৪ মাসে ধর্ষণের শিকার ৩২৮ জন
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

৪ মাসে ধর্ষণের শিকার ৩২৮ জন

সমাজে নারী নিগ্রহ ও ধর্ষণের ঘটনা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম ৪ মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) ১ হাজার ৫৬৬ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩২৮ জন। এদের মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫৫ জন। ধর্ষণের পরই খুন করা হয়েছে ১৫ জনকে।

নারী ও শিশু মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক পরিসংখ্যানে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এতে আরও জানানো হয়েছে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন আরও ৬০ জন নারী। শ্লীলতাহানীর শিকার হয়েছেন ২৬ জন; যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৫৬ জন এবং শারীরিক নির্যাতিত হয়েছেন ৯৩ জন নারী। এর মধ্যে পুলিশের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন ১৬ জন নারী।

no rape

ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৮৯৬ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শুধু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৫০ জন নারী। এর মধ্যে ৮৪০ জন একক ধর্ষণ; ১৬৬ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর ধর্ষণের পরই হত্যা করা হয়েছে ৪৪ জনকে।

গত বছর ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন আরও ১৬৫ জন। শ্লীলতাহানীর শিকার হয়েছেন ১২০ জন; যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৮০ জন এবং শারীরিক নির্যাতন হয়েছেন ৪১৩ জন নারী। ওই সময়ে শুধু পুলিশের হাতে নির্যাতিত ২২ জন নারী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণ বাড়ার জন্য চরম নৈতিক অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতি, মাদকের বিস্তার, বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতাই দায়ী। সামাজিক অস্থিরতা, অপসংস্কৃতি, আকাশ সংস্কৃতি, অশ্লীলতা, ঘুষ, দুর্নীতিসহ নানা কারণে দিনে দিনে সামাজিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি অশ্লীলতার আগ্রাসনে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক অবক্ষয়ে ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অভাব ও সামাজিক অবক্ষয়ে ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অপরাধী যতই শক্তিশালী হোক না কেন তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

তিনি বলেন, নির্যাতনের শিকার নারী প্রায়ই অভিযোগ করতে চায় না। কারণ অভিযোগের পর আবারও নির্যাতনের শিকার হয় তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ষণ ভিডিও দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। এই ধারা থেকে বের হতে সাইবার ক্রাইম আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৪ মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) ৪৫৩ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩৮ জন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৬ জন। আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬ জনকে।

এছাড়া ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন আরও ২৯ জন। ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে ৪ জন। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১২২ জন; যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৬৯ জন নারী। গত চার মাসে ৪৫৩টি নির্যাতন ঘটনার বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ২০১টি।

সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৬ জন নারী। এই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭২৪ জন নারী। এর মধ্যে ৪৪৪ জন একক ধর্ষণ এবং ১৯৭ জন গণধর্ষণের শিকার। ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে ৩৭ জনকে।

২০১৬ সালে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন আরও ৬৫ জন। ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে ৮ জন। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪১০ জন; যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১৫৬ জন নারী।

আসকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে মোট ১ হাজার ৫৯৬টি ঘটনার বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ২৯৭টি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, বিচারহীনতার কারণে সমাজে ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধ বেড়ে চলেছে। অপরাধের বিচার ঠিকমতো হয় না বলে অপরাধ কমে না।

তিনি বলেন, শাস্তি হলে সবাই বুঝতে পারতো, অপরাধের জন্য সাজা পেতে হবে। ফলে সবাই সাবধান হতো। আগে মানুষ লুকিয়ে অপরাধ করতো। অপরাধের সাজা না হওয়ায় এখন প্রকাশ্যে অপরাধ হচ্ছে। সেটা অবশ্যই সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রমাণ। সমাজের সামগ্রিক নৈতিকতায় দুর্বলতা থাকলে অপরাধ আরও বাড়ে।

সুলতানা কামাল বলেন, অপরাধের বিচার হতে হবে। নারীর প্রতি মনোভাব বদলাতে হবে। আইন যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে; আইন ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্টদের মনোভাব বদলাতে হবে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, বর্তমানে পরিচিতদের মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনা বেশি হচ্ছে। সবকিছুর মূলে আছে মূল্যবোধের অভাব। অবাধ পর্নোগ্রাফির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বল্প পরিচয়ের পর মেলামেশাসহ বিদেশি বিভিন্ন চ্যানেলে যা দেখানো হয়- তা ধর্ষণের মতো অপরাধকে উসকে দিচ্ছে। বিজ্ঞাপন দেখে ছোটরাও বুঝতে পারছে, কীভাবে শরীর উত্তেজিত হয়? আবার ছেলে-মেয়েরা ইন্টারনেটে কি দেখছে- সেদিকে নজর দেন না অভিভাবকরা।

তিনি বলেন, ধর্ষণের পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিষয়টি গোপন রাখতে চায় পরিবার। তবে বর্তমানে সে চিত্রের কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। ধর্ষণের পর কেউ কেউ মামলা করছেন। কিন্তু ‘লিগ্যাল প্রসিকিউশন’ এখন পর্যন্ত নারীবান্ধব হয়নি। আমরা এখন পর্যন্ত ভিকটিম ও সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারিনি। এটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

সালমা আলী বলেন, ধর্ষণ রূখতে সামাজিক আন্দোলন খুব জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। ধর্ষণ প্রতিরোধে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। ধর্ষককে দৃষ্টান্তমূলক সাজার আওতায় আনতে হবে।

অর্থসূচক/মুন্নাফ/এমই/

এই বিভাগের আরো সংবাদ