আজ ২২ শ্রাবণ
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

আজ ২২ শ্রাবণ

নয়ন তোমারে পায়না খুঁজিয়া, রয়েছো নয়নে নয়নে’ সাত বছরের এক শিশুর লেখা এ দুটি পংক্তি দেখে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যতটুকু আশ্চর্য হয়েছিলেন তার আশি বছরের জীবনের সফল রচনাসম্ভার দেখে আরও বেশি অবাক হচ্ছেন এখনকার সুধীজন। একাধারে কবি, ,ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। সব্যসাচী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কীর্তি যেনো এখানেই শেষ নয়।

আজ ২২ শ্রাবণ, রবি ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস।

কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পিতা ব্রাহ্ম ধর্মগুরু মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা  সারদাসুন্দরী দেবীর ১৪তম সন্তান।  কৈশোর পেরোনোর আগেই বাংলা সাহিত্যের দিগন্তে রবি নামের মতোই নিজেকে বিস্তার করতে শুরু করেন। মাত্র এগারো বছর বয়সে তার মৃত্যু নিয়ে লেখা  ‘মরণেরে তুঁহু মম শ্যাম সমান।…তাপ বিমোচন করুণ কোর তব/ মৃত্যু অমৃত করে দান/ তুঁহু মম শ্যাম সমান…’  ভানুসিংহ ঠাকুর ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়। চৌদ্দ বছর বয়সে  প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বনফুল’। সেই সময় তার মাতৃবিয়োগ ঘটে।

এগার বছর বয়সে উপনয়ন সম্পন্ন হবার পর ১৮৭৩ সালে  কয়েক মাসের জন্য পিতার সঙ্গে দেশভ্রমণে বের হন। এসময় পাঞ্জাব , হিমাচল ঘুরে বিভিন্ন মনীষীর কাছ থেকে সংস্কৃত, ইংরেজি, জোতিবির্জ্ঞান,  ধর্ম ও উপনিষদ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন।

দেশ ভ্রমণের নেশায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট বারো বার বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। ১৮৭৮ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে তিনি ৫ টি মহাদেশের ৩০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেন । বিশ্বভ্রমণের ফলে রবীন্দ্রনাথ তার সমসাময়িক অরিঁ বের্গসঁ, আলবার্ট আইনস্টাইন, রবার্ট ফ্রস্ট, টমাস মান, জর্জ বার্নার্ড শ, এইচ জি ওয়েলস, রোম্যাঁ রোলাঁ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছিলেন।

পারস্য, ইরাক ও সিংহল ভ্রমণের সময় মানুষের পারস্পরিক ভেদাভেদ ও জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তার বিতৃষ্ণা আরও তীব্র হয়েছিল মাত্র। অন্যদিকে বিশ্বপরিক্রমার ফলে ভারতের বাইরে নিজের রচনাকে পরিচিত করে তোলার এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক মতবিনিময়ের সুযোগও পেয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ যেসকল বইতে তার বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাগুলি লিপিবদ্ধ করে রাখেন সেগুলি হল: য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র (১৮৮১), য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি (১৮৯১, ১৮৯৩), জাপান-যাত্রী (১৯১৯), যাত্রী (পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি ও জাভা-যাত্রীর পত্র, ১৯২৯), রাশিয়ার চিঠি (১৯৩১), পারস্যে (১৯৩৬) ও পথের সঞ্চয় (১৯৩৯)।

বাংলাভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের মোট ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ৩৬টি প্রবন্ধ  ১৩টি উপন্যাস ও ও অন্যান্য গদ্যসঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছে। তার সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে- গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সঙ্কলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ নামে ৩২ খণ্ডে নামে প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়াও কবিগুরুর সামগ্রিক পত্রসাহিত্য আজ পর্যন্ত ১৯ টি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ছিন্নপত্র ও ছিন্নপত্রাবলী (ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীকে লেখা), ভানুসিংহের পত্রাবলী (রানু অধিকারীকে (মুখোপাধ্যায়) লেখা) ও পথে ও পথের প্রান্তে (নির্মলকুমারী মহলানবিশকে লেখা) বই তিনটি রবীন্দ্রনাথের তিনটি উল্লেখযোগ্য পত্রসংকলন।

