ভৈরব ও কুলিয়ারচরের পোল্ট্রি শিল্প হুমকির মুখে 
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » জাতীয়

ভৈরব ও কুলিয়ারচরের পোল্ট্রি শিল্প হুমকির মুখে 

হুমকির মুখে পড়েছে কিশোরগঞ্জের ভৈরব ও কুলিয়ারচরের পোল্ট্রি শিল্প। বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগির খামার সবগুলোই প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পুঁজি হারিয়ে এবং বিভিন্ন কোম্পানিগুলোর ডিলারদের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে ওইসব খামারীরা এখন ফেরারি জীবন যাপন করছেন। অনেকে আবার ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে ভিটে-বাড়ি বিক্রি করে চরম মানবেতর অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন।

পোল্ট্রির বাচ্চা ও খাদ্য সামগ্রী প্রস্তুতকারী দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোর অতি মুনাফা এবং ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ধ্বংসের পথে কিশোরগঞ্জের ভৈরব ও কুলিয়ারচর উপজেলার শত শত পোল্ট্রি খামার।

সিন্ডিকেট করে কোম্পানিগুলো মুরগির বাচ্চা ও খাদ্যসামগ্রীর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে মুরগি বিক্রির বাজারদরের তারতম্যের কারণে পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছেন শত শত পোল্ট্রি খামারী।

জানা যায়, লাভজনক ব্যবসা হিসেবে আশির দশকের মাঝামাঝি শুরু হওয়া পোল্ট্রি খামার শিল্প ভৈরব ও কুলিয়ারচরে ছড়িয়ে পড়ে অতিদ্রুত। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ আকারে প্রায় দেড় হাজার ব্রয়লার ও লেয়ার পোল্ট্রি খামার গড়ে ওঠে পর্যায়ক্রমে। এসব খামারে উৎপাদিত মাংস ও ডিম স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকার বাজারের এক বড় অংশ দখল করে নেয় দিনে দিনে। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠে। কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় বহু লোকের। কিন্তু গত ৪ থেকে ৫ বছর ধরে এ শিল্পে হঠাৎ নেমে আসে বিপর্যয়। ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকে পোল্ট্রির বাচ্চা, খাবার ও ওষুধের দাম। অতিরিক্ত বাজার মূল্য দিয়ে বাচ্চা, খাবার ও ওষুধ কিনে সে অনুযায়ী বিক্রয় মূল্য না পাওয়ায় ধীরে ধীরে পুঁজি হারাতে থাকেন খামারীরা। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ খামার। এতে খামারিদের পাশাপাশি এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত মালিক-শ্রমিকদের পরিবার পরিজন পড়েছেন সংকটে।

ভৈরব শহরের চণ্ডিবের মধ্যপাড়া এলাকার আল আমিন মিয়া জানান, তিনি এ শিল্পের সঙ্গে প্রায় বিশ বছর ধরে জড়িত। প্রথম অবস্থায় লাভজনক হওয়ায় বেশ মুনাফাও করেছেন তিনি। ওই সময় একে একে খামারের সংখ্যা বাড়িয়ে তিনি ৪টি খামার গড়ে তুলেছিলেন। এতে অনেক কর্মীর কাজেরও ক্ষেত্র হয়েছিল। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের অব্যাহত লোকসানে একে একে বন্ধ হয়ে গেছে তার সবগুলো খামার। মুনাফার পরিবর্তে লোকসানের কারণে তিনি হয়েছেন ঋণগ্রস্ত। ঋণের চাপে এখন তিনি পরিবার পরিজন ফেলে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

একই এলাকার উত্তর পাড়ার আব্দুর রহিম জানান, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে থাকতেন। বেশ কয়েক বছরের প্রবাস জীবনের অর্থ লগ্নি করেছিলেন এই ব্রয়লার মুরগির খামারে। এক চালানে ২০ হাজার টাকা লাভ হতো, অন্য চালানে ৫০ হাজার টাকা লোকসান। পরের চালানে লাভের আশায় আবার বাচ্চা তুলেন। এমনি করে তিনি তার সব পুঁজি হারিয়েছেন। এখন তিনি বেকার। এখন ওপর দেনার চাপ। এখন তিনি কি করবেন বুঝে ওঠতে পারছেন না বলে জানান।

কুলিয়ারচরের উসমানপুর এলাকার নয়ন মিয়ার বিশাল বিশাল দুটি খামার বন্ধ। তার ভাই বললেন, নয়ন মিয়া বাড়িতে নেই। আছেন নিরুদ্দেশ হয়ে। কোম্পানীর লোক মনে করে তিনিও বের হতে চাচ্ছিলেন না। পরে সাংবাদিক বুঝতে পেরে বের হয়ে এসেছেন।

তিনি জানান, তার ভাই নয়ন মিয়া ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা লোকসান গুনে এখন ঋণের দায়ে ফেরার হয়ে আছেন বেশ কয়েক মাস ধরে।

 একই এলাকার দুবাই ফেরত মামুন জানান, তিনি দুই বছর আগে দেশে ফিরে ১২ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে ব্রয়লার মুরগির খামার গড়ে তুলেন। এই দুই বছরের পূঁজি হারিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব। এখন দেশের মায়া ছেড়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টায় আছেন।

 বাচ্চা ও খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের অতি মুনাফার মানসিকতার জন্য এ অঞ্চলের পোল্ট্রি খামারগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করে কিশোরগঞ্জ জেলা পোল্ট্রি মালিক অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা মো. দেলোয়ার হোসেন লিটন। এ শিল্প রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

বাচ্চা ও খাদ্য মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি ওষুধেও একটা বড় খরচ হচ্ছে। এইসব খরচ শেষে বাজারে সেই অনুপাতে বিক্রয় মূল্য পচ্ছে না খামারী। ফলে এলাকার ৫ শতাংশ খামারও আর অবশিষ্ট নেই উল্লেখ করেন ভৈরব উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. আজাহারুল ইসলাম।

তিনি বলেন, মুরগির বাচ্চা, খাদ্যের পাশাপাশি ওষুধের দাম কমানোসহ বাজার মনিটরিং প্রয়োজন।

 বাচ্চা ও খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং সেই অনুপাতে উৎপাদিত মুরগীর বাজার মূল্য না পাওয়ায় এখানকার খামারীরা লোকসানের মুখে পড়ে খামারগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে বলে জানান ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: মুহাম্মদ কামরুল ইসলাম।

এইসব সংকট কেটে গেলে এখানকার পোল্ট্রিশিল্প আবারও চাঙ্গা হয়ে ওঠবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এ শিল্প আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 একদিন বয়সী বাচ্চার মূল্য সর্বোচ্চ ৪০ টাকা হলে মুরগির বর্তমান বাজার দরে খামারীরা লাভবান হবেন। আর যদি বাচ্চার দাম এমনই থাকে- তবে মুরগীর বাজার দর বাড়াতে হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন কুলিয়ারচর উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. হাবিবুননবী।

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