বাড়তি ৬৫০০ কোটি টাকা পেতে বিড়ি-সিগারেটের দাম দ্বিগুণের প্রস্তাব
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

বাড়তি ৬৫০০ কোটি টাকা পেতে বিড়ি-সিগারেটের দাম দ্বিগুণের প্রস্তাব

তামাক পণ্যে স্পেসিফিক ট্যাক্স (সুনির্দিষ্ট করারোপ) আরোপ করলে সরকার তামাক পণ্য (সিগারেট, বিড়ি ও ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্য) থেকে বছরে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব পাবে বলে দাবি করেছেন তামাক বিরোধী কয়েকটি সংগঠন।

সেজন্য আগামী (২০১৭-১৮) অর্থবছরের বাজেটে সিগারেট ও বিড়িতে মূল্যস্তর প্রথা পর্যায়ক্রমে তুলে দিয়ে বিশেষ কর আরোপ, ধোঁয়াবিহীন তামাকে বিশেষ কর; পাশাপাশি প্রতি ২০ গ্রামের ওপর করারোপসহ ১১টি সুপারিশ করা হয়েছে।

আজ সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকের ব্যবহার হ্রাস করতে আগামী বাজেটে তামাক পণ্যে কার্যকরভাবে সুনির্দিষ্ট (স্পেসিফিক) কর আরোপের দাবিতে ‘কেমন তামাক কর চাই’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও সুপারিশ করা হয়।

প্রজ্ঞা ও এন্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্সের (আত্মা) যৌথ উদ্যোগে তামাক বিরোধী সংগঠন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহছানিয়া মিশন, অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি), ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা), তামাকবিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করা হয়।

লিখিত বক্তব্য পাঠ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক। তিনি বলেন, ‘কার্যকরভাবে কর আরোপের মাধ্যমে তামাকের দাম বাড়ালে তামাক ব্যবহার সন্তোষজনক হারে হ্রাস পাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, করারোপের ফলে তামাকের প্রকৃত মূল্য ১০ শতাংশ বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে তামাকের ব্যবহার ৫ শতাংশ হ্রাস পায় পায়। কিন্তু বাংলাদেশে তামাক কর বিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কার্যকর করারোপের অভাবে তামাকের প্রকৃত মূল্য বৃদ্ধি পায়নি।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে তামাক খাত থেকে সরকার যে রাজস্ব পায় তামাক ব্যবহারের কারণে অসুস্থ রোগীর চিকিৎসায় সরকারকে স্বাস্থ্য খাতে তার দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। তামাকজনিত মোট ক্ষতি হিসেবে করলে তা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ শতাংশ।

ড. রুমানা হক আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী সাউথ এশিয়ান স্পিকার সামিটে তামাককে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশ থেকে তামাকের ব্যবহার সম্পূর্ণ নির্মূল বা ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেন। একই সাথে তামাকের ওপর বর্তমান শুল্ক কাঠামো সহজ করে একটি শক্তিশালী তামাক শুল্কনীতি গ্রহণের নির্দেশনা দেন।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে তামাকের উপর শুল্ক কাঠামো অত্যন্ত জটিল এবং তা আদায় করা হয় এড বলরাম অর্থাৎ মূল্যের শতাংশ হারে; যা অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করে; করফাঁকির সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। এডবলরাম পদ্ধতির পরিবর্তে সকল তামাকজাত পণ্যের প্যাকেট বা কৌটা প্রতি সুনির্দিষ্ট (স্পেসিফিক) করারোপের দাবি জানান তিনি।’

১০ শলাকার প্যাকেট সিগারেটের ক্ষেত্রে স্পেসিফিক করারোপের প্রস্তাব করে তিনি বলেন, নিম্নস্তরের সিগারেটে ২৫.৯৫ টাকা, উচ্চস্তরের সিগারেটে ৪৯.৬০ টাকা ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটে ৮২ টাকা করারোপ করা যেতে পারে। নিম্নস্তরের সিগারেটের বর্তমান খুচরা মূল্য ২৩ টাকার স্থলে কমপক্ষে ৪০ টাকা, উচ্চস্তরের সিগারেটের খুচরা মূল্য ৭০ টাকা ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের খুচরা মূল্য কমপক্ষে ১২০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। এর ফলে প্রতিবছর সিগারেট থেকে সরকার ৫২০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব পাবে।

