ভিক্ষুদের ইফতার বিতরণে সম্প্রীতির ডাক
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

ভিক্ষুদের ইফতার বিতরণে সম্প্রীতির ডাক

রমজান মাসে দরিদ্র মানুষের মাঝে বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, দানশীল ব্যক্তিদের ইফতার বিতরণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। এছাড়া মসজিদে ইফতার বিতরণও নিয়মিত চিত্র। তবে ভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় থেকে মুসলিমদের জন্য ইফতার বিতরণ সাধারণত চোখে পড়ে না। রাজধানীর কমলাপুর রেল স্টেশন সংলগ্ন বাসাবো এলাকায় অবস্থিত ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যতিক্রমী কাজটি করে যাচ্ছে। গত ১৬ বছর ধরে হতদরিদ্র মুসলমানদের মধ্যে ইফতার বিতরণ করে আসছেন বিহারটির ভিক্ষুরা। প্রতি বছরের মতো এ বছরও রমজান উপলক্ষ্যে ইফতার বিতরণের ব্যবস্থা করেছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের এ উপাসনালয়টি।

ইফতারি বিতরণ করছেন ভিক্ষু শুদ্ধানন্দ; ছবি মহুবার রহমান

বিহারটির ভিক্ষুরা বলছেন, মানুষে-মানুষে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতি স্থাপনই তাদের মূল লক্ষ্য। ধর্ম নয়, মানবতাই তাদের উদ্বুদ্ধ করছে।

আজ রোববার পয়লা রমজানে সরেজমিনে দেখা যায়, ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের মূল ফটকের বাইরে লোকজনের ভিড়। ফটকের ভেতরে অতীশ হলের সামনে ইফতার বিতরণের আয়োজন চলছে। বড়সড় একটা টেবিলের ওপর ইফতারির প্যাকেট সাজানো।

বিকেল ৫টা ১৫ মিনিট। টেবিলের সামনে ইফতার নিতে আসা মানুষের দীর্ঘ লাইন। একজন করে আসছেন, মহাবিহারের অধ্যক্ষের হাত থেকে ইফতারির প্যাকেট নিচ্ছেন।

পুরো রমজান মাসজুড়ে চলবে এ কার্যক্রম। আশপাশের এলাকার অসহায়, দুস্থ্ রোজাদারদের মধ্যে প্রতিদিন এভাবে ইফতার বিতরণ করবে বিহার কর্তৃপক্ষ।

ইফতারির ছোলার মান দেখছেন এক ভিক্ষু ; ছবি মহুবার রহমান

বিহারের একজন ভিক্ষু নিভ্যুতিনন্দ  বলেন, আমরা প্রতি বছরই ইফতার বিতরণ করে থাকি। আজ প্রথম রমজান উপলক্ষ্যে ৩০০ জনকে ইফতার দিচ্ছি। লোক বাড়লে প্যাকেটের পরিমাণ বাড়িয়ে দিই। অসহায় মানুষকে অন্ন দেওয়াটা খুব আনন্দের।

মন্দিরে ইফতার নিতে আসা ব্যক্তিদের অধিকাংশই নারী। এখানে প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে ইফতার দেওয়া হয়। প্যাকেটে থাকে চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু, ছোলা ভুনা, শাহি জিলাপি ও মুড়ি।

ইফতারি নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ বৃদ্ধা মমতাজ বেগম। তিনি  বাসাবোর মাণ্ডা এলাকায় থাকেন। তিনি অর্থসূচককে বলেন, আমি প্রতিবছরই এখানে ইফতার নিতে আসি। এখান থেকে ইফতার নিতে আমার ভালো লাগে।

ইফতার নিতে বাসাবোর আহমেদাবাগ থেকে আসা বৃদ্ধা মহোরজান বেগম লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে বলেন, রোজা রেখে বিকেলে প্রতিদিন এখান থেকে ইফতার নিয়ে যাই। ৫ বছর ধরে নিচ্ছি। খুব ভালো লাগে। প্রাণটা ভরে যায়।

সালেহা খাতুন বলেন, আমরা গরিব মানুষ, আমাগোরে ইফতার দেয়। দিন শেষে এটা অনেক আনন্দের।

বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পুলিশের সাবেক ডিআইজি পি আর বড়ুয়া বলেন, রোজাদারদের হাতে ইফতার তুলে দিতে খুব ভালো লাগে। গত বছর প্রতিদিন ৫০০ প্যাকেট করে ইফতার দেওয়া হয়েছিল। আর্থিক কারণে আমাদের একটু সমস্যা হয়। আশা করছি, পরবর্তী বছরগুলোতেও এ কার্যক্রম চালু থাকবে।

ইফতারির বিভিন্ন পদ প্যাকেটে দিচ্ছেন এক ভিক্ষু; ছবি মহুবার রহমান

ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের অধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি সঙ্গনায়েক শুদ্ধানন্দ মহাথের বলেন, ১৬ বছর ধরে নিজ হাতে ইফতার দেই। গত বছর ১৩ লাখ টাকার ইফতার দিয়েছি। এবছর প্রথম রোজাতেই ১ লাখ টাকার ইফতার দিচ্ছি।

তিনি বলেন, রোজাদাররা সারা দিন রোজা রাখেন। দিন শেষে ইফতার পাওয়ার পর তাদের আনন্দে ভরা উজ্জ্বল মুখ আমাকে মুগ্ধ করে। ভালো লাগে।

ইফতারি বিতরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে শুদ্ধানন্দ মহাথের বলেন, আমরা সবাই মানুষ। মানুষকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে মানুষে-মানুষে বন্ধুত্ব ও প্রীতি বাড়বে। একে-অপরের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে। সমাজ শান্ত হবে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামবে। আমরা এক হব, ভালো থাকব, সুখে থাকব। আর সবার মধ্যে সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের লক্ষ্য।

প্রসঙ্গত, ১৯৬০ সালে বিহারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এখানে সাতশোরও বেশি অনাথ শিশু আছে। বিহারই তাদের পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে থাকে।

অর্থসূচক/মুন্নাফ/এসএম

এই বিভাগের আরো সংবাদ