পুঁজিবাজারে আস্থার কোনো সঙ্কট নেইঃ রকিবুর রহমান
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

পুঁজিবাজারে আস্থার কোনো সঙ্কট নেইঃ রকিবুর রহমান

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক সভাপতি ও বর্তমান পরিচালক মোঃ রকিবুর রহমান বলেছেন, পুঁজিবাজারে আস্থার কোনো সংকট নেই। ভাবমূর্তির সঙ্কটও নেই এই বাজারে। বাজার ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছে। ইতোমধ্যে এই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানার অংশীদার হতে বিশ্বের সেরা কিছু প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিয়েছে। আগামীতে এই বাজারে ডেরিভেটিভস, অপশনসহ নানা প্রোডাক্ট চালু হবে। তাতে বাজারের ব্যাপ্তি অনেক বাড়বে। অর্থনীতিতে এই বাজার অনেক বেশি অবদান রাখবে। অর্থসূচককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক গিয়াস উদ্দিন

rakibur-rahman3

অর্থসূচকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক সভাপতি ও বর্তমান পরিচালক মোঃ রকিবুর রহমান। ছবি: মহুবার রহমান

অর্থসূচক: বাজারের বর্তমান অবস্থাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

রকিবুর রহমান: বাজার এখন বেশ স্থিতিশীল। বাজারে আস্থা ফিরে আসছে এবং বাজার তার নিজস্ব গতিতে চলছে। আমরা কিছুদিন ধরেই কিন্তু বলছিলাম, বাজার টেক অফ করছে। ঈদের আগে আমরা দেখেছি, ডিএসইতে নিয়মিত ৪শ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।গত তিনদিন লেনদেন হয়েছে ৫শ কোটি টাকার বেশি।

লেনদেনের পাশাপাশি এ সময়ে বেশ কিছু শেয়ারের দামও যথেষ্ট বেড়েছে। তবে এখনও অনেক শেয়ারের দাম বেশ কম। এগুলোর দাম বাড়ার সুযোগ আছে। সব মিলিয়ে ধারাটি যথেষ্ট ইতিবাচক।

আমি বাজার নিয়ে আশাবাদী। তবে সবাইকে পরিপক্ক আচরণ করতে হবে। বাজারে যারা স্টক ব্রোকার, ডিলার, প্রাতষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, মার্চেন্ট ব্যাংকার, পোর্টফলিও ম্যানেজার- সবাই যদি তার জায়গা থেকে কাজ করে তাহলে বাজার গতিশীল বেশি সময় লাগবে না।

একটি কথা আমি বার বার বলে আসছিলাম প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের শেয়ার ধারণ ক্ষমতা অনেক বেশি। কিন্তু যারা পোর্টফোলিও করে তারা প্রতিদিনের ট্রেডার হয়ে গেছে। এটি তাদের করা ঠিক না। আর যদি করে তাহলে বাজার তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে যেতে পারবে না। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সব সময় দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করে। এখানে দুটি পদ্ধতি হতে পারে। একটি হলো ক্যাপিটাল গেইন, অন্যটি ডিভিডেন্ড প্রাপ্তি। কারণ তার কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদেরকে লভ্যাংশ দিতে হবে।

অনেক সম্পদ ব্যবস্থাপক মিউচ্যুয়াল ফান্ডের টাকা এফডিআর করে রেখে দিয়েছে। যে পরিমাণ টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার বাধ্যবাধকতা আছে, তারা তা করছে না। তাদেরকে দায়িত্বশীল হতে হবে।  বাজারে অনেক ভালো শেয়ার আছে, যেখানে তারা দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করতে পারে। তারা যদি ইতিবাচক তাহলে বাজার জায়গা মতো যেতে বেশি দিন সময় লাগবে না।

অর্থসূচক: আপনি আস্থার পাশাপাশি ভাবমূর্তি সঙ্কট না থাকার কথা বলছিলেন.

রকিবুর রহমান: হ্যা, আমি জোরালোভাবে বলতে চাই, বাজারে ভাবমূর্তির কোনো সঙ্কট নেই। থাকলে  দেশি-বিদেশি এতগুলো খ্যাতনামা কোম্পানি ডিএসইর পার্টনার হওয়ার জন্য আগ্রহ দেখাতো না। আপনি জানেন, ব্রামার অ্যান্ড পার্টানার্স, নাসডাক, সিডিসি, কেএফডব্লিউ, আইএফসি, কিং ওয়ে ক্যাপিটাল এবং বাংলাদেশের স্কয়ার গ্রুপসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান কিন্তু ডিএসই মালিকানার একাংশ কিনে অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তারা নিশ্চয়ই এই বাজারের অনেক সম্ভাবনাও দেখছে। তারা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

