টেকসই উন্নয়নে বাজেটে ইআরএফের ৭ প্রস্তাব
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » জাতীয়

টেকসই উন্নয়নে বাজেটে ইআরএফের ৭ প্রস্তাব

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মমুখী শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, ব্যাংক কমিশন গঠন,পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল করাসহ আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে ৭ প্রস্তাব দিয়েছে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)।

আজ শনিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় সংগঠনটি এসব প্রস্তাব তুলে ধরে।

Muhit With ERF (1)

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ছবি: মহুবার রহমান

এসময় অর্থ সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. ফজলে কবির, এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান, ব্যাংকিং বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান, ইআরএফ সভাপতি সাইফুল ইসলাম দিলাল, সাধারণ সম্পাদক ও অর্থসূচক সম্পাদক জিয়াউর রহমানসহ সংগঠনটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে ইআরএফের বাজেট প্রস্তাবনা-

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মমুখী শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো: আগামী বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছে ইআরএফ। সংগঠনটি মনে করে, জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপান্তরে নানামুখী প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। বিশেষ করে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা, সাধারণ শিক্ষার পরিবর্তে কর্মমুখী শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি। এ লক্ষে সারাদেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, বিদ্যমান ইনস্টিটিউটগুলোর মান উন্নয়ন, দক্ষ ট্রেইনার নিয়োগ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ সরবরাহের জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করে সংগঠনটি।  এছাড়া সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এনে সেখানেও কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্প খাতের জন্য মধ্যস্তরের কর্মকর্তা তথা ম্যানেজার তৈরির বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।  তরুণদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন ট্রেডে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে কথিত বিদেশি এক্সপার্টদের উপর নির্ভরতা কমে আসবে।

বিদেশি কর্মীদের আয়ে কর বাড়ানো ও মনিটরিং জোরদার করা:  দেশে বিভিন্ন খাতে বৈধ-অবৈধভাবে প্রায় ৪ লাখ বিদেশি নাগরিক কর্মরত আছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এদের সবাই যে প্রকৃতই বিশেষায়িত দক্ষতাসম্পন্ন এমন নয়। অথচ এরা বেতন-ভাতা বাবদ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ মুদ্রা পাচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। কেউ আবার নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুসারে, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিরা বছরে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার তাদের দেশে পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশের ৯০ লাখ প্রবাসীর শ্রমে-ঘামে পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক এভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।  বিভিন্ন প্রফেশনাল বডির অভিযোগ, দেশে দক্ষ জনবল আছে, এমন ক্ষেত্রেও বিপুল সংখ্যক বিদেশিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ও হচ্ছে। এর পেছনে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হীনমন্যতার পাশাপাশি নানা অসাধু উদ্দেশ্য আছে বলে মনে করে সংগঠনটির নেতারা। তাদের অভিযোগ, বিদেশীদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দেখিয়ে, নকল জনবল দেখিয়ে তাদের মাধ্যমে অনেকে বিদেশে মুদ্রা পাচার করছেন। অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, বৈধ কর্মীদের আয়ে কর বাড়ানো, প্রাপ্ত বেতন-ভাতার একটি নির্দিষ্ট অংশ স্থানীয়ভাবে ব্যয় করার শর্ত আরোপ, নানা কৌশলে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

Muhit With ERF (2)

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে ইআরএফ সদস্যদের প্রাক-বাজেট আলোচনা। ছবি: মহুবার রহমান

ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা : দেশের ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়া, অনিয়ম-দুর্নীতি সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাত বেশ চাপে আছে। ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর তীব্র প্রভাব পড়বে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে দুই বছর আগে বাজেট প্রস্তাবনায় ব্যাংক কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হলেও তা এখনও হয়ে উঠেনি। ব্যাংক কমিশন গঠন খুব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল করা:  আমাদের অর্থনীতি বিবেচনায় পুঁজিবাজারের আকার খুবই ছোট। জিডিপি-বাজার মূলধন বিবেচনায় আমরা বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ এমনকি ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলংকার চেয়েও পিছিয়ে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে পুঁজিবাজারে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।  গত কয়েক বছরে পুঁজিবাজারে অনেকগুলো সংস্কার করা করেছে। তার কিছু সুফলও মিলতে শুরু করেছে। তবে বাজারের সম্ভাবনাকে দ্রুত কাজে লাগাতে আরও কিছু ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি-

