সুখী অস্তিত্বের সুখ ছিঁড়ে গেলো ...
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » বিবিধ

সুখী অস্তিত্বের সুখ ছিঁড়ে গেলো …

…প্রত্যেকটা সুখী অস্তিত্বের সুখ ছিঁড়ে গেলো। এ কান্নায় রক্তের গন্ধ, প্রতিবাদ সুখী শোক। তারপর সব অন্ধকার…

‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসে সুজাতার মৃত্যু দৃশ্য যেভাবে লিখেছিলেন অনেকটা সে ভাবেই চলে গেলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী। ভক্তদের কান্নায় রক্তের গন্ধ না থাকলেও অনুভবে ছিল হাসপাতালের বেডের প্রিয় লেখিকার শেষ দীর্ঘশ্বাস।

মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে বাংলাদেশের ঢাকায়। পিতা মনীশ ঘটক ছিলেন (যুবনাশ্ব) সাহিত্যিক। তিরিশের দশকে অবিভক্ত ভারতবর্ষে ‘কল্লোল’ পত্রিকাকে ঘিরে যে সাহিত্য আন্দোলন গড়ে ওঠে তার একজন শক্তিশালী কবি ছিলেন তিনি। চাচা ঋত্বিক ঘটক ছিলেন ভারতের চলচ্চিত্রের ব্যতিক্রমী প্রতিভাদের একজন।

mohasweta

মহাশ্বেতা দেবী

পিতার বদলির চাকরির কারণে জন্মের পরপরই ভারতে চলে যান মহাশ্বেতা দেবী। ১৯৩৬ সালে শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন তিনি। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন এই লেখিকা। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বিজয়গড় কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন মহাশ্বেতা দেবী। একই সময়ে সাংবাদিক এবং লেখিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।

তার স্বামী বিজন ভট্টাচার্য একজন নাট্যকার এবং পুত্র নবারুণ ভট্টাচার্যও একজন সাহিত্যিক।

ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈকে নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘ঝাঁসি কি রাণী’ দিয়ে সবার নজরে আসেন মহাশ্বেতা। এ উপন্যাসে দেখা গেছে ইতিহাস ও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। এই লেখার মাধ্যমে দলিত ও নিম্নবিত্তদের অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। প্রতিবাদী মধ্যবিত্ত প্রান্তিক ও পাহাড়ি-বনাঞ্চলের জীবন ও যুদ্ধ, নৃ-গোষ্ঠীর স্বাদেশিক বীরগাঁথা আখ্যান রচনার পারদর্শিতা বাংলা সাহিত্যের ব্যতিক্রম ধারায় অভিষিক্ত করেছে তাকে। তার লেখায় সমাজের প্রান্তজনের যে কথা  বার বার এসেছে- তা কেবল শোষিতের আখ্যান নয়; বরং স্বদেশীয় প্রতিবাদী চরিত্রের সন্নিবেশ।

বাম ঘরানার এই লেখক মুণ্ডা ও সাঁওতালদের সংগ্রামী জীবন নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনি লোধা, শবরসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারের জন্য জীবনভর সংগ্রাম করে গেছেন। এছাড়া ঐতিহাসিক পটভূমিকায় খুদাবক্স ও মোতির প্রেমের কাহিনী নিয়ে ১৯৫৬ সালে লেখেন ‘নটী’, লোকায়ত নৃত্য-সংগীতশিল্পীদের নিয়ে লিখেছেন ‘মধুরে মধুর (১৯৫৮)’। তার অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে যমুনা কী তীর (১৯৫৮), তিমির লগন (১৯৫৯), রূপরাখা (১৯৬০), বায়োস্কোপের বাক্স (১৯৬৪)। তবে হাজার চুরাশির মা (১৯৭৪) উপন্যাস দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি।

মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যকর্ম ইংরেজি, জার্মান, জাপানি, ফরাসি এবং ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। এছাড়া অনেকগুলো গ্রন্থ হিন্দি, অসমীয়া, তেলুগু, গুজরাঠি, মারাঠী, মালায়মি, পাঞ্জাবি, ওড়িয়া এবং আদিবাসী ভাষায়ও অনুদিত হয়েছে।

অরণ্যের অধিকার উপন্যাসের জন্য ১৯৭৯ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন মহাশ্বেতা দেবী। ১৯৯৮ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানিত ডক্টরেট ডিগ্রি পান তিনি। ভারত সরকারের ‘পদ্মশ্রী’ পদকের পাশাপাশি ভুবনমোহিনী দেবী পদক, নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য স্বর্ণপদক লাভ করেছেন এই সাহিত্যিক।

আদিবাসীদের নিয়ে কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৭ সালে ম্যাগসাসাই পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া ভারতীয় ভাষা পরিষদ সম্মাননা-২০০১ , সার্ক সাহিত্য পুরস্কার (২০০৭), জগত্তারিণী পুরস্কার, বিভূতিভূষণ স্মৃতি সংসদ পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত লীলা পুরস্কারও লাভ করেন এই লেখিকা।

গত ২২ মে ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিং হোমে ভর্তি হন মহাশ্বেতা দেবী। দীর্ঘদিন হাসপাতালের থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার (২৮ জুলাই) পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তিনি। এ যেন মৃত্যু নয়। যেন তার সৃষ্ট চরিত্রের মতো, ‘… বাইশ বছর আগেকার এক সকালে ফিরে গিয়েছিলেন, প্রায়ই যান। নিজেই ব্যাগে গুছিয়ে রাখেন তোয়ালে, জামা, টুথব্রাশ…’

অর্থসূচক/মিঠুন/এমই/

এই বিভাগের আরো সংবাদ