বিনিয়োগকারীদের বলতে চাই হতাশ হওয়ার সময় শেষ। এখন আপনার আশার সময়

ডিএসই বর্তমান মূলত ইক্যুইাটি নির্ভর ব্যবসা করে। আগামীতে এখানে ডেরিভেটিভস,বন্ড, অপশন ইত্যাদি চালু হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সব সূচক ভালো। ভালো ভবিষ্যত দেখছে, সব মিলিয়ে তারা আবেদন করেছে। সে হিসাবে আমি বিনিয়োগকারীদের বলতে চাই হতাশ হওয়ার সময় শেষ। এখন আপনার আশার সময়, কোন সময় বাজারে আসবেন এটি আপনার বিষয়। কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন সেটিও আপনার বিষয়। তবে এখন আর আস্থা বা ইমেজের কোনো সংকট নেই। ইমেজের সংকট থাকলে বিদেশী কোনো প্রতিষ্ঠান পার্টনার হওয়ার জন্য আবেদন করতো না।

rakibur-rahman

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক সভাপতি ও বর্তমান পরিচালক মোঃ রকিবুর রহমান। ছবি: মহুবার রহমান

অর্থসূচক: মাঝখানে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে একটি সমস্যা ছিল, এখন সেটি নেই..

রকিবুর রহমান: হ্যাঁ, ব্যাংকগুলোর ওভার এক্সপোজারের একটি সমস্যা ছিল। খুব ভালোভাবে এর সমাধান হয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রক্রিয়ায় এর সমাধান করেছে, তাতে বাজারে বিক্রির কোনো চাপ তো তৈরি হয়ই নি, বরং ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সক্ষমতা বেড়েছে।

তবে আইনীভাবে সক্ষমতা থাকলেই হবে না। পেশাদারি সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে। সেখানে ভালো রিসার্চ টিম থাকতে হবে। আপনি শুনে অবাক হবেন, বাংলাদেশের বড় ব্যাংকগুলোর একটির চেয়ারম্যান আমাকে বলছিলেন, তারা তাদের সাবসিডিয়ারিকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার জন্য ৫শ কোটি টাকা দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখি তারা বিনিয়োগ না করে ইসলামিক ওয়েতে ডিপোজিট করে রেখে দিয়েছে। তাহলে বলেন কিভাবে হবে। পরে আমি তাকে বললাম আপনারা রিসার্চে জোর দেন। যাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন তারা সক্ষম না। সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারলে এই বাজার থেকে এফডিআরের সুদের চেয়ে অনেক বেশি মুনাফা পাওয়া সম্ভব।

অর্থসূচক: অনেকগুলো কোম্পানি বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করছে। কিন্তু এসব বন্ড বাজারে তালিকাভুক্ত না। একটি ভাইব্রেট বন্ড মার্কেটের জন্য ডিএসই কতটা প্রস্তুত?

রকিবুর রহমান: এটির জন্য বিএসইসি ও ডিএসই মিলে কাজ করছে। এটিকে পপুলার করার জন্য এ মার্কেটের ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করছি। বাজারকে গতিশীল করার জন্য বন্ড মার্কেটের বিকল্প নেই। চুড়ান্তভাবে আমাদেরকে বন্ড মার্কেটে আসতে হবে। বন্ড যত বেচা-কেনা করা যাতে ততই অপশন বেড়ে যাবে। এক সময় এটি শক্তিশালী হবে। দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করতে হবে। অবকাঠামোর উন্নয়ন ও বিদ্যুত খাতের জন্য হলেও এটি প্রয়োজন। সরকারের আশুগঞ্জের মত যে পাওয়ার প্রজেক্টগুলো বন্ধ হয়ে আছে, সেগুলো চালু করার জন্য  বা বড় বড় যে প্রজেক্ট আছে তার জন্য পুঁজিবাজার থেকে টাকা নেওয়া যেতে পারে। সরকার ব্যাংক, এডিবি ও বিশ্ব ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে প্রজেক্ট করলে যতটুকু উপযোগিতা পাওয়া যাবে পুঁজিবাজারে থেকে টাকা নিলে তার চেয়ে অনেক বেশি উপযোগিতা পাওয়া যাবে। এ সমস্ত জায়গা থেকে টাকা নিলে তাদেরকে সুদ দিতে হবে। এর একটি চাপ বাজেটে পড়ে। আর পুঁজিবাজার থেকে টাকা নিলে সুদ না ব্যবসার একটি অংশ লভ্যাংশ হিসাবে দিবে।

অর্থসূচকঃ সরকারি শেয়ার অফলোডের প্রক্রিয়ায় কোনো গতি নেই। এটিকে কীভাবে দেখছেন?