ক. বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তি বেশ কিছু বহুজাতিক কোম্পানি এ দেশে চুটিয়ে ব্যবসা করছে। এসব কোম্পানি তাদের মুনাফার বড় অংশই নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে পুনর্বিনিয়োগের পরিমাণ খুবই কম। দেশের সাধারণ মানুষ এসব মুনাফার কোনো ভাগই পাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার কথা বলা হলেও কোনো সাড়া মিলছে না। অথচ প্রতিবেশী ভারতে ইউনিলিভার, নেসলে, নোভার্টিস, এসকেঅ্যান্ডএফ, সনোফি, মেটলাইফসহ প্রায় সব বড় বহুজাতিক কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত। এমন অবস্থায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একদিকে বিশেষ কর সুবিধা, অন্যদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া যেতে পারে।

খ. তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার কমানোঃ আমাদের কর্পোরেট করের হার অনেক দেশের চেয়ে বেশি। পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার কমানো যেতে পারে। কর হার কমলেও এ খাত থেকে রাজস্বের পরিমাণ কমার কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ তালিকাভুক্ত হলে একটি কোম্পানির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা বেড়ে যায় বলে কোম্পানিগুলোর পক্ষে কর ফাঁকি দেওয়া বেশ কঠিন।

গ. লভ্যাংশ আয়ে কর সুবিধাঃ বর্তমানে লভ্যাংশ আয়ে ১০ শতাংশ উৎসে আয়কর কর্তন করা হয়। এটিকে চুড়ান্ত হিসেবে নিষ্পত্তির প্রস্তাব করছি। বর্তমানে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ-আয় করমুক্ত। এটিকে বাড়িয়ে ন্যুনতম ২ লাখ টাকা করা প্রয়োজন। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার ধারণ করার প্রবণতা বাড়বে, যা বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে।

ঘ. রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার অফলোড করাঃ রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়ার ব্যাপারে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু নানা অজুহাতে কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসা এড়িয়ে যাচ্ছে। তালিকাভুক্ত করা গেলে কোম্পানিগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা বাড়বে; কার্যক্রমে আরও গতি আসবে। তাতে কম শেয়ার হাতে থাকলেও সরকার বর্তমানের চেয়ে বেশি কর-ভ্যাট ও লভ্যাংশ পাবে।

ঙ. কার্যকর বন্ড মার্কেট চালু করাঃ আমাদের পুঁজিবাজার এখনও ইক্যুইটি নির্ভর। বাজারের ব্যাপ্তি বাড়াতে এখানে একটি কার্যকর বন্ড মার্কেট গড়ে তোলা দরকার। কর প্রণোদনাসহ কিছু নীতি সমর্থন দিয়ে হলেও এই বাজার গড়ে তোলা দরকার। তখন সরকারও এখান থেকে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে।

অর্থ পাচার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থাঃ গত দেড়-দুই দশ ধরেই ব্যাপকভাবে মুদ্রা পাচারের কথা শোনা যাচ্ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এটি অনেক বেড়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশির বাড়ি কেনায় এটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি (জিআইএফ) এর রিপোর্ট অনুসারে, শুধু ২০১৪ সালেই দেশ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এক সময় দেশের অর্থনীতি অন্ত:সার শুন্য হয়ে পড়বে। তাই মুদ্রা পাচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাচার বন্ধে আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং এর রাশ টেনে ধরতে হবে। এ লক্ষ্যে বিআইএফইউকে আরও শক্তিশালী করা, প্রয়োজনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।  গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্থায়ী সম্পদের ক্রেতাদের তালিকা তৈরি করা যেতে পারে।

রেমিট্যান্স প্রবাহে গতি ফেরানোঃ দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৭ শতাংশ কমে গেছে। এটি অর্থনীতিকে বড় একটি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ চাঙা করতে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে- ক. মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মনিটরিং বাড়ানো খ. বিনা ফি’তে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা করা গ. রেমিট্যান্সের অর্থ বিনিময়ে ভর্তুকি দেওয়া

দ্রুত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠন: নানামুখী চাপকে উপেক্ষা করে সরকার  দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন (এফআরএ) প্রণয়ন করেছে। আমরা জানি এই আইন পাশের ব্যাপারে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আপনার অনমনীয় অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। এর জন্য আরেকবার আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, ২০১৫ সালে সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া এই আইনটি বাস্তবায়নে আমরা এখন পর্যন্ত একটি কাউন্সিল গঠন করতে পারিনি। দ্রুত এই কাউন্সিল গঠন করা দরকার।

নৌপথ ও রেলপথের পুনরুজ্জীবন: নৌপথ এবং রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের ব্যয় সড়ক পথের চেয়ে অনেক কম। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব। গত দুই তিন দশকে  নানা অবহেলায় নৌপথ ও রেলপথ  তার গুরুত্ব হারিয়েছে। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এই দুটি মাধ্যমকে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরী। আগামী বাজেটে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও কার্যকর দিক নির্দেশনা প্রয়োজন।

আজম/এসএম

এই বিভাগের আরো সংবাদ