'পর্যটন বোর্ডে বেসরকারি খাত থেকে নিয়োগ দেওয়া উচিত'
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page

‘পর্যটন বোর্ডে বেসরকারি খাত থেকে নিয়োগ দেওয়া উচিত’

প্রফেসর ড. আকবর উদ্দিন আহমাদ; দেশের পর্যটন শিল্পে পরিচিত এক উদ্যোক্তার নাম। দেশ-বিদেশ থেকে শিক্ষায় বিভিন্ন উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এই উদ্যোক্তা। রয়েল রিসোর্ট অ্যান্ড হলিডেজ লিমিটেড, পলিসি রিচার্স সেন্টার বিডি, এডিটোরিয়াল বোর্ড অ্যান্ড এডিটর ইন চীপ ফাইন্যান্স ওয়ার্ল্ড লিমিটেডসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।toab

প্রফেসর ড. আকবর উদ্দিন আহমাদ বেসরকারি পর্যটন শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংগঠন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) এর সভাপতি এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের গভর্নিং বডির সদস্য।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সমস্যা, সম্ভাবনা এবং করণীয়সহ এ শিল্পের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি অর্থসূচকের সঙ্গে কথা বলেছেন পর্যটন শিল্পের এই উদ্যোক্তা। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক মেহেদী হাসান

অর্থসূচক: বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প সম্পর্কে জানতে চাই।

প্রফেসর ড. আকবর  উদ্দিন আহমাদ:  বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প একটি সম্ভাবনাময় খাত। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তার কোনোটারই  অভাব নেই আমাদের দেশে। কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটারের সুদীর্ঘ অথচ অবিভক্ত প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত; কুয়াকাটায় দাঁড়িয়ে সাগর থেকে সূর্য উদয় হয়ে সাগরেই অস্ত যাওয়ার বিরল দৃশ্য; বিশ্বের সবচাইতে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বিশিষ্ট সুন্দরবন, সিলেটের চা বাগান আচ্ছাদিত সবুজ পাহাড়ের সমারোহ, রাঙ্গামাটি, বান্দরবন ও খাগড়াছড়ির সুউচ্চ পাহাড়ে শ্বেত-শুভ্র মেঘের মোলায়েম পরশ গ্রহণের সুযোগ; জাফলং এর অবিরাম ঝরণা ধারা আর সেন্ট মার্টিনের অপরূপ দৃশ্য। সেইসঙ্গে সহস্রাব্দ প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য, কৃষ্টি সভ্যতার নিদর্শন উপভোগ করার সুযোগ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে।

অর্থসূচক: এতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সম্ভাবনার পরেও এই শিল্প কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না কেন?

প্রফেসর ড. আকবর  উদ্দিন আহমাদ:  পর্যটন শিল্পকে এগিযে নিতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে চলতি বছরকে পর্যটন বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে শুধু বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করলেই হবে না, আর্থিক সহায়তা করতে হবে। এই খাতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। পর্যটন বর্ষ ঘোষণার পরিকল্পনাটি আরও দুই বছর আগে করা উচিত ছিল। এছাড়া পর্যটন শিল্প সম্পর্কে ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব রয়েছে। বিমানবন্দর, রেলস্টেশন এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোকে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে যুক্ত করতে হবে। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং ব্র্যান্ডিংয়ের অভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না সম্ভাবনাময় এই শিল্প।toab1

অর্থসূচক: পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে পর্যটন বোর্ড কী ভূমিকা রাখছে বলে আপনার মনে হয়?

প্রফেসর ড. আকবর  উদ্দিন আহমাদ: পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগে খুব কম কাজ হচ্ছে। পর্যটন বোর্ডের লোকজনকে দেখা যায় শুধু বিদেশ ভ্রমণ করতে। এরা সবসময় ঘোরাফেরার কাজেই ব্যস্ত থাকে। দুই চার বছর কাজ করার পর যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা বদলি হযে অন্য মন্ত্রণালয়ে নিয়ে যায়। ফলে পর্যটন শিল্পের কোনো লাভ হয় না। তাই পর্যটন বোর্ডের কর্মকর্তাদের প্রাইভেট সেক্টর থেকে নিয়োগ দেওয়া উচিত

অর্থসূচক: সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থান এবং ঐতিহাসিক নিদর্শণ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে সবচাইতে কম পর্যটক আসে। এর কারণ কি?