২৫ শলাকা বিড়ির ক্ষেত্রে বিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন এ বিভাজন বাতিল করে প্রতি ২৫ শলাকা বিড়ির উপর ১০.১৩ টাকা সুনির্দিষ্ট করারোপ করে বিড়ির খুচরা মূল্য ১০.৬১ টাকার স্থলে ২২.৩০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। এর ফলে বিড়ি থেকে সরকার প্রতিবছর ১ হাজার ৩০ কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব পাবে বলে দাবি করেন ড. রুমানা হক।

ধোঁয়াবিহীন তামাকের (গুল, জর্দা) ক্ষেত্রে প্রতি ২০ গ্রাম ওজনের ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্যে ১৬ টাকা স্পেফিসিক করারোপ করে এসআরও এর মাধ্যমে এর খুচরা মূল্য কমপক্ষে ৩২ টাকা নির্ধারণ করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতি ২০ গ্রাম ধোঁয়াবিহীন তামাকের কৌটা বা প্যাকেট থেকে সরকার অতিরিক্ত রাজস্ব পাবে। একই সাথে সকল তামাক পণ্যের খুচরা মূল্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রাখারও প্রস্তাব করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘মূল্যস্তর প্রথা রাখাই যাবে না। মূল্যস্তর প্রথায় কোম্পানিগুলো রাজস্ব ফাঁকি দেয়। তামাকে কর বাড়াতে হবে ব্যক্তির আয়ের চেয়ে বেশি হারে। বাজেটে তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করতে বিকল্প চাষে পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ রাখা ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘১ শতাংশ স্বাস্থ্য সারচার্জ তহবিলে ৬০০ কোটি টাকা জমা হয়েছে। কিন্তু এ টাকার ব্যবহার বিধিমালা না থাকায় খরচ করা যাচ্ছে না। দ্রুত বিধিমালা করা হলে এ টাকা কাজে লাগবে। প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত দেশ গড়ার কথা বলেছেন। ২০৩০ সালে তো এসডিজির শেষ বছর। পারলে ২০৩০ সালের আগেই কমিয়ে আনা উচিত।’

এনবিআরের সাবেক সদস্য (করনীতি) মো. আমিনুর রহমান বলেন, ‘রাজস্ব হারানো ও রাজস্ব ফাঁকির ভয়ে এনবিআর তামাকের কর কাঠামোয় পরিবর্তন করে না। ধোঁয়াবিহীন তামাক সনাক্ত ও কর আদায়ে এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক দূর্বলতা রয়েছে। এনবিআরের টোব্যাকো সেলকে কার্যকর করতে হবে। একই সাথে নতুন ভ্যাট আইনের ৫৮ ধারা অনুযায়ী, স্পেসিফিক করারোপ করলে রাজস্ব ক্ষতি হবে না।’

সভাপতির বক্তব্যে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় অধ্যাপক বিগ্রেডিয়ার (অব.) আব্দুল মালিক বলেন, ‘হৃদরোগসহ সকল রোগের মূল কারণ তামাক। ৪০ বছরের নিচে যেসব রোগী হৃদরোগে আক্রান্ত তা ধূমপানের কারণে। সুস্থ জাতি পেতে হলে তামাকের ব্যবহার কমাতে হবে। তামাকজনিত ক্ষতি বিবেচনায় তামাকে কর বাড়ানো উচিত।’

আত্মার কো-কনভেনর নাদিরা কিরণের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আত্মার কনভেনর মর্তুজা হায়দার লিটন, বাংলাদেশ কান্ট্রি এডভাইজার, ভাইজাল স্ট্র্যাটেজিস শফিকুল ইসলাম, সিটিএফকের গ্রান্টস ম্যানেজার ডা. মাহফুজুল হক ভূঁঞা বক্তব্য রাখেন।

অর্থসূচক/রহমত/এস

এই বিভাগের আরো সংবাদ