'স্মরণে সাভার ট্র্যাজেডি, ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে চাই কড়া আইন'
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » জাতীয়

‘স্মরণে সাভার ট্র্যাজেডি, ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে চাই কড়া আইন’

দেশের শিল্প-কারখানাগুলোতে সংঘটিত দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও জোরদার ও সমন্বিত আইনগত উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী কাঠামো প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

আজ শনিবার রাজধানীর গুলশানে স্পেকট্রা কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘স্মরণে সাভার ট্র্যাজেডি: সঠিক ক্ষতিপূরণ এবং উপযুক্ত জীবিকায় পুনর্বাসনের অধিকার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।

rana plaza trajedy

রানা প্লাজা ধসের পর তোলা ছবি 

ব্র্যাক আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া ষ্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট, এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান সংসদ সদস্য ডা. মো. এনামুর রহমান, ব্র্যাকের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন (ডিএমসিসি) কর্মসূচির পরিচালক ড. গওহার নঈম ওয়ারা প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে ‘ফিরে পাওয়া জীবন: সঠিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ও যথোপযুক্ত জীবিকায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অধিকার’ শীর্ষক একটি প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। রানা প্লাজা ধসের পর গত তিন বছরে অর্জিত শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা প্রকাশনাটির মূল বিষয়।

অনুষ্ঠানে একটি আলোচনা সভাও হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন রানা প্লাজা ক্লেইমস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এক্সিকিউটিভ কমিশনার মোজতাবা কাযাযী, বিশ্ব শ্রম সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের তৈরি পোশাক সংক্রান্ত প্রোগ্রাম ম্যানেজার টুমো পৌটি আইনেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর সহকারী নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দীন এবং কারিতাস ঢাকা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক রঞ্জন ফ্রান্সিস রোজারিও।

রান্না প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিতে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের জন্য ব্র্যাককে ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া ষ্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট বলেন, সংস্থাটি দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে জনবল পাঠানো থেকে শুরু করে চিকিৎসক দলকে সাহায্য করা, পানি সরবরাহ, তল্লাসি কাজে সহায়তা এবং বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের চিকিৎসা, মনোসামাজিক পরামর্শ ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।

তিনি জানান, তার সরকার বাংলাদেশের কারখানার অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাকে ১৫ লাখ ডলার (১.৫ মিলিয়ন) প্রদান করেছে। এছাড়া শ্রমিকদের অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিতে সলিডারিটি সেন্টারকে আরও ১০ লাখ (এক মিলিয়ন) ডলার প্রদান করেছে।

মোজতাবা কাযাযী জানান, রানা প্লাজা ক্লেইমস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত কাজ শেষ হয়েছে। তারা সর্বমোট ২৮৯৫টি এ সংক্রান্ত দাবি পেয়েছেন। এগুলো মৃত, আহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার বা ব্যক্তি নিজে করেছেন। এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিপূরণের হিসাবটি করা হয়েছে ১২১ নং আইএলও কনভেনশনের ভিত্তিতে। রানা প্লাজা ক্লেইমস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও ক্রেতা প্রাইমার্ক মিলিয়ে ৩৪০ লাখ (৩৪ মিলিয়ন) ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণ হিসাবের ক্ষেত্রে আয়ের ক্ষতি ও চিকিৎসা খরচ হিসাব করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি; যা নেওয়া উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

টুমো পৌটি আইনেন বলেন, কারখানায় দুর্ঘটনা হ্রাসে আইনের কঠোর বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। কারখানার নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে যেসব পদক্ষেপের কথা আইনে বলা আছে তার কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এমন একটি কাঠামো/প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে যেখানে শ্রমিকরা নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা তুলে ধরতে পারেন।

ড. গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, মানুষের জীবন প্রকল্প না। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ব্র্যাক এক্ষেত্রে কাজ করার চেষ্টা করছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি মনোসামাজিক পরামর্শের ক্ষেত্রটিকে আরো সামর্থ্যবান ও ভুক্তভোগির প্রয়োজন অনুযায়ী বিন্যস্ত করার ওপর জোর দেন। ব্যাংকে গচ্ছিত ক্ষতিপূরণের অর্থের ওপর লভ্যাংশ প্রতি বছর কমে যাওয়ার ফলে শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের আয়মূলক উদ্যোগ সহায়তায় ব্যাংকগুলো এগিয়ে আসতে বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।

বক্তারা বলেন, শ্রমিকদের প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণ নিয়ে যাতে তাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয় সেজন্য সরকারের এমন একটি ব্যবস্থা থাকা উচিত যেখানে গেলে তারা ক্ষতিপূরণের হিসাবটি স্পষ্টভাবে বুঝে নিতে পারবেন। এছাড়া আহত ও পঙ্গু শ্রমিকদের সমাজ যাতে সম্মানের সাথে গ্রহণ করে সেজন্য ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।

তারা আরও বলেন, শিল্প দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ হিসাব করার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা, বয়স, পরিবারে নির্ভরশীলের সংখ্যা, সুস্থ থাকলে দীর্ঘমেয়াদে পেশাগত বিকাশ ও আয়বৃদ্ধির সামর্থ্য ইত্যাদি সম্ভাব্য সবগুলো বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া কারখানায় নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের মতামত প্রদানের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসে ১১৩৬ জনের মৃত্যু হয়। এতে ২৪৩৮ জন আহত অবস্থায় উদ্ধার হন।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী শিল্প দুর্ঘটনায় মৃত্যুজনিত কারণে সর্ব্বোচ্চ ক্ষতিপূরণের বিধান ১ লাখ টাকা এবং স্থায়ী বা সম্পূর্ণ অক্ষমতার কারণে ক্ষতিপূরণের বিধান ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৬-তে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণের বিধান ২ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। এ খসড়া আইনে স্থায়ী ও সম্পূর্ণ অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ ২ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিধান রাখা হয়েছে।

অর্থসূচক/ডিএইচ

এই বিভাগের আরো সংবাদ