স্মার্ট ইংরেজি জানা ধনী তরুণরা জঙ্গি সংগঠনের টার্গেট হচ্ছে কেন?
রবিবার, ৩১শে মে, ২০২০ ইং
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » লিড নিউজ

স্মার্ট ইংরেজি জানা ধনী তরুণরা জঙ্গি সংগঠনের টার্গেট হচ্ছে কেন?

গুলশান হত্যাকাণ্ডে জড়িত তিন তরুণের পরিচয় প্রকাশ হওয়ার পর দেশের বেশিরভাগ মানুষ বিষ্ময়ে হতবাক হয়েছেন। ওই তিন তরুণ উচ্চবিত্ত ও অভিজাত পরিবারের সন্তান। পড়াশোনা করেছেন দেশের নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এদের মধ্যে একজন নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি, একজন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং একজন স্কলাস্টিকা স্কুলে পড়াশোনা করেছে।

গুলশানের খুনীদের নিয়ে বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই এসেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আইএসের পক্ষ থেকে নতুন হুমকী। সিরিয়ায় আইএসের কথিত রাজধানী রাকা থেকে তিন তরুণ বাংলায় এক ভিডিও বার্তায় এই হুমকি দিয়েছে। ফেসবুক সূত্রে বের হয়ে এসেছে এদের পরিচয়ও। এদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে পড়তো, একজন পড়াশোনা করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। হুমকিদাতাদের অন্য একজন দন্তচিকিৎসক।

শোলাকিয়ায় হামলাকারী নিহত আবীরও নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র।

Gulshan-Attacker

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাাঁর হামলাকারী, যাদের তিনজন উচ্চ শিক্ষিত ও ধনী পরিবারের সন্তান

হামলাকারী, দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ ও আইএসে অংশ নেওয়া কিছু তরুণের পরিচয় প্রকাশের পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। অনেকেই ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছেন না, এমন শিক্ষিত, স্মার্ট ছেলেরা জঙ্গীদের কবলে পড়ছে কীভাবে?

আসলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর জন্মদাতাদের উদ্দেশ্য, সদস্য সংগ্রহের কৌশল, মডিউল ইত্যাদি পর্যালোচনা করলেই এর উত্তর পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ানক জঙ্গী সংগঠন আইএসের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করলেই সব প্রশ্নের উত্তর মিলে যায়।

শিক্ষিত তরুণরা আইএসেই যাচ্ছে বেশি

আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় প্রধান দুটি ইসলামী জঙ্গি সংগঠন হচ্ছে আল কায়েদা ও ইসলামি স্টেট বা আইএস। এর মধ্যে আল কায়েদার প্রতি উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের ঝোঁক কম। এখানে মাদ্রাসা থেকে পাশ করা তরুণের সংখ্যাই বেশি। অন্যদিকে আইএসের প্রধান টার্গেটই হচ্ছে উচ্চ শিক্ষিত, স্মার্ট ও ইরেজি জানা তরুণ-তরুণী।

গুলশান হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্ত্রাসীদেরকে সরকার স্থানীয় জঙ্গী বললেও আইএস তাদেরকে নিজেদের সদস্য বলে দাবি করেছে। শুক্রবার রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার পর পরই আইএসের বরাত দিয়ে বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান সাইট ইন্টেলিজেন্স হামলাকারী পাঁচ তরুণের ছবি প্রকাশ করে। যাদের চার জনের ছবির সঙ্গে সেনা অভিযানে নিহত প্রকৃত হামলাকারীর চেহারা মিলে গেছে। অন্যদিকে হত্যকাণ্ডের পর সাইট ইন্টেলিজেন্স রেস্তোরার ভেতরে নিহত ও রক্তাক্ত কয়েকজন বিদেশির ছবি প্রকাশ করেছে।

মঙ্গলবার নতুন হামলার হুমকিদাতারা সিরিয়া থেকেই হুমকি দিয়েছে বলে সাইট ইন্টেলিজেন্স দাবি করেছে।

বিভিন্ন সূত্রের বরাত একাধিক সংবাদপত্রের প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, দেড়শ থেকে দুশ উচ্চ শক্ষিত তরুণ বর্তমানে সিরিয়ায় আইএসের হয়ে লড়ছে।

New-Attack-Threat

সিরিয়া থেকে বাংলাদেশে নতুন হামলার হুমকী দেওয়া আইএস সদস্য তিন বাংলাদেশি তরুণ, যাদের সবাই উচ্চ শিক্ষিত