প্রফেসর ড. আকবর  উদ্দিন: আমরা এই সেক্টরকে ব্র্যান্ডিং করতে পারিনি। আন্তর্জাতিক মেলাগুলোতে আমাদের ঠিকভাবে রিপ্রেজেন্ট করা উচিত। বিদেশি মিশন কার্যকরী করতে হবে। পর্যটন এমন একটি খাত যার মাধ্যমে দেশে ডলার আসছে, তবে ডলার বাইরে যাচ্ছে না। সবই দেশে থেকে যায়। অথচ তৈরি পোশাক শিল্পে ১০০ ডলার আসলে তার বিপরীতে ৬০ থেকে ৭০ ডলার দেশের বাইরে চলে যায়। তাই পর্যটন খাতের দিকে সরকারের নজর দিতে হবে। কক্সবাজার এবং সুন্দরবনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। এসব অঞ্চলের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করতে হবে। অন্যান্য দেশে পর্যটন এলাকায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। আমাদের দেশে তা নেই। এদেশে কোনো পর্যটক এলে তাকে প্রথমেই ঢাকা নামতে হয়। ফলে বিদেশিদের বাড়তি খরচ হয়। তাই অতিদ্রুত কক্সবাজারে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হওয়া প্রয়োজন। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও হয়নি।এখানে বিমানবন্দর হলে বিদেশি পর্যটক বাড়বে। এছাড়া ঢাকা টু চট্টগ্রাম টু কক্সবাজার হাইস্প্রিড ট্রেন বসাতে হবে। বান্দরবন, মধুপুর, ধনবাড়ী, জামালপুর, শেরপুর অঞ্চলে অনেক আকর্ষণীয় নিদর্শণ, পাহাড়ী এলাকা, উপজাতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রয়েছে। এ অঞ্চলের উন্নয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ দরকার। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই এক্ষেত্রে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন দিতে হবে।

অর্থসূচক: পর্যটন শিল্পের এমন অবস্থার পরেও আপনাদের মুখে শোনা যায়, এই শিল্প দিয়ে দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে দিবেন। এটা কীভাবে সম্ভব?

প্রফেসর ড. আকবর  উদ্দিন আহমাদ: রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প।এর পরেই পর্যটন শিল্প। অবশ্যই, এ খাত দিয়ে অর্থনীতির চেহারা বদলে দেওয়া সম্ভব। তবে এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সহায়তা। শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির ব্যাপারে গত ৩ বছর যাবৎ আমি অনেক চেষ্টা করেছি। রাজস্ব বোর্ডকে অনেকভাবে বলেছি। কিন্তু, তারা মানতে রাজি না। অন্যান্য দেশে এই খাতে সরকার সব ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। সরকারের সাহায্য ছাড়া কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়।

অর্থসূচক: বিশ্বে আমাদের পর্যটন শিল্পকে আলাদাভাবে তুলে ধরতে চাইলে কোন বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব দিতে হবে?

প্রফেসর ড. আকবর উদ্দিন আহমাদ: ব্র্যান্ডিংয়ের কোনো বিকল্প নেই।বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলোতে পর্যটন শিল্প নিয়ে মেলার আয়োজন করতে হবে। বাজেটে এই খাতের  জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বাজেটে পর্যটন মন্ত্রণালয় ১২৭ কোটি টাকা পেয়েছে। এই সামান্য টাকা দিয়ে একটা মন্ত্রণালয় চলতে পারে না। এজন্য ৪ থেকে ৫ গুণ বরাদ্দ বাড়াতে হবে।toab2

অর্থসূচক: পর্যটন শিল্পের বিকাশে রিসোর্টগুলোর ভূমিকা কী?

প্রফেসর ড. আকবর  উদ্দিন আহমাদ: বাংলাদেশে বর্তমানে বেসরকারি উদ্যোগে বেশকিছু রিসোর্ট এবং বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। নিঃসন্দেহে পর্যটন শিল্পের বিকাশে এগুলোর উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক। এভাবেই ধীরে ধীরে হয়তো সারাদেশেই একদিন গড়ে উঠবে এদেশের পর্যটন নেটওয়ার্ক। যতো বেশি রিসোর্ট আর পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠবে, ততোই এদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে।

অর্থসূচক: আপনাদের অপরেটরদের সার্ভিস নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন উঠে। এ বিষয়ে কি বলবেন?

প্রফেসর ড. আকবর উদ্দিন আহমাদ: অনেক অপরেটর আছে যারা আমাদের তালিকাভুক্ত নয়। ট্যুর অপরেটর হিসেবে কাজ করছে কিন্তু আমাদের সদস্য না। আমাদের সদস্য হলে আমরা ধরতে পারি। কিন্তু, যারা আমাদের সদস্য নয়, তাদেরকে আমরা কিছু বলতে পারি না। পর্যটকদের সার্ভিস সম্পর্কে আমরা আমাদের সদস্যদের নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। তবে যারা এখনও টোয়াবের সদস্য হয়নি তাদেরকে সদস্য হওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।

অর্থসূচক: দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা পর্যটনবান্ধব বলে আপনি মনে করেন?

প্রফেসর ড. আকবর উদ্দিন আহমাদ:  আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে পর্যটন শিল্পকে। বিদেশি পর্যটকরা এই বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। যদিও বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে দেশি পর্যটকরাও ভ্রমণে অনুৎসাহিত হন। এজন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কোনো বিকল্প নেই।

অর্থসূচক: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

প্রফেসর ড. আকবর উদ্দিন আহমাদ: আপনাকে এবং অর্থসূচক পরিবারকে অনেক ধন্যবাদ।

অর্থসূচক/মেহেদী/শাহীন

এই বিভাগের আরো সংবাদ