কক্সবাজারে পর্যটকের ভিড়; বন্দি শিশুরাও মুক্ত এখানে
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

কক্সবাজারে পর্যটকের ভিড়; বন্দি শিশুরাও মুক্ত এখানে

‘মা! দেখ দেখ, ছেলেগুলো বালি দিয়ে ঘর বানাচ্ছে। আমিও বানাবো তাদের মতো করে।’

বালিয়াড়ির শহরে স্বপ্নের ঘর তৈরি করতে মায়ের কাছে এভাবে আবদার করল শিশু নেহাল। সে জানে না, সমুদ্রের দোলা চলে তার স্বপ্নের বাড়ি বেশিক্ষণ টিকে থাকবে না। তবু সাগর তীরে খেলায় মত্ত অন্যসব শিশুর মতো, সেও ঘর বানানোর কাজে মন দেয়।

নিহালের মা জানালেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী হওয়ার কারণে ছেলেকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। এবার ঈদ উপলক্ষে লম্বা ছুটি পাওয়ায় একমাত্র সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন দুজনই। সন্তান নিয়ে প্রথমবারের মতো কক্সবাজারে গিয়েছেন তারা।

এতোদিন নিহালের কাছে শুধু কল্পনা ছিল সমুদ্র। ছোট নিহালের ছোট কল্পনার থেকে কয়েক হাজার গুণ বড় সমুদ্র এখন তার চোখের সামনে। সমুদ্র তীরে তার বয়সী অনেক শিশুই নিজের মতো খেলায় মেতেছে। তবু নিহালকে একা ছাড়তে ভয় হয় মায়ের। তাই সমুদ্রের মায়াজালে ছেলে ঘুরলেও মায়ের চোখের স্থির দৃষ্টি ছেলের মুগ্ধকর দিনাতিপাতের দিকে। এতোদিন ছেলে ছিল ইট-পাথরের কর্মশালায়। এখন প্রকৃতির বিশালতায় নিহালের যে মুগ্ধতা- তা দেখে কিছুটা স্বস্তিতে মা-বাবা দুজনই।

coxs-bazar2

কক্সবাজারের সমুদ্র তীরে বালির ঘর বানাচ্ছে শিশু। ছবি: তৈয়ব সুমন

শুধুই নিহালের পরিবার নই। এবার কোরবানির ঈদের অবকাশ যাপনে হাজারো পরিবার হাজির হয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের লীলাভূমি কক্সবাজারে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকায় ঈদুল ফিতরের তুলনায় এবার কক্সবাজারে পযর্টকের সংখ্যা অনেক বেশি। এতে স্বস্তির সুবাতাস বইছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাঝেও।

পযর্টকরা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ছাড়াও শহর ও পার্শ্ববর্তী পর্যটন স্পট বিশেষ করে সেন্টমার্টিন, হিমছড়ি ঝর্ণা, দরিয়ানগর, ইনানী, টেকনাফ, ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মহেশখালী আদিনাথ মন্দির, রামুর বৌদ্ধ মন্দিরসহ ধর্মীয় তীর্থস্থানগুলোতেও প্রচুর সংখ্যক পর্যটক ভ্রমণ করছেন।

কক্সবাজারের পর্যটন স্পটগুলো ঘুরে জানা গেছে, এবারের ঈদুল আযহায় টানা ছুটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে কক্সবাজারে হাজির হয়েছেন পর্যটকরা। কোরবানির আনুষ্ঠানিকতার পর গত বুধবার বিকেল থেকে কক্সবাজারে পর্যটকদের ঢল নামে। ব্যক্তিগত গাড়ি ও বিভিন্ন সার্ভিস বাসে কক্সবাজারমুখী পর্যটকের কারণে চট্টগ্রাম কক্সবাজার সড়কে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট। স্থানীয় বিপণী কেন্দ্রগুলোও এখন দারুণ জমজমাট। কোরবানির ছুটিতে অবকাশের কথা ভুলে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