প্রথম বাঙালি ও এশীয় হিসেবে নোবেল সাহিত্যে পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে। আধ্যাত্মিক ও মরমী ধারার বই ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি সংস্করণ ‘Gitanjali – Song Offerings’ এর জন্য সাহিত্যের সর্বোচ্চ এই পুরস্কার লাভ করেন।

বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্বে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যাঁর লেখা গান দুটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত। একাধারে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা তিনি। ১৯০৬ সালের বঙ্গভঙ্গ প্রেক্ষাপতটে লেখেন “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” ।  গান ও সুর নিয়ে প্রাচ্য এবং প্রাচ্যাত্যের মেলবন্ধন করিয়েছিলেন তিনি। তার অনেক গানে বিদেশী সুরের ছাপ রয়েছে।

তাছাড়া কাজ করেছেন লোক সংস্কৃতি নিয়েও । কুষ্টিয়ার শিলাইদহে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি বাংলার বাউল গান ও সংস্কৃতির দিকে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ‘রবি বাউল’ নামে অসংখ্য গান লিখেছেন। ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’  ইত্যাদি এই ঢংযের গান হিসেবে সুপরিচিত। এমনকি ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সুরটিও গগন ডাকহরকরা নামের একজন লোক গায়কের ‘আমি কোথায় পাবো তাঁরে,আমার মনের মানুষ যে রে’ সুর থেকে সংগ্রহ করা।

এছাড়াও কবিগুরু ভূষণে বিভূষিত রবীন্দ্রনাথের কাব্য-সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য- ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা চিত্ররূপময়তা, অধ্যাত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনা, ভাব, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনার সাথে সমকালীন রাজনীতিও উঠে এসেছে।

সাহিত্যে বিশেষ অবয়াদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে ১৯১৫ সালে। কিন্তু জালিওয়ালাবাগে হত্যাকান্ডের জন্য তিনি নাইট উপাধি ত্যাগ করেন ১৯১৯ সালে। ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সোচ্চার এই মহামানব  ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ বিহার প্রদেশে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুকে গান্ধীজি “ঈশ্বরের রোষ” বলে অভিহিত করলে,  গান্ধীজির এহেন বক্তব্যকে অবৈজ্ঞানিক বলে চিহ্নিত করেন এবং প্রকাশ্যে তার সমালোচনা করেন।

জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি নিয়মিত ছবি আঁকা শুরু করেন। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে অঙ্কিত তার স্কেচ ও ছবির সংখ্যা ছিলো আড়াই হাজারের বেশি। দক্ষিণ ফ্রান্সের শিল্পীদের উৎসাহে পিগাল আর্ট গ্যালারিতে তার প্রথম চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ১৯২৬ সালে । এরপর সমগ্র ইউরোপেই কবির একাধিক চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ চার বছর ঘন ঘন অসুস্থতার মধ্য দিয়ে গেছে। এ সময়ের মধ্যে দু’বার অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল কবিকে। আশঙ্কাজনক অবস্থা হয়েছিল। তখন সেরে উঠলেও ১৯৪০ সালে অসুস্থ হওয়ার পর আর তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। মূত্রথলিতে সংক্রমণ ঘটায় তৎকালীন ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের চিকিৎসাধীন ছিলেন। সুস্থ করার জন্য অস্ত্রোপচার করা হলেও শেষ পর্যন্ত অবনতি ঘটে স্বাস্থ্যের। তার যাওয়ার সম্ভাব্যতা দেখে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন_

‘দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্তপারের কোলে/ বাংলার কবি শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি তুমি চলে যাবে বলে/ শ্রাবণের মেঘ ছুটে এলো দলে দলে।’

১৯৪১ সালে জোড়াসাঁকোর বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন প্রদীপ। এমনি এক ২২ শ্রাবণে। কিন্তু তিনি এখনও অম্লান তার সৃষ্টিকর্মে, যেমন তারই রচনা  ‘জীবিত ও মৃত’ র ছোটগল্পের  উক্তিতে,  ‘কাদম্বরী মরিয়া প্রমাণ করিল , সে মরে নাই।’

 

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