ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ধোঁয়াশা, পদত্যাগের হুমকী ভাইস-চেয়ারম্যানের
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ধোঁয়াশা, পদত্যাগের হুমকী ভাইস-চেয়ারম্যানের

বেসরকারি খাতে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক নিয়ে নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী তথা জামায়াতমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ব্যাংকটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা হয়। অথচ এরই মধ্যে ব্যাংকটি ফের স্বাধীনতা বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন খোদ ব্যাংকের ভাইস-চেয়ারম্যান সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ।

বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এই অভিযোগ করেন। এতে তিনি লিখেন, ”অশুভ শক্তি ইশারায় আমার শত চেষ্টার পরেও রাষ্ট্র বিরোধী শক্তি পূনর্বাসিত হয়েছে এবং জাতির পিতার খুনীদের সাথে সংশ্লিষ্টরা ফিরে আসছেন নেতৃত্বে। আগামী বৎসর এই ব্যাংকটিকে রাষ্ট্র বিরোধী কাজে ব্যবহার করার নীল নকশা সম্পাদন হচ্ছে।”

অন্যদিকে অন্য একটি অনলাইন পোর্টালে তিনি আরও স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে এ অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, “ইসলামী ব্যাংক আবারও স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে চলে গেছে।”

তাকে পরিচালনা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও ফেসবুক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেছেন সৈয়দ আহসানুল আলম। তিনি লিখেছেন,  আমার উপর সরে দাঁড়ানোর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে নিয়ে প্লাস-মাইনাসের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তাই পরিচালনা পর্ষদ ও ভাইস চেয়ারম্যানের পদে দায়িত্ব পালন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার সরে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

অর্থসূচককে তিনি বলেন, এখন আমাদের ক্ষমতা এতো সীমিত করে রাখা হয়েছে যে, এজেন্ডাভুক্ত বিষয় ছাড়া ব্যাংক কর্মকর্তারা আমাদের কোনো নির্দেশনা মানছে না। সম্পূর্ণ অবাধ্য হয়ে পড়েছে ইসলামী ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ছে ইসলামী ব্যাংক।  এ ব্যাপারে আমি কিছু করতে পারছি না। তাই অন্য পরিচালকদের মতো ৬০  হাজার ২০০ টাকা আর ব্যাংকের গাড়ি চালানোর জন্য আমি এই ব্যাংকে থাকার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি না।  যে কোনো সময় আমি পদত্যাগ পত্র পাঠাতে পারি এই হলো কথা।

তবে পদত্যাগের বিষয়টি ব্যাখা করে তিনি বলেন, আমার জায়গা থেকে হঠকারীভাবে পদত্যাগপত্র পাঠানো যায় না। আমার পজিশন থেকে যদি আমি হঠাৎ করে পদত্যাগ করি তাহলে বলা হবে, আমি সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছি। আমি জামাতি। আমি রাজাকার।  তাই আমি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, আমার পদত্যাগের অভিপ্রায় এবং আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলে আমি পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিবো। আর আমাকে যদি বলা হয়, আপনাকে আরও শক্তিশালী করে দেয়া হলো, আপনার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হলো, আপনি ব্যাংকটিকে সাহসিকতার সঙ্গে চালান। তাহলে  আমি পদত্যাগ করবো না।

আহসানুল আলম পারভেজের এই অভিযোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের আগের চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান, বেশিরভাগ পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদত্যাগের পরও রাষ্ট্রবিরোধী পুরনো ব্যক্তিদের ব্যাংকটির নেতৃত্বে ফিরে আসা কার্যত অসম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি দাবিদার যে শিল্পগোষ্ঠিটি ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তারা যদি গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পুরনো শক্তিটিকে পুনর্বহাল করেন তাহলেই কেবল তাদের ফিরে আসা সম্ভব।

সৈয়দ আহসানুল আলমের ফেসবুক স্ট্যাটাস

ব্যাংকটির ভাইস-চেয়ারম্যান আহসানুল আলম পারভেজ তার স্ট্যাটাসে বেশ কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর দায় ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উপর বর্তায়। তিনি লিখেছেন, সরকার ও ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা পরিষদ ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপনের অসাধু উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যাংকের ক্যালেন্ডার থেকে এবার, ‘শরীয়াহ ভিত্তিক পরিচালিত ব্যাংক’ শব্দগুলো বাদ দেওয়া হয়। পরিষদের বাধা সত্ত্বেও ওই ক্যালেন্ডার বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে তার অভিযোগ।

রাষ্ট্রবিরোধী কাজে যুক্ত কিছু কর্মকর্তাকে ব্যাংকটির শীর্ষ পর্যায়ে পদায়ন করা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

এ বিষয়ে অর্থসূচককে তিনি বলেন, গত আড়াই মাস পূর্বের সেই চিহ্নিত রাষ্ট্রবিরোধী লোকগুলোকে হেড অফিসে নিয়ে আসা হলো। তাদেরকে সকল ডিপার্টমেন্টের হেড করা হলো। আগের প্রশাসন আমাদের কথা শুনতো। মাঝে মাঝে মান্নান ভাই আমাদের কথা শুনতো। কিন্তু এখন তারা আমাদের কোনো কথা শোনে না। আমাদের ডিএমডিরা আমাদের বলে- তারা নাকি এমডির চাকুরি  করে। বোর্ডের চাকুরি  করে না।

পর্ষদের অনুমতি ছাড়াই ব্যাংকের মুনাফা থেকে ৭০ কোটি টাকা জাকাত ফান্ডে সরিয়ে নেওয়া হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হামিদ মিয়া। ব্যাংকটির আগের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সরিয়ে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে তিনি ইউনিয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকারী শিল্প গোষ্ঠিটি ইউনিয়ন ব্যাংকেরও অন্যতম মালিক ও নিয়ন্ত্রণকারী। আস্থাভাজন হিসেবেই তাকে এ ব্যাংকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে জনশ্রুতি। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান আরাস্তু খানও কার্যত তাদের মনোনীত। এমন অবস্থায় চেয়ারম্যানসহ পুরো পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে আলোচিত বিষয়গুলো ঘটাতে পারার কথা নয়।

কোনো কারণে পর্ষদ চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এমন অভিযোগ তুলেছেন কি-না সে প্রশ্নও উঠছে। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম স্পন্সর আইডিবির হাতে থাকা শেয়ারের একটি অংশ কিনে ব্যাংকটির মালিকানায় আসতে কয়েকটি শিল্পগ্রুপ তৎপর হয়ে উঠায় যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, সেই অস্বস্তি থেকেও তিনি এ স্ট্যাটাস দিয়েছেন কি-না তা নিয়েও ভাবছেন অনেকে।

উল্লেখ, বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে সাত শতাংশ শেয়ারের মালিক ব্যাংকটির স্পন্সর ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)। ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পটপরিবর্তনে হতাশ ও ক্ষুব্দ আইডিবি আড়াই শতাংশ শেয়ার রেখে বাকী শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যাংকের কর্তৃত্বে থাকা শিল্পগোষ্ঠিটির পাশাপাশি আরও একাধিক শিল্পগোষ্ঠি এই শেয়ার কিনতে আগ্রহী বলে শোনা যায়।

এদিকে ইসলামী ব্যাংকের ভাইস-চেয়ারম্যান সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজের অভিযোগ ও ফেসবুক স্ট্যাটাস সম্পর্কে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আরাস্তু খানের কোনো বক্তব্য জানা যায়নি। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এই বিভাগের আরো সংবাদ