রকিবুর রহমান: এখনই উপযুক্ত সময় সরকারী শেয়ার বাজারে অফলোড করার। অনেকেই সরকারি শেয়ারকে বাজারে নিয়ে আসার ভুল ব্যাখ্যা দেয়। তারা বলে, সরকারি শেয়ারের মালিকানা অন্যের হাতে দেওয়া ঠিক না। আমি বলতে চাই, এটি কিন্তু মালিকানা বদল নয়, এসব কোম্পানির সঙ্গে জনসাধারণকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা। এতে কোম্পানিগুলোতে স্বচ্ছতা বাড়বে।

আপনাদের মনে আছে, ২০১০ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুততম সময়ে সরকারি কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানি বাজারে আসেনি। মাননীয় অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে বেশ জোর দিয়েছেন। আমরা আশা করি, এবার কিছু কোম্পানি বাজারে আসবে।

অর্থসূচক: সম্প্রতি বিএসইসি মার্কেট মেকার আইনের খসড়া তৈরি করেছে। মার্কেট মেকার হলে বাজারে কী ধরনের প্রভাব পড়বে?

রকিবুর রহমান: স্থিতিশীল বাজারের জন্য মার্কেট মেকারে অনেক বেশি প্রয়োজন। মার্কেট মেকাররা মন্দা বাজারে শেয়ার কিনে সাপোর্ট দেবে, অন্যদিকে বাজার অনেক তেজি হয়ে গেলে তারা শেয়ার বিক্রি করে বাজারের উত্তাপ কমাবে। মার্কেট মেকাররা বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার সম্পর্কে ঘোষণা দেবে, তারা শেয়ারের কমে ঘোষিত দামে এলে তা কিনে নেবে, আবার ঘোষিত সর্বোচ্চ দামে পৌঁছালে তারা বেচে দেবে। এতে করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অনেক গুণে বেড়ে যাবে। এক পর্যায়ে কিনে বাজারকে সাপোর্ট দিবে আবার সময় হলে তারা তা বিক্রি করবে। সুন্দর পুঁজিবাজারের জন্য মার্কেট মেকারের পাশাপাশি ও বাইব্যাক বিধান্ও অনেক প্রয়োজন।

rakibur-rahman2অর্থসূচক: বাইব্যাক চালু করতে হলে কোম্পানি আইন সংশোধন করতে হবে?

রকিবুর রহমান: সময় এসছে এখন এই কাজগুলো করতে হবে। বাজারের জন্য সব ধরণের অপশন তৈরি করে রাখতে হবে। যে সময় যেটি প্রয়োজন, সে সময় সেটি কাজে লাগবে।কোম্পানি আইন সংশোধনও সময়ের দাবি।

অর্থসূচক: আইপিও নিয়ে বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে, এতে আপনার মত কী?

রকিবুর রহমান: বাজার সম্প্রসারণের জন্য আইপিও আসতে দিতে হবে। এটি কোনো কথা না যে বাজারের স্ট্রেন্থ (Strength) নেই, সে জন্য আইপিও দেওয়া যাবে না। আইপিও না আসলে তো বাজার বড় হবে না। পুঁজিবাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করে যারা শিল্পের প্রসার করতে চায় তাদের জন্যই এই বাজার। এখানে আমাদের দেখতে হবে কোম্পানিগুলো যে আর্থিক প্রতিবেদন দিচ্ছে তা কতটুকু সঠিক, কোম্পানিটি ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কিনা, তাদের ব্যবসার ফোকাসিং কেমন, সে ধরণের ব্যবসার রিস্ক কেমন এ বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে তাদেরকে বাজারে নিয়ে আসতে হবে।

অর্থসূচক: সে ক্ষেত্রে রেগুলেটরদের পাশিপাশি বিনিয়োগকারীদেরও কিছু দায়িত্ব আছে?

রকিবুর রহমান: অবশ্যই বিনিয়োগকারীদের দায়িত্ব আছে। এই যে বিএসইসির ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি শুরু হতে যাচ্ছে এটি অত্যন্ত ভালো কাজ। আমাদের এখানে নিজেরা বিনিয়োগ করতে ভালোবাসে। পৃথীবির অন্যদেশে এটি নেই। সেখানে ফান্ড ম্যানেজারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে। আমি বিনিয়োগকারীদের বিনীত অনুরোধ করি বাজারে বিনিয়োগের আগে দেখে শুনে বুঝে বিনিয়োগ করেন। তা না হলে অন্তত যে বিনিয়োগকারী সফল, তার সঙ্গে যেন থাকেন।

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