড়ির প্রতি ঝুঁকলে তা পরিবেশের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

জানা গেছে, এলপিজি ব্যবহার উৎসাহিত করে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের উপর চাপ কমাতে ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনে এলপি গ্যাসের ট্যারিফ মূল্যের উপর ভ্যাট আরোপ করা হয়। বর্তমানে এ খাতে ভ্যাটের হার ট্যারিফ মূল্যের উপর ১৫ শতাংশ। এতে বাজারে মূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকায় এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু নতুন (২০১২ সালের ভ্যাট আইন) ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে ভ্যাট নির্ধারণ পদ্ধতি প্রত্যাহার করে সার্বজনীন ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের বিধান করা হয়েছে। এতে এলপি গ্যাসের দাম বেড়ে যাবে।

এ বিষয়ে এলপি গ্যাস বিপণন কোম্পানি বিএম এনার্জির (বিডি) প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল আলম বলেন, বিধি অনুসারে আমরা উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট দেবো। সেটি আবার ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে নিয়ে নেবো। তারা (ডিস্ট্রিবিউটর) নেবেন গ্রাহকের কাছ থেকে। তো চূড়ান্ত বিচারে গ্রাহকেরই ব্যয় বাড়বে। এটি এলপি গ্যাস ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত হরবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ দিন দিন কমে আসায় সরকার নতুন করে গ্যাসের কোনো আবাসিক সংযোগ দিচ্ছে না। আর এমনিতেও দেশের একটি বড় অংশে পাইপবেইজড গ্যাসের সরবরাহ নেই। এমন অবস্থায় চাহিদা পূরণে তারা এলপিজির ব্যবহার বাড়াতে নানাভাবে সংশ্লিষ্টদের উদ্বুদ্ধ করছেন। চাহিদা পূরণে অনেক উদ্যোক্তা এগিয়ে এসেছেন। বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে এ খাতে। কয়েক বছর আগেও দেশে এলপিজির বার্ষিক ব্যবহার ছিল ৯০ হাজার মেট্রিক টন, যা বেড়ে বর্তমানে ৪ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। ভ্যাটের কারণে সিলিন্ডারের দাম বেড়ে গেলে পুরো উদ্যোগটিই বড় হোঁচট খাবে।

এ বিষয়ে ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুল হক অর্থসূচককে বলেন, এক সময় আমদানি পর্যায়ে এ পণ্যের উপর কোনো ভ্যাট ছিল না। নতুন আইনে এটি করা হয়েছে। ফলে সিলেন্ডার প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি গুণতে হবে ভোক্তাদের।

তিনি বলেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ একেবারেই অপ্রতুল। বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের জন্য এই গ্যাস প্রয়োজন। বাসা বাড়ির পাশাপাশি শিল্প খাতেও  তাই এলপি গ্যাস কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু বাড়তি ভ্যাটের কারণে দাম বাড়লে এলপি গ্যাস ব্যবহারের উৎসাহে ভাটা পড়বে। অন্যদিকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে যে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে এলপিজি ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে সরকারের এ ভর্তুকি সাশ্রয় হবে। ভোক্তা ও প্রান্তিক মানুষের পাশাপাশি দেশের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা সরকার বাজেট পাসের সময় ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে বলে আশা করেন তিনি।

একই মত প্রকাশ করে বসুন্ধরা এলপি গ্যাস লিমিটেডের অর্থ ও হিসাব বিভাগের প্রধান মাহবুব আলম অর্থসূচককে বলেন, সরকার এলপি গ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এলপি গ্যাসে ভ্যাটের হার বেড়ে যাওয়ায় এই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি থেমে যাবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে এলপি গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১০ লাখ টন। এর বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন ও বোতলজাত হচ্ছে ৫ লাখ টনের মতো। এলপি গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে এলপিজি বোতলীকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন পদ্ধতি সহজ করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি ১০টির মতো প্রতিষ্ঠান এলপিজি প্ল্যান্ট  স্থাপন করে উৎপাদন শুরু করেছে। কিন্তু বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশ কাজে লাগাতে পারছে। সাধারণ মানুষকে এলপিজি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার কাজটি ধীরে ধীরে এগুচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ পরিবার রান্নার কাজে পাইপলাইনে গ্যাস ব্যবহার করেন। যা দেশের মোট পরিবারের মাত্র ৭ শতাংশ। বাকি ৯৩ শতাংশ পরিবার এ সুবিধা পাচ্ছে না। তাদের জন্য বিকল্প জ্বালানি হতে পারে এলপি গ্যাস। কিন্তু  দাম সহনীয় না থাকলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ পরিবার তা ব্যবহার করতে পারবে না।

এই বিভাগের আরো সংবাদ