সন্তানের সামনে ঝগড়া নয়
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

সন্তানের সামনে ঝগড়া নয়

পৌরনীতির ভাষায় ‘পরিবারকে বলা হয় মানবিক গুণাবলি অর্জনের প্রথম শিক্ষাগার’। তাছাড়া সামাজিক আচরণ ব্যবস্থাপনায় শিশুর ব্যক্তিত্বের খুঁটি হিসাবে মা-বাবাকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। এরপর পরিবেশ।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ থমসন বলেন, “শিক্ষা হলো শিশুর ওপর পরিবেশের প্রভাব, যে প্রভাবের দ্বারা শিশুর বাহ্যিক আচরণ, চিন্তাধারা এবং দৃষ্টিভঙ্গির স্থায়ী পরিবর্তন হয়।”

কিন্তু আমাদের সমাজে শিশুদের সাথে সরাসরি কথা না বলে,  ধামাচাপা দিয়ে বা দায়সারা গোছের কথা বলে অনেক ক্ষেত্রে অন্য কথা বলে কথা ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে পরিস্থিতি জটিল করে তুলি। ফলে ওইক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ আরো বেড়ে যায় এবং ওরা ভুল জায়গায় তথ্য অনুসন্ধান করতে আগ্রহী  হয়ে ওঠে।

অনেকে অনেক সময় অল্পতেই বিরক্ত হয়ে কিংবা অন্যের রাগ শিশুদের উপর প্রয়োগ করে থাকে। শিশুদের বকাবকি করে থাকে। এসময় শিশুদের সাথে প্রচুর ধৈর্য ধারণ করতে হয়। আমরা শারিরীক নির্যাতনের ব্যাপারে বলি কারণ তা দেখা যায়। কিন্তু এই সব আচরণের কারণে শিশুরা যে পরিমান মানসিকভাবে নিগৃহীত হয় তা দেখা যায়না বলে আমরা সে ব্যাপারে সচেতন থাকিনা। শিশুরা তাদের আচরণগত কারণেই অনুকরণপ্রিয় হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে শিশুরা ৯০% কাজই না বুঝে করে থাকে। ফলে এরকম পরিবেশে থাকলে একটি শিশু দিনের পর দিন ভোগান্তির শিকার হতে থাকে।

সন্তানের সামনে ঝগড়া করলে সন্তানের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ছবিটি প্রতীকী।

সন্তানের সামনে ঝগড়া করলে সন্তানের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ছবিটি প্রতীকী।

শিশুদের সাথে কোন ধরনের ব্যবহার করা উচিত নয় তা জেনে নেই-

তুলনা করা:

প্রতিটা শিশু আলাদা। একই মায়ের পেটেরও একেক সন্তান একেক রকম হয়। তাই অন্য শিশু কে কি করতে পারে আর আপনার সন্তান কি করতে পারলোনা তা নিয়ে তুলনা করা যুক্তিহীন। সবার সব কাজ করার ক্ষমতা বা যোগ্যতা থাকেনা। তাই অন্যদের সাথে তুলনা না করে নিজের সন্তানকে বুঝার চেষ্টা করেন ও তার যোগ্যতা অনুযায়ী  তাকে কাজ করতে দেন ও মূল্যায়ন করুন।

শিশুদের দোষ ধরা:

কিছু বাবা মা আছেন যারা শিশুরা একটু ভুল করলেই তা নিয়ে বকাবকি করেন। এর চেয়ে শিশুরা যখন সঠিক কাজটা করবে  তখন বেশি বেশি প্রশংসা করতে হবে এবং ভুল কিছু করলে ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়ে বলতে হবে। তাকে ভালো-মন্দের তফাৎ টা শেখাতে হবে। বকাবকি করলে ভুল গুলো নিয়ে তার আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে পারে।

চিৎকার চেঁচামেচি করা:

