ইপিএস কারসাজি করে চড়া দামে বিএসআরএম মালিকদের শেয়ার বিক্রি
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

ইপিএস কারসাজি করে চড়া দামে বিএসআরএম মালিকদের শেয়ার বিক্রি

পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত প্রকৌশাল খাতের কোম্পানি বিএসআরএম লিমিটেডের আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। এই কারসাজির মাধ্যমে নিট মুনাফা ও  শেয়ার প্রতি আয় বা ইপিএস বাড়িয়ে চড়া দামে বোনাস শেয়ার বিক্রি করেছে কোম্পানির মালিকরা।

অবশ্য কারসাজির কথা অস্বীকার করছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে সব আইন মেনেই আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিজেদের প্রয়োজন মাফিক ইপিএস বাড়ানো কমানো গর্হিত অপরাধ। কিন্তু বিএসআরএম লিমিটেড তা-ই করেছে। বাড়তি দামে শেয়ার বিক্রি করতে তারা আগে আয়করের জন্য সঞ্চিতি না রেখে মুনাফা ও ইপিএস বাড়িয়ে দেখিয়েছে। তাদের শেয়ার বিক্রি শেষ হয়ে যাওয়ার পরবর্তী প্রান্তিকে তারা বকেয়াসহ সব কর একসঙ্গে পরিশোধ করেছে। এতে শেয়ারের দাম কমে গেছে। তাতে অসংখ্য বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলো। আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো ধরনের কারসাজির প্রমাণ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএসইসি।

BSRMবিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের ৫৩৩তম সভায় বিএসআরএম লিমিটেড আইপিওর অনুমোদন পায়। অভিহিত মূল্যের সঙ্গে ২৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৩৫ টাকা দরে ১ কোটি ৭৫ লাখ শেয়ার ছাড়ে কোম্পানিটি। গত ১০ ফেব্রুয়ারি ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ৫ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দেয় বিএসআরএম।

চলতি বছরের ৮ মে বিএসআরএম লিমিটেড প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে মুনাফার বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়। প্রথম প্রান্তিকে ইপিএস দেখানো হয় ২ টাকা ৫২ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ১৬ পয়সা। এ হিসেবে ইপিএস বেড়ে যায় ২ টাকা ৩৬ পয়সা বা ১৪৭৫  শতাংশ।

এর আগে ১০ ফেব্রুয়ারি কোম্পানিটি সর্বশেষ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন করে। ওই বছরে কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় ছিল ৪ টাকা ৭৮ পয়সা। এই হিসেবে গড়ে প্রতি প্রান্তিকে আয় দাঁড়ায় ১ টাকা ২০ পয়সা। তখন থেকেই বাজারে রটতে থাকে কোম্পানিটির পরবর্তী প্রান্তিকে অনেক বেশি ইপিএস আসবে। এই রটনায় শেয়ারের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। মাত্র এক মাসে বিএসআরএম লিমিটেডের শেয়ারের দাম ১১৬ টাকা থেকে ২০১ টাকায় উঠে। দাম বাড়ে প্রায় ৭৩ শতাংশ।

দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় শেয়ারে প্রফিট টেকিং শুরু হলে পরবর্তীতে দাম কিছুটা নিম্নমুখী হয়। এর মধ্যে চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল বিএসআরএম লিমিটেডের কর্পোরেট উদ্যোক্তা এইচ আকবর আলী অ্যান্ড কো. লিমিটেড বোনাস লভ্যাংশ হিসেবে পাওয়া ২৬ লাখ ২৭ হাজার ১১টি শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেয়, যা পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা। ১১ মে কোম্পানিটি জানায়, তার উদ্যোক্তা বোনাস শেয়ার বিক্রি শেষ করেছে। উদ্যোক্তার বোনাস বিক্রির প্রভাবে কোম্পানির শেয়ার দর ১৬৬ টাকা থেকে ৩৫ টাকা বা ২১ শতাংশ কমে ১৩১ টাকায় নেমে আসে।

উদ্যোক্তার শেয়ার বিক্রি শেষ হওয়ার ঘোষণার ৩ দিন আগে কোম্পানিটি প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে কোম্পানির ইপিএস আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৪৭৫ শতাংশ বেশি দেখানো হয়। জানা যায়, আলোচিত সময়ে কোম্পানিটি ন্যূনতম আয়কর পরিশোধ করেনি, এমনকি আয়করের জন্য সঞ্চিতিও রাখেনি। তাতেও নিট মুনাফা ও ইপিএস বেড়ে যায়।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে কোম্পানিটি বকেয়া সব কর একসঙ্গে পরিশোধ করে। তাতে নিট মুনাফা ও ইপিএস আগের প্রান্তিকের চেয়ে ৮০ শতাংশ কমে যায়। কিন্তু তার আগেই কোম্পানিটির মালিকদের শেয়ার বিক্রি শেষ হয়ে যায়।

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেওয়া নোট থেকে জানা যায়, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ১৬সিসিসি ধারার আওতায় সরকার মোট বিক্রির উপর যে কর (Turnover Tax) আরোপ করেছে, বিএসআরএম সেটিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিল। সে কারণে ২০১০, ২০১১, ২০১২ ও ২০১৩ সালে ওই কর পরিশোধ করা হয়নি। সম্প্রতি মামলাটির রায় ঘোষিত হয়েছে। রায় কোম্পানিটির বিপক্ষে যাওয়ায় একসঙ্গে সব বকেয়া কর পরিশোধ করতে হয়েছে।

বকেয়া কর পরিশোধের বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক একাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে, মামলার কারণে ন্যূনতম কর পরিশোধ করা না হয়ে থাকলেও এর বিপরীতে সঞ্চিতি রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল। ওই সঞ্চিতি থাকলে এখন মোট মুনাফা থেকে বকেয়া কর পরিশোধ করতে হতো না। তাতে কোম্পানিটির নিট মুনাফা এবং ইপিএস এতোটা কমতো না।

এ বিষয়ে বিএসআরএম স্টিলের পরিচালক (অর্থ) জোহায়ের তাহের আলী অর্থসূচককে বলেন, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি করার ইচ্ছা নেই। আমরা সব সময় আইন মেনেই কাজ করতে অভ্যস্ত। প্রয়োজনে এই প্রতিবেদনের উপর বিএসইসি বিশেষ নিরীক্ষা করতে পারে।bsrm3

বিএসআরএমের কোম্পানি সচিব শেখর রঞ্জন অর্থসূচককে বলেন, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড, ইনকাম ট্যাক্স ও হাইকোর্টের রায়ের উপর ভিত্তি করে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, তারা আইন মেনেই বোনাস শেয়ার বিক্রি করেছে।

বিষয়টি নিয়ে আইসিএবির সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অর্থসূচককে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে।বিষয়টিতে অসঙ্গতি আছে মনে হওয়ায় কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে গত ২৫ অক্টোবর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মতিন পাটোয়ারীর সঙ্গে কথা হয় অর্থসূচকের। তিনি বলেন, বিএসআরএম লিমিটেডের বিষয়টি নিয়ে আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। আইনের বাইরে কোনো কাজ আমাদের নজরে আসলে, তদন্ত করে তার প্রতিবেদন বিএসইসির কাছে দিবো। যাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান অর্থসূচককে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। যদি কোনো ধরনের অসঙ্গিত থাকে তাহলে আমরা আইন অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নেব।

অর্থসূচক/গিয়াস

এই বিভাগের আরো সংবাদ