দৈনিক ব্যাহত হচ্ছে কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন

akhaura
দৈনিক ব্যাহত হচ্ছে কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন

YASHICA Digital Cameraটানা হরতাল আর অবরোধে প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে আখাউড়া স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য কার্যক্রম। একদিকে হরতাল-অবরোধ আরেক দিকে আগরতলার ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট। যেন “মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।”

দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও টানা হরতাল আর অবরোধের কারণে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বন্ধ হয়ে পড়ছে। তিন দফা টানা হরতাল আর দুই দফা অবরোধের কারণে প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। এতে এ বন্দরে ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন। ব্যবসায়ী ও ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ওপাড়ের ব্যবসায়ীদের কাছে আটকে আছে রপ্তানি পণ্যের কোটি কোটি টাকার বিল। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে এ দেশের ব্যবসায়ীরা। এতে দেশও প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও ব্যাহত হচ্ছে। হরতাল ও অবরোধের দিনগুলোতে প্রায় ৪ লাখ টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

সরেজমিনে গতকাল শনিবার সকালে আখাউড়া স্থলবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের কোলাহল থাকত সেখানে আজ ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীদের অফিসও দোকান পাট সবই ছিল বন্ধ। পুরো রাস্তাই ছিল ফাঁকা। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাষ্টম, ইমিগ্রেশন অফিস ছিল খোলা। ওইসব অফিসের কর্মকর্তাও কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন। বন্দর জানাগেছে, আখাউড়া স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানিতে চলছে অচলাবস্থা। গত ২৭ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের ১০ তারিখ পর্যন্ত ১০ দিন হরতাল আর ১২ দিন ছিল অবরোধ। ২৭ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের ১০ তারিখ পর্যন্ত ৪৫ দিনের মধ্যে ২২ দিন ছিল বিরোধী দলের ডাকা হরতাল আর অবরোধ। ফলে অচল হয়ে পড়ে আখাউড়া স্থলবন্দর। তার উপর রয়েছে গত শনিবার থেকে ত্রিপুরার ব্যবসায়ী সমিতি আগরতলা স্থলবন্দরে ইন্টিগ্রেটেডে চেক পোষ্টে মালপত্র লোডিং অ্যান্ড আনলোডিং সহ বিভিন্ন চার্জ বৃদ্ধির প্রতিবাদে অনির্দিষ্ট কালের জন্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রাখে। এই দুই মিলে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এর আগে গত জুলাই মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রূপীর দর পতনের কারণে প্রায় ৩ মাস এ বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি প্রায় বন্ধই ছিল। আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের ত্রিপুরায় বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। এরপর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আবার দেশে অক্টোবর থেকে লাগাতার হরতাল-অবরোধ আর আগরতলার ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে এ বন্দর দিয়ে বন্ধ হয়ে পড়েছে।

একদিন আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক কোটি টাকার বৈদেশিক মুন্দ্রা অর্জন থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। তাছাড়া যাত্রী পারাপার কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। যাত্রী পারাপারের খাত থেকে হরতাল আর অবরোধের ৪৫ দিনে প্রায় ৫ লাখ টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার।