আইএসের জন্ম কেন

বেশ কিছু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সামনে রেখে আইএস সৃষ্টি করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। এই সংগঠনের জন্মদাতাদের অন্যতম হচ্ছে ইহুদী রাষ্ট্র ইসরায়েল। আর তাকে সহায়তা দিয়েছে বিশ্বমোড়ল যুক্তরাষ্ট্র। পাশে আছে যুক্তরাষ্ট্রের লেজুড় যুক্তরাজ্য। এদের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ থাকলেও একই সংগঠন সব ধরনের স্বার্থ পূরণে সক্ষম বলে মনে করা হচ্ছে।

ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মুসলমানদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে তাদেরকে ঘৃণার পাত্রে পরিণত করা। তাদেরকে নৃশংস সন্ত্রাসী, বর্বর হিসেবে তুলে ধরা, যাতে তারা কোনো ইস্যুতেই অন্যদের কোনো সহানুভূতি না পায়। এই সুযোগে বর্বর ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে তার রাষ্ট্রের সীমা আরও বাড়িয়ে নিতে পারে।

ইতোমধ্যে ইসরাইল তাদের লক্ষ্য অর্জনে কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। আইএস যেভাবে মানুষ জবাই করার ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে, কিশোরী-তরুণীদের উপর যৌন নির্যাতন চালিয়ে উল্লাস করার ছবি প্রকাশ করছে, প্রকাশ্যে যৌনদাসী বিক্রি করছে, বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে তাতে মুসলমানদের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও নষ্ট হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকায় অনেক সাধারণ মানুষ এখন মুসলমানদের ঘৃণা করতে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি করে ওই অঞ্চলে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা। আর এর মাধ্যমে তেলের দর পতন ঘটিয়ে তার প্রধান দুই শত্রু রাশিয়া ও ইরানের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে দেওয়া। দুটি দেশেরই অর্থনীতি অনেকটা তেল নির্ভর। জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার থেকে ৫০ ডলারের নিচে নেমে আসায় ইতোমধ্যে দেশ দুটি যথেষ্ট চাপে পড়েছে।

কেন ইংরেজি-জানা তরুণরা আইএসের টার্গেট

বেশ কিছু কারণে আইএস বিশ্বব্যাপী শিক্ষিত, ইংরেজি-জানা তরুণ-তরুণীকে টার্গেট করছে। আর এর পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ।

শিক্ষিত তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজঃ আইএস তার সমর্থক ও সদস্য সংগ্রহের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেটকে কাজে লাগাচ্ছে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরাই ইন্টারনেট বেশি ব্যবহার করে থাকে। এরা ইংরেজি ভাষা ভালো জানে বলে নেট থেকে আইএসের বিভিন্ন লিটারেচার, গাইডলাইন ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে পড়তে পারে।

শিক্ষিত তরুণরা প্রভাবশালীঃ আইএস আর্থিকভাবে ভালো অবস্থানে থাকা পরিবারের সদস্যদেরকে যথেষ্ট প্রাধান্য দিয়ে থাকে। কারণ সমাজে এই পরিবারগুলো প্রভাব রাখে বলে প্রথম পর্যায়ে এসব তরুণ-তরুণীদেরকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন তেমন ঘাটায় না। ফলে কোনো বাধাবিপত্তি ছাড়াই তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। অন্যদিকে অন্য তরুণ-তরুণীদের উপর ধনী পরিবারের তরুণ-তরুণীদের যথেষ্ট প্রভাব থাকে। তাই তাদেরকে (ধনী পরিবারের সন্তান) সদস্য করা গেলে তাদের প্রভাবে অন্য আরও অনেকে আইএসের সদস্যে পরিণত হয়।

তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষতাঃ ধনী পরিবারের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা তথ্য প্রযুক্তিতে তুলনামূলক দক্ষ হয়। আইএসের মতাদর্শ প্রচার, নতুন নতুন মানুষের মগজধোলাই, সিনেমাটিকভাবে আইএসের নৃশংসতার প্রচার, গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের একাউন্ট পরিচালনা, অনলাইনধর্মী প্রকাশনা চালানো ইত্যাদির জন্য তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল দরকার আইএসের।

প্রচার পাওয়ার সুবিধাঃ আইএস তার লক্ষ্য অর্জনে প্রচারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ধনী পরিবারের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা সংগঠনে যোগ দিলে প্রচার পেতে সুবিধা হয়। পুঁজিবাদি সমাজ কাঠামোয় সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, গণমাধ্যমসহ সব কিছুতেই ধনীরা বাড়তি মনোযোগ পেয়ে থাকে। তাই এসব পরিবারের কোনো সদস্য আইএসে যোগ দিলে তার খবর অনেক গুরুত্বের সঙ্গে গণমাধ্যমে উঠে আসে। আবার এর মাধ্যমে এক ধরনের ক্রেজ তৈরি হয়, যা অন্য তরুণ-তরুণীদেরকে আইএসের প্রতি মনোযোগী করে।

ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতাঃ বেশিরভাগ ধনী পরিবারে ধর্মের তেমন চর্চা নেই। এসব পরিবারের সন্তানরা যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে সেখানেও ধর্ম সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা দেওয়া হয় না। ফলে এরা ধর্ম সম্পর্কে বেশ অজ্ঞ থাকে। ফলে এসব তরুণদের সহজেই ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত করা যায়।

রিক্রুটিংয়ের কৌশল

আইএস তার সদস্য বানানোর জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে থাকে। আর এই কৌশলের প্রধান অবলম্বন ইমোশনাল-ব্ল্যাকমেইল তথা আবেগকে কাজে লাগানো। ধারণা করা হয় ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের তত্ত্বাবধানে ইহুদি মনস্তাত্ত্বিক, সমাজগবেষকসহ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে আইএসের রিক্রুটিং মডিউল তৈরি করা হয়েছে। এর পেছনে তাদের দীর্ঘ গবেষণাও থাকতে পারে।

হতাশ, জীবনবিমুখ তরুণরা প্রধান লক্ষ্যঃ নানা কারণে হতাশ, ক্ষুব্ধ, জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা তরুণ-তরুণীরা আইএসের প্রধান টার্গেট। এসব তরুণ-তরুণীর মন অনেক ভঙ্গুর থাকে বলে সহজেই সেখানে ঢুকে যাওয়া যায়। আইএসের সদস্য সংগ্রহের কাজ করে যারা, তারা এমন তরুণ-তরুণীদের চিহ্নিত করে নানা কৌশলে তাদের সংস্পর্শে যায়। প্রথমে এসব তরুণ-তরুণীদেরকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিয়ে বিশ্বাসযোগ্য বন্ধুতে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করে। কখনো আবার তাদের ক্ষতস্থানে কৌশলে আঘাত করে তাদেরকে বিদ্রোহে উস্কে দেওয়া হয়। তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের লাইনে নিয়ে আসা হয়।

গুলশান হামলাকারীদের অন্যতম নিবরাস ইসলাম হৃদয়ঘটিত টানাপোড়েনে ছিল এমনটি তার টুইটার একাউন্টের টুইটেই স্পষ্ট। মালয়েশিয়ায় পড়াকালীন সময়ে একটি মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙ্গে যায় বলে নানা সূত্রে প্রকাশ।

সিরিয়ায় থেকে বাংলাদেশে নতুন হামলার হুমকিদাতা তিন তরুণের একজন পারিবারিক জীবনে ছিল চরম অসুখী। অন্য একজনের স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, তার সাবেক স্ত্রী একজন বিতর্কিত মডেল, যিনি খোলামেলা ছবি প্রকাশ করে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছেন।

গত সপ্তাহে ফ্রান্সের নিস শহরে হামলাকারী ট্রাকচালক বুলেলের সঙ্গে তার স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি হয় হামলার কিছুদিন আগে।

ফিলিস্তিন, কাশ্মির ইস্যু

বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের কাছে একটি বড় সংবেদনশীল জায়গা ফিলিস্তিন। দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনে বর্বর গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরাইল। নারী, শিশু, বৃদ্ধ-কেউ তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বিশ্ববিবেককে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে নতুন নতুন জায়গায় ইহুদি বসতি স্থাপন করা হচ্ছে। অথচ এর কোনো প্রতিকার নেই, ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কেউ নেই। এটি অনেক মুসলিম তরুণের মনে ক্ষতের সৃষ্টি করে।

আইএসের সদস্য সংগ্রহকারীরা টার্গেট করা তরুণ-তরুণীর কাছাকাছির আসার পর তাদের সঙ্গে ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে আলোচনা শুরু করে। এর বাইরে কাশ্মির, মায়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের দুর্দশা তুলে ধরা হয় তাদের কাছে। এভাবে তাদের আবেগকে জাগিয়ে তোলা হয়। এক পর্যায়ে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হয়, এসব অথ্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। যখন তারা অনেকটা সম্মত হয়ে উপায় জানতে চায়, তখন তাদের কাছে প্ল্যাটফরম হিসেবে আইএসকে তুলে ধরা হয়।

এই বিভাগের আরো সংবাদ