শহীদ কাদরীর প্রতি কবির সুমনের 'অভিবাদন'
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

শহীদ কাদরীর প্রতি কবির সুমনের ‘অভিবাদন’

সদ্যপ্রয়াত কবি শহীদ কাদরীর একটি বিখ্যাত কবিতা‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ এর আংশিক পরিবর্তন করে  সুর দিয়ে কণ্ঠে তুলেছিলেন কবীর সুমন। ১৯৯৪ সালে তিনি গানটি প্রকাশ করেন ‘গানওয়ালা’ অ্যালবামে। বিভিন্ন গানের আসরে এই কবিতাটিকে গানে রূপান্তরের বিষয়টি নিয়ে বলেছেন সুমন। গানটি নিয়ে কথা বলেছেন স্রষ্টা শহীদ কাদরীও।

কবির সুমনের পক্ষে তরুণ কবি মেহেদী হাসান সুমন, অনন্ত পলাশ ও ফটোগ্রাফার কামরুল হাসান মিথুন এই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন

কবির সুমনের পক্ষে তরুণ কবি মেহেদী হাসান সুমন, অনন্ত পলাশ ও ফটোগ্রাফার কামরুল হাসান মিথুন এই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন

তিনি তার কবিতার চাইতে সুমনের গানকেই বেশি শক্তিশালী হিসেবে উল্লেখও করেছেন। একবার কবি বলেছিলেন, আমি যদি গান গাইতে পারতাম, কখনও কবিতা লিখতাম না। গান যেভাবে যোগাযোগ করে, কবিতা কি তা পারে?

সুমন কবিতাটিকে গানে রূপান্তর করার অনুমতি চাইতে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে গিয়েছিলেন, কবির কাছে। কবি তখন সেখানে নতুন। শহীদ কাদরীর ভাষ্য, “এক পরিচিত ইউনিভার্সিটি শিক্ষক একদিন বললেন কলকাতার এক ছেলে আছে গান গায়, সুমন নাম। ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’ কবিতাটি গান করবে, আমার অনুমতি চাচ্ছে। তখন আমি খুব ডিপ্রেসড। বোস্টনে শীতকাল। চারপাশে অন্ধকার বরফ। দেশ থেকে চলে এসেছি আরও আগে। আমি চাইতাম বাংলায় কেউ যেন আমাকে মনে না রাখে। যেন আমি কখনও ছিলাম না। কিন্তু তা-ও কী এক ভাবনা এলো, কী এক ভাবনা এলো, ভাবলাম…sumon1

শহীদ কাদরী বয়সে কিছুটা বড় হলেও কবীর সুমনের সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো। দুই জনের পারস্পরিক বোঝাপড়াও ছিলো বেশ। কবীর সুমনের মতে, শহীদ কাদরীর মতো রসিক মানুষ তিনি খুব কমই দেখেছেন।

সেই বন্ধুবর কবির প্রয়াণে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসতে পারেননি কবির সুমন। কিন্তু তার প্রতিনিধিরা তার হয়ে কবির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন আজ শহীদ মিনারে।sumon2

কবির সুমনের পক্ষে তরুণ কবি মেহেদী হাসান সুমন, অনন্ত পলাশ ও ফটোগ্রাফার কামরুল হাসান মিথুন এই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এ বিষয়ে কবির সুমন তার ফেসবুকে যা লিখেছেন তার প্রায় সবটুকুই তুলে দেওয়া হলো..

‘কবি শহীদ কাদরির মৃতদেহ আজ ঢাকায় শহীদ মিনারে আনা হলো। আমার দুই ছেলে পলাশ ও মেহেদি আমার হয়ে পুষ্পার্ঘ্য রেখে দিলেন। কী বলব তাঁদের। কাকে কী বলব। পলাশ আমায় ফোন করলেন ঢাকা থেকে। জানালেন যে তাঁরা আমার হয়েও ফুল দিচ্ছেন। এই পুষ্পার্ঘ্য তাঁরা কলকাতার হয়েও দিলেন।

শহীদরা কলকাতারই মানুষ। তাঁদের বাড়িতে কিন্তু উর্দুর চলই বেশি ছিল। বলেছিলেন আমায় শহীদ। দাঙ্গার সময়ে স্থানীয় হিন্দুরা তাঁদের বাড়িতে গিয়ে জানান যে তাঁরা কাদরি পরিবারকে রক্ষা করবেন, কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার দরকার নেই। যতদূর মনে আছে শহীদ আমায় বলেছিলেন তাঁর আব্বা তখন প্রয়াত। আম্মা ছিলেন আর ছিলেন এক বড় ভাই। কিছুদিন তাঁরা তাঁদের পার্ক সার্কাসের বাসাতেই ছিলেন। কিন্তু দাঙ্গা ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ-অসাধ্য আকার নেওয়ায় স্থানীয় হিন্দুদেরই কেউ কেউ কাদরি পরিবারকে এসে জানান যে প্রতিপক্ষ এমনই হয়ে উঠেছে যে এবারে তাঁদের চলে যাওয়াই ভাল। শহীদরা কলকাতা ও ভারত ত্যাগ করেন।