আখাউড়া স্থলবন্দর ইমিগ্রেশনের এস আই তোফায়েল আহাম্মদ জানান, হরতাল আর অবরোধের কারণে যাত্রী পারাপার কমে গেছে। দূরের যাত্রীরা আসছে না। দেশের একমাত্র ৯৯ ভাগ রপ্তানিমুখী স্থলবন্দর এটি। এ বন্দর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সেভেন সিস্টার খ্যাত ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়, মিজুরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল রাজ্যে প্রায় ৪০টি পণ্য রপ্তানি হয়। এসব পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মাছ, পাথর, সিমেন্ট, প্লাস্টিক সামগ্রী, তুলা, পাট জাতীয় পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি, পোল্ট্রি ফিড, হ্যাচারি ফিড ইত্যাদি। ওইসব রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশের ওইসব পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে। প্রতি বছর এসব পণ্য রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। গত অর্থবছরে প্রায় ৩২৭ কোটি ৫৯ লাখ ১০ হাজার টাকা দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছিল। কিন্ত এ বছর তা না হওয়ার আশংকা করে ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, হরতাল আর অবরোধের পূর্বে এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ ট্রাক বিভিন্ন প্রকার পণ্য রপ্তানি হতো ত্রিপুরায়। কিন্তু টানা হরতাল-অবরোধে পণ্যবাহী ট্রাক বন্দরে আসতে না পারায় এখন দৈনিক ৮/১০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হতো। আর আগরতলা ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে গত শনিবার থেকে একেবারেই আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এভাবে হরতাল-অবরোধ চলতে থাকলে এবং দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না এলে রপ্তানি বাণিজ্য শূন্যের কোটায় নেমে আসবে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। আখাউড়া স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী আব্বাস উদ্দিন ভূইয়া বলেন, হরতাল-অবরোধের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, কিছু দিন আগে ভারতে রূপীর দর পতনের কারণে কয়েক মাস ব্যবসা মন্দা গেছে। এখন দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আমরা এখন পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

ভূইয়া ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শাহাদাত হোসেন লিটন বলেন, ব্যাংক চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ দেশের রপ্তানিকারকরা  বিভিন্ন পণ্য ত্রিপুরায় রপ্তানি করে আসছে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাও ওপারের ব্যবসায়ীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রাখায় আমরা অনেক সমস্যার মধ্যে আছি। এ কারণে ওপারের ব্যবসায়ীরা ঠিকমতো বিল দিচ্ছে না। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের নিকট আমার মতো অনেক তাদের কাছে কোটি কোটি টাকা আটকে আছে। এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাই বেশি ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন। বন্দরের ব্যবসায়ী আল-আমিন খন্দকার বলেন, ত্রিপুরার ব্যবসায়ীরা আমাদের জানিয়েছেন, অতিরিক্ত খরচ বহন করে পণ্য আমদানি করে লোকসান দিতে হচ্ছে। এ কারণে তারা এখন মালামাল নিবে না।

আখাউড়া স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি কারক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম বলেন, হরতাল-অবরোধের কারণে রপ্তানি যোগ্য পণ্যবাহী ট্রাক বন্দরে আসতে পারছে না। তাছাতা অনির্দিষ্ট কালেরজন্য ধর্মঘট পালন করার কারণে আগরতলার ব্যবসায়ীরা মাল নিচ্ছে না। এতে আমরা মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়েছি। এই অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসা গুটিয়ে ঘরে বসে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। তিনি বলেন, ভারতের আমদানিকারকদের কাছে আমাদের অনেক বিল আটকা আছে। নিয়মিত ব্যবসা করতে না পারলেও এসব বিল সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না। আখাউড়া স্থলবন্দরের সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মনির হোসেন বাবুল বলেন, আগরতলার ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া হরতাল-অবরোধেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে।

আখাউড়া বন্দর কর্তৃপক্ষের সুপারিটেনডেন্ট মো. হামিদুর রহমান হামিদ বলেন, হরতাল-অবরোধের কারণে পণ্য খালাস করে আসা ১০/১২টি ট্রাক বন্দর ইয়ার্ডে রয়েছে। রাস্তায় নিরাপত্তা না থাকায় ট্রাকগুলো গন্তব্যে যেতে পারছে না। আখাউড়া স্থলবন্দর শুল্ক বিভাগের সহকারী কমিশনার মিয়া মো. নাজমুল হক বলেন, গত শনিবার থেকে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। তবে যাত্রী পারাপারও কমেছে। এ পরিস্থিতি সৃস্টি হয়েছে হরতাল-অবরোধ আর কারণে ত্রিপুরার ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে।

এআর