সমুদ্র সৈকতে কথা হয় কক্সবাজারের গোলদিঘী পাড়ের বাসিন্দা শাকিল চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, এই সৈকতেই বড় হয়েছি। বিভিন্ন সময় এখানে পর্যটকের ভিড় দেখেছি। তবে একই সময়ে এতো মানুষের উপস্থিতি আগে কখনও দেখিনি। এখানে স্বস্তির নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। পেশায় ফিজিওথেরাপিস্ট হওয়ায় সব সময় ব্যস্ত থাকতে হয়। কোরবানি ঈদের লম্বা ছুটির কারণে অনেকদিন পর সৈকতে ঘুরে বেড়ানোর সময় পেয়েছি।

coxs-bazar

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটকের ভিড়।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার অর্থসূচককে জানান, ঈদুল আযহার ছুটিতে গত মঙ্গলবার বিকেল থেকে প্রতিদিন লাখো পর্যটক কক্সবাজারে বেড়াতে আসছেন। হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর ৭০ শতাংশ কক্ষ আগাম ভাড়া হয়েছিল। এখন সব কক্ষই পর্যটকে ভরপুর। আগামীকাল রোববার পর্যন্ত শহরের হোটেল-মোটেলের কোনো কক্ষ খালি নেই।

ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টোয়াক বাংলাদেশ) সভাপতি মো. রেজাউল করিম জানান, এবার কোরবানি ঈদের ছুটিতে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কক্সবাজারে এসেছেন।

কক্সবাজার শহরের ঐতিহ্যবাহী বার্মিজ মার্কেটের ব্যবসায়ী সচিং সং জানান, কোরবানি ঈদের ছুটিতে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের কারণে বর্তমানে বেচা-বিক্রি চাঙ্গা।

একই রকম কথা বললেন শহরের টমটম চালক কাসেম। তিনি জানান, পর্যটকের আগমনে দৈনিক রিজার্ভ ভাড়া দশগুণ বেড়ে গেছে।

কক্সবাজার ঝিনুক শিল্প বহুমুখী সমবায় সমিতি মার্কেটের ব্যবসায়ী মোস্তাফা করিম জানান, পর্যটকদের আগমনে ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজারো পরিবার এখন কর্মব্যস্ত।

কক্সবাজার সৈকতে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সী-সেইভ লাইফ গার্ডের ম্যানেজার ইমতিয়াজ জানান, এবারের ঈদুল আযহার ছুটিতে কক্সবাজারে অনেক বেশি পর্যটক হাজির হয়েছে। হাজারো পর্যটক প্রতিদিন সমুদ্রস্নানে মেতে উঠছেন।

তিনি আরও জানান, সমুদ্রে চোরাবালি আছে এমন কিছু স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। লাবণী পয়েন্ট ছাড়া ১১০ কিলোমিটার সৈকতের অন্য কোথাও গোসলে নামা নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন। গোসলে নামার আগে পর্যটকদের জোয়ার-ভাটার সময় দেখে নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। জোয়ারের সময় সৈকতে সবুজ পতাকা এবং ভাটার সময় লাল নিশানা দেওয়া দেওয়া।

পর্যটকদের নিরাপত্তার দিকে লক্ষ্য রেখে সৈকতে পুলিশের টহলও বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী। এর পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছে র‌্যাব এবং সাদা পোষাকের পুলিশ। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য ইতোমধ্যে কক্সবাজারের ৭টি পর্যটন স্পটে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। এসব পয়েন্টে ১৩৬ জন ট্যুরিস্ট পুলিশ নিয়োজিত রয়েছেন।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ জানান, কক্সবাজার থেকে ইনানী সৈকত পর্যন্ত সব স্পটেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ ও টহল পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। রাতে হোটেল ও গেস্টহাউসগুলো পুলিশের নজরদারিতে থাকে।

অর্থসূচক/সুমন/এমই/

এই বিভাগের আরো সংবাদ