বিএসআরএম স্টিলের বিরুদ্ধে হিসাব কারসাজির অভিযোগ
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

বিএসআরএম স্টিলের বিরুদ্ধে হিসাব কারসাজির অভিযোগ

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি বিএসআরএম স্টিলের বিরুদ্ধে হিসাব কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। প্রযোজ্য করের বিপরীতে সঞ্চিতি না রেখে কোম্পানিটি মুনাফা বাড়িয়ে দেখিয়েছে। বাজারে এই কোম্পানির শেয়ারের দাম ভালো থাকলে আইপিওর পাইপলাইনে থাকা গ্রুপের অন্য কোম্পানির উচ্চ প্রিমিয়াম পাওয়া সহজ হবে-এমন হীন উদ্দেশ্য থেকে এই কারসাজি করা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি বিএসআরএম স্টিল দ্বিতীয় প্রান্তিকে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আলোচিত সময়ে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি আয় বা ইপিএস হয়েছে এক টাকা নয় পয়সা। অথচ ঠিক আগের প্রান্তিকেই ইপিএস ছিল দুই টাকা ৭৫ পয়সা। ইপিএস কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কোম্পানিটি জানিয়েছে, কর সংক্রান্ত একটি মামলায় হেরে যাওয়ায় কোম্পানিটিকে একসঙ্গে আগের কয়েক বছরের কর পরিশোধ করতে হয়েছে। এ কারণে নিট মুনাফা কম হয়েছে।

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেওয়া নোট থেকে জানা যায়, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ১৬সিসিসি ধারার আওতায় সরকার মোট বিক্রির উপর যে কর (Turnover Tax) আরোপ করেছে, বিএসআরএম সেটিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিল। সে কারণে ২০১০, ২০১১, ২০১২ ও ২০১৩ সালে ওই কর পরিশোধ করা হয়নি। সম্প্রতি মামলাটির রায় ঘোষিত হয়েছে। রায় কোম্পানিটির বিপক্ষে যাওয়ায় একসঙ্গে সব বকেয়া কর পরিশোধ করতে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক একাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে, মামলার কারণে ন্যুনতম কর পরিশোধ করা না হয়ে থাকলেও এর বিপরীতে সঞ্চিতি রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল

বকেয়া কর পরিশোধের বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক একাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে, মামলার কারণে ন্যুনতম কর পরিশোধ করা না হয়ে থাকলেও এর বিপরীতে সঞ্চিতি রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল। ওই সঞ্চিতি থাকলে এখন মোট মুনাফা থেকে বকেয়া কর পরিশোধ করতে হতো না। তাতে কোম্পানিটির নিট মুনাফা এবং ইপিএস এতোটা কমতো না।

সম্প্রতি একটি ব্যাংকভিত্তিক ব্রোকারহাউজ পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে চিঠি দিয়ে বিষয়টি নজরে আনার চেষ্টা করেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) কোম্পানিটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্রোকারহাউজটির শীর্ষ নির্বাহী অর্থসূচককে বলেন, কোম্পানিটি আন্তর্জাতিক একাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড লংঘন করেছে। কোম্পানিটিতে একাধিক চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট রয়েছে। তাই বিষয়টি না বুঝে করা হয়েছে এমন নয়। আমরা বিনিয়োগকারী ও বাজারের স্বার্থে বিএসইসি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি।

তিনি বলেন, আগে সঞ্চিতি না রাখায় নিট মুনাফা ও ইপিএস ভালো হয়েছে। শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ মূল্যও বেশি দেখানো গেছে। এর পেছনে কোনো অসাধু উদ্দেশ্য থেকে থাকতে পারে। কিন্তু এখন পুরনো বছরগুলোর করের প্রভাবে নিট মুনাফা ও ইপিএস কমেছে। এতে বাজারে শেয়ার মূল্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অসংখ্য বিনিয়োগকারী এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করেন, আইপিওতে আসা বিএসআরএম গ্রুপের দ্বিতীয় কোম্পানির শেয়ারে ভালো প্রিমিয়াম পেতে এমন হিসাব কারসাজি করা হয়ে থাকতে পারে।

উল্লেখ, ২০০৯ সালে বিএসআরএম স্টিল লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এর দুই বছরের মাথায় গ্রুপের প্রধান কোম্পানি বাংলাদেশ স্টিল রি রোলিং মিলস লিমিটেডের (বিএসআরএম লিমিটেড) আইপিওর আবেদন জমা দেওয়া হয় বিএসইসির কাছে। আগে থেকে বাজারে থাকা একটি কোম্পানির শেয়ারের ভালো দাম থাকলে অপর কোম্পানির উচ্চ প্রিমিয়াম দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্বিধা করবে না এমন ধারণা থেকে বিএসআরএম স্টিলের হিসাব কারসাজি শুরু হয়ে থাকতে পারে। আর সে কারণেই ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে কোম্পনিটি ন্যুনতম কর বা টার্নওভার ট্যাক্সের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি না রেখে মুনাফা বাড়িয়ে দেখিয়েছে। নানা জটিলতায় বিএসআরএম লিমিটেডের আইপিও অনুমোদনে বিলম্ব হলে  কোম্পানিটি ২০১৩ সাল থেকে টার্নওভার ট্যাক্সের বিপরীতে সঞ্চিতি রাখে।

এদিকে ২০১৫ সালে বিএসআরএম লিমিটেডের আইপিওর প্রস্তাব অনুমোদন করে বিএসইসি। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সঙ্গে ২৫ টাকা প্রিমিয়াম নিয়ে কোম্পানিটি বাজারে শেয়ার ইস্যু করে।

এ বিষয়ে বিএসআরএম স্টিলের পরিচালক (অর্থ) জোহায়ের তাহের আলী অর্থসূচককে বলেন, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি করার ইচ্ছা নেই। আমরা সব সময় আইনে মেনেই কাজ করতে অভ্যস্ত। প্রয়োজনে এই প্রতিবেদনের উপর বিএসইসি বিশেষ নিরীক্ষা করতে পারে।

বিএসআরএমের কোম্পানি সচিব শেখর রঞ্জন অর্থসূচককে বলেন, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড, ইনকামট্যাক্স ও হাইকোর্টের রায়ের উপর ভিত্তি করে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, মিনিমাম ট্যাক্সকে কেন্দ্র করে হাইকোর্টের একটি রায় এসেছে জুলাই মাসে।ওই রায়ে আমরা হেরেছি, সরকার জয়ী হয়েছে। এতে করে আমাদের ডেফার্ড ট্যাক্স দিতে হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে আইসিএবির সহ-সভাপতি ও সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অর্থসূচককে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টিতে অসঙ্গতি আছে মনে হওয়ায় কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান অর্থসূচককে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। যদি কোনো ধরনের অসঙ্গিত থাকে তাহলে আমরা আইন অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নেব।

অর্থসূচক/গিয়াস

এই বিভাগের আরো সংবাদ