কিন্তু কলকাতার জন্য শহীদ কেঁদেই গেলেন। – মনে আছে, ১৯৭৭ সালে তিনি জার্মানির কোলন শহরে গেলেন ছেলে লোবিদ (আদনান)-কে নিয়ে। একদিন লোবিদকে নিয়ে শহীদ আর আমি বেড়াতে বেরিয়েছি। চলেছি এক আইস্ক্রীমের দোকানের সামনে দিয়ে। লোবিদ বায়না ধরল আইসক্রীম খাবে। আমি ওকে নিয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছি লোবিদের পছন্দসই আইসক্রীম কিনব ব’লে, শহীদ বেশ জোর গলায় বলে উঠলেন, “বেটা, আরে আইসক্রীম তুই এখানে কি খাবি? আইসক্রীম খাওয়াব আমি তোকে কলকাতায় গিয়ে। দুনিয়ার সেরা আইসক্রীম কলকাতাতেই পাওয়া যায়।”

আমার দুই ছেলে পলাশ আর মেহেদি আজ সেই “সেরা আইস্ক্রীমের শহর” কলকাতার এক মানুষের হয়ে ফুলের অর্ঘ্য দিয়ে এলেন শহীদ কাদরিকে অভিবাদন জানিয়ে।shahid-suman

সারা বাংলাদেশ যখন পৃথিবীর এক সেরা আধুনিক কবিকে শেষ বিদায় জানাচ্ছে বাংলাদেশের এক টেলিভিশন চ্যানেল তখন আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন ফোনে। ঢাকার স্টুডিয়োয় আমার প্রাক্তন সহকর্মী, কবি আসাদ চৌধুরী ছিলেন। কতদিন পর আসাদের সঙ্গে দুটি কথা হল। কিন্তু উপলক্ষ্য? আমাদের এক বন্ধু চলে গেলেন। আসাদকে বলছিলাম – আমাকেও নিয়ে গেল না কেন? আসাদ প্রায় কেঁদে ফেলেছিলেন বোধহয়। আসাদ সকলকে জানালেন – জীবনের শেষের বছরগুলো শহীদ রোগগ্রস্ত ছিলেন, শারীরিক কষ্ট ছিল। কিন্তু তাঁর স্ত্রী নীরা কাদরি তাঁর সেবা শুশ্রুষা করে গিয়েছেন প্রাণপণে, তাঁকে সঙ্গ দিয়ে গিয়েছেন। কবি আসাদ চৌধুরী বলছিলেন। শহীদ, আমাদের সকলের শহীদ শরীরে কঠোর ব্যাধি নিয়েও মনের দিক দিয়ে তৃপ্ত, সুখী ছিলেন।

মনে আছে, ১৯৭৭ সালে কোলনে (আমার বয়স তখন ২৮, শহীদের ৩৫) আমার বাসার শোবার ঘরে বিছানায় তাঁর বিখ্যাত আলসেমি করতে করতে আর সিগারেটের পর সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে শহীদ কাদরি বলছিলেন একদিন, “সুমন, সুমন (প্রায়ই আমায় কিছু বলার আগে বার দুই তিন আমার নামটা বলতেন তিনি), আদর্শ বিবাহ কেমন হওয়া উচিত বলুন তো? (সিগারেটে বিপুল টান ও ধোঁয়া বের করা) – এই যে, আমি। আমি বড়জোর বাজার করে আনব। আর কিছু পারব না। আমি বিছানায় গড়াব এইভাবে আর বড় বড় কথা বলব। বড়জোর। আমার স্ত্রী আমায় বকুনি দেবেন। বলবেন – এই অলস লোকটাকে নিয়ে কী করা যায়। আমাদের ঘরে রান্নার গন্ধ বেরোবে, সুমন, সুমন। আমার বউ রাঁধছেন। ভাবুন। আপনাকেই কত কথা শুনিয়ে দেবেন তিনি আমার সম্পর্কে। বলবেন – বন্ধু বানানোর আর লোক পেলেন না ভাই। বকুনি বকুনি বকুনি…কিন্তু তারই ফাঁকে তিনি মুচোকি মুচোকি হাসবেন। বকুনির ফাঁকে ফাঁকে মুচোকি মুচোকি হাসি…”

আজ ফোনে কবি আসাদ চৌধুরির (তিনি ঢাকার এক টেলিভিশন স্টুডিয়োতে ছিলেন) কথা শুনে মনে হলো শেষ ক’বছরে অন্তত শহীদ কাদরি তাঁর ইপ্সিত “মুচোকি মুচোকি হাসি” দেখতেন মাঝেমাঝেই, হয়তো রোজই, থেকে থেকেই।

খালি গলায় ফোনে গাইছিলাম আমি “তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা”। বাংলাদেশের একটি চ্যানেল তা প্রচার করছিলেন। ‘হায় হায়’ করে সে গান শুনছিলেন আমার আর এক বন্ধু, কবি আসাদ চৌধুরি।

শহীদকে বলছিলাম, ফোনেই বলছিলাম – শহীদ, আপনি শুনছেন তো? জানি আপনি শুনছেন।

আর বেশি দিন বাকি নেই, বন্ধু। দেখা হবেই আবার। হতেই হবে।

আপনাকে অভিবাদন, শহীদ কাদরি।

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