শিশুদের সাথে চিৎকার করে কথা বলা মোটেও উচিৎ না। শিশুরা এই সময় তার আশেপাশের পরিবেশ থেকে সবকিছু শিখতে থাকে ও নিজের মধ্যে তা ধারন করে নেয়। একটি ৩ বছরের শিশু অনেক কাজ করে যেন মনে হয় সে সব বুঝে। ওরা না বুঝেই অনেক কথা বলে বা কাজ করে। ওরা ভুল করলে তা যে কেন ভুল নিজেও জানেনা। আপনি যখন তাদের সাথে চিৎকার করবেন,বকবেন ওরা ভাববে পছন্দ না হলেই চিৎকার করা যায় এবং এরপর কিছু পছন্দ না হলেই চিৎকার করবে এবং কোনো কিছু না বুঝেই আপনার সাথে তর্ক করবে।

শিশুদের সামনে মা-বাবার ঝগড়া করা:

পরিবারে থাকতে গেলে ঝগড়া-ঝাঁটি হতেই পারে। তাই বলে শিশুদের সামনে এমন আচরণ কখনোই করা উচিত নয় যাতে করে শিশুটির মনে মারাত্মক আঘাত পায়। এরকম হলে বাবা-মায়ের সম্পর্কে ভুল নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে।

শিশুর নেয়া সিদ্ধান্তে উৎসাহ নেওয়া:

শিশুরা ছোট হলেও ওদের নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ তৈরি হয়ে যায় মোটামুটি ৩-৪ বছর থেকেই। সব ব্যাপারে শিশুদের ডিসিশন নিজে আরোপ না করে ওদের প্রতিটা কাজে নিজে নিজেই নেওয়ার সুযোগ করে দিন। যেমন ২ টা পোশাক দিয়ে এর মধ্যে কোনটা পরবে জানতে চাইলে মাঝে একটা নিজে ঠিক করার সুযোগ পেলে ওরা ভাববে ওদের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।  তাকে চিন্তা করার, ডিসিশন নেওয়ার সুযোগ করে দিন। ১০-১১ বছর বয়সের শিশুকে নিজের পড়ার টেবিল গোছানো, স্কুলের ব্যাগ গোছানো, জুতোর ফিতা বাঁধা, খাবারের প্লেট ধুয়ে রাখা ইত্যাদি ছোট খাটো কাজ ওকেই করতে দিন।

শারিরীক নির্যাতন দেখা যায় কিন্তু মানসিক নির্যাতন দৃশ্যমান নয়।

শারিরীক নির্যাতন দেখা যায় কিন্তু মানসিক নির্যাতন দৃশ্যমান নয়।

বৈষম্যমূলক আচরণ না করা:

বাবা-মায়েরা সব কিছুতেই সন্তানের অমঙ্গল দেখেন। ফলে ভালো খারাপের সিদ্ধান্তটাও তাদের কাছ থেকেই বেশি আসে। কার সাথে মিশবে বা কার সাথে মিশবেনা এ ব্যাপারগুলোও অনেক সময় তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। বাচ্চাদের সামনে সামাজিকভাবে নিম্নপদস্থ লোকেদের (যেমন, গৃহকর্মী, ময়লা পরিষ্কারের লোক, ভিক্ষুক, গণ পরিবহণের কর্মচারী ইত্যাদি) সাথে খারাপ আচরণ করলে ওরাও এরকম বৈষম্যমুখী মানসিকতা নিয়ে বড় হবে। মানুষে মানুষে ভালোবাসা না থাকলে সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠার পথ বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

শিশুকে ভয় দেখাবেন না:

শিশুকে দিয়ে কাজ আদায় করার জন্য অনেকেই শিশুকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে দিয়ে থাকে। যেমন- তাড়াতাড়ি খাও নয়তো তোমাকে কালো বিড়ালের কাছে দিয়ে দিবো। বা যদি কথা না শোন তোমাকে অনেক মারবো ইত্যাদি। এসব ভয় দিলে শিশুরা প্রথমে ভয় পেলেও পরে বুঝে যায় এসব মিথ্যা কথা। এগুলো ওদের মানসিকতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তখন তারা নিজেরাও কাজ দায়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয়।

শিশুকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করা:

অনেকেই ভাবে ছোট শিশুর বোঝার ক্ষমতা কম। কিন্তু শিশু ছোট হলেও ওদের আত্মসম্মানবোধ টনটনে থাকে। শিশুর কোন ভুল নিয়ে বা লজ্জা পায় এমন কোন কথা নিয়ে মোটেও কারও সামনে হাসাহাসি করা উচিৎ না। এতে শিশুরা মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়

বদদোয়া দেওয়া:

শিশুকে তার ভুলের জন্য অভিশাপ দেওয়া খুবই ভয়ংকর কাজ। সব সময় অভিশাপ দিলে শিশুরা বিশ্বাস করা শুরু করতে থাকে যে তারা আসলে এসবেরই যোগ্য। তারা নিজেদের আত্মবিশ্বাস হারাতে শুরু করে। আবার তারা নিজেরাও অভিশাপ দেওয়া শিখবে এবং বাইরের মানুষকে, এমনকি বাবা মাকেও অভিশাপ দিতে থাকে। তাছাড়া বাবা মায়ের দোয়া বেশি কবুল হয়। আল্লাহ না করুক এমন কোন অভিশাপ রাগের মাথায় দেয়া দিলেন যা সত্য হয়ে গেলে নিজেরাই কষ্ট পাবেন ।

শিশুকে ভালোবাসুন, সেও ভালোবাসা শতগুণ করে ফিরিয়ে দেবে।

শিশুকে ভালোবাসুন, সেও ভালোবাসা শতগুণ করে ফিরিয়ে দেবে।

সব ব্যাপারে উপদেশ দেওয়া:

একটা ছোট শিশু কোন কাজে বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেনা। দেখা গেছে ২ বছরের একটা শিশু সর্বোচ্চ ৬ মিনিট একটা ব্যাপারে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে এবং ৪/৫ বছরের শিশুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট। তাই তাদের একটা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে উপদেশ দিলে ঐ ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যেতে পারে।

অবিশ্বাস করা:

২/৩ বছরের শিশুরা যখন মিথ্যা বলে তারা বুঝেই না মিথ্যা কি। নিজেদের কোন বকা বা রাগারাগি থেকে নিজেকে বাঁচাতেই একটা অজুহাত দাঁড় করিয়ে দেয়। আপনি যদি নিজের সন্তানকে বিশ্বাস না করেন তাহলে তারাও অবিশ্বাস করা শিখবে । আর সত্য বললে বিশ্বাস না করলে তারা মিথ্যাই বেশি বলবে। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো আপনি বিশ্বাস করবেন না এই ভয়ে সে হয়তো তার সাথে হওয়া শারিরীকভাবে নিগৃহ হওয়ার কথা গোপন রাখবে।

নাশকতা:

কিছু বাবা মা আছে যারা সন্তান পালনের ক্ষেত্রে চরমপন্থা অবলম্বন করে। শিশুদের অতিরিক্ত শাস্তি দেয়। একটা শিশু কোন ভাবেই এমন শারীরিক নির্যাতনের জন্য যোগ্য না। এভাবে মারলে শিশুরা মানসিকভাবে আঘাত পায় এবং মানসিক ভারসাম্য নড়বড়ে হতে পারে। ফলে তারা নিজেরা কোন কাজ করতে, সিদ্ধান্ত নিতে, জীবনে এগিয়ে যেতে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।

শেষে সবার জানা একটি গল্প; এক তরুণ বাবা তার বৃদ্ধ বাবাকে ঝুড়িতে করে দূরে কোথাও ফেলে আসতে যাচ্ছে। এমন সময় তার  ছোট্ট সন্তানটি বলে উঠলো ‘বাবা, ঝুড়িটি নিয়ে এসো। তুমি বৃদ্ধ হলে তোমাকেও ফেলে আসতে হবে না!’

অর্থসূচক/তাবাচ্ছুম/কাঙাল মিঠুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