এইচএস কোড প্রতারণায় জড়িত শীর্ষ আমদানিকারকরা
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » App Home Page
প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল আমদানি

এইচএস কোড প্রতারণায় জড়িত শীর্ষ আমদানিকারকরা

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পণ্যের পরিচিতি তালিকা (এইচএস কোড) পরিবর্তন করে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল আমদানি করছে দেশের প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি কোম্পানি। ফলে প্রতি বছর শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন এসব কাঁচামাল উৎপাদনকারী দেশীয় ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাভানা গ্রুপ, রয়েল গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল, ওয়ালটন, বেঙ্গল প্লাস্টিক, পার্টেক্স প্লাস্টিক এবং শাহ আমানত গ্রুপসহ শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মতো নামী কোম্পানিগুলো এই এইচএস কোড প্রতারণার সঙ্গে জড়িত।

দেখা গেছে, অধিকাংশ আমদানিকারকরা প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল ক্যালসিয়াম কার্বনেট সমৃদ্ধ ১০ শতাংশ শুল্কের সিসি ফিলার, মাস্টার ব্যাচ প্রভৃতি আমদানি করছেন ৫ শতাংশ শুল্কহারের পিপি কম্পাউন্ড বা পিই ফিলার কম্পাউন্ডের পরিচয়ে।

অধিকাংশ আমদানিকারকরা প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল ক্যালসিয়াম কার্বনেট সমৃদ্ধ ১০ শতাংশ শুল্কের সিসি ফিলার, মাস্টার ব্যাচ প্রভৃতি আমদানি করছেন ৫ শতাংশ শুল্কহারের পিপি কম্পাউন বা পিই ফিলার কম্পাউন্ডের পরিচয়ে।

উল্লেখ, প্লাস্টিকের ব্যাগ তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে সিসি ফিলার, মাস্টার ব্যাচ, পিপি ফিলার, পিই ফিলার কমপাউন্ড, পিভিসি ফিলার প্রভৃতি ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে পিপি ফিলার, পিই ফিলার কমপাউন্ডের (ক্যালসিয়াম কার্বনেট-এর উপস্থিতি নেই এমন কাঁচামাল) আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ। অপরদিকে ক্যালসিয়াম কার্বনেটযুক্ত সিসি ফিলার, মাস্টার ব্যাচ, কালার মাস্টার ব্যাচ প্রভৃতি আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়।

তবে দেশীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পিপি ফিলার, পিই ফিলার কমপাউন্ড প্রভৃতি আমদানি করে এতে ক্যালসিয়াম কার্বনেট মিশিয়ে সিসি ফিলার, মাস্টার ব্যাচ প্রভৃতি উৎপাদন করে। মূলত দেশীয় এসব শিল্প বিকাশে ২০১২ সালের দিকে ক্যালসিয়াম কার্বনেট যুক্ত কাঁচামাল আমদানি ১০ শতাংশ শুল্কহার নির্ধারণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

কিন্তু পণ্যের আলামত যাচাই ও কাস্টমস সূত্র জানিয়েছে, অধিকাংশ আমদানিকারক ক্যালসিয়াম কার্বনেট সমৃদ্ধ ১০ শতাংশ শুল্কের সিসি ফিলার, মাস্টার ব্যাচ প্রভৃতি ৫ শতাংশ শুল্কহারের পিপি কম্পাউন বা পিই ফিলার কম্পাউন্ড ঘোষণা দিয়ে আমদানি করছেন।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার (এআইআর শাখা) মুকিতুল হাসান অর্থসূচককে বলেন, এনবিআরের নির্দেশনা মোতাবেক প্লাস্টিক তৈরির কাচাঁমাল আমদানির চালানে আমরা এখন বাড়তি তদারকি করেছি। গত তিন মাসে ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে ২৩টি চালানে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছি। জড়িত রাজস্ব আদায়সহ এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যাবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, গত তিন মাসে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল আমদানি করেছে এমন সাতটি প্রতিষ্ঠানের ২৩টি চালানে শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ পায় চট্টগ্রাম কাস্টমস এআইআর শাখার কর্মকর্তারা।

পরে নাভানা, শাহ আমানত গ্রুপ, এ.এস.এম. ইন্ডাস্টিজ, ফার্মা প্যাকেজ লিমিটেড, হামকো ইন্ড্রাস্ট্রিজ, আই.এন.এস. কর্পোরেশন, ইয়াকিন পলিমার লিমিটেডের কাছ থেকে ফাঁকিকৃত শুল্কসহ চার কোটি ৮৯ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করা হয় বলেও জানান মুকিতুল হাসান।

তিনি জানান, একই অভিযোগে এনবিআর দেশীয় একটি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপেক্ষিতে ২০১১ সালে অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিন বছরে ১৯ প্রতিষ্ঠানের ৯১টি চালানে এ ধরণের অনিয়ম পায়। এসব চালানে ১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির কথা এনবিআরের প্রতিবেদনে উঠে আসে।

তখন আকিজ পলি ফাইবার ইন্ড্রাস্ট্রিজের ১৬টি চালান, পার্টেক্স প্লাস্টিক লিমিটেড ১৫টি, ই-টেক লিমিটেডের ১৩টি, এসটেক লিমিটেডের ৮টি, গ্লোবাল ট্রেডিংএর ৩টি, খান ব্রাদার্স পিপি ব্যাগ ইন্ড্রাস্টিজ লিমিডের ৬টি, বাবু ইলেক্ট্রিক কোম্পানির ৫টি, মেসার্স তানভীর পলিমার ইন্ড্রাস্ট্রিজ লিমিটেডের ২টি, মিরাকেল ইন্ড্রাস্ট্রিজ লিমিটেডের  ৪টি, হোসাইন এন্টারপ্রাইজএর ২টি, সেফটি পলি ব্যান্ড অ্যান্ড গামট্যাপ প্রাইভেট লিমিটেডের ৩টি, রয়েল পিপি ব্যাগ লিমিটেডের ৩টি, বেঙ্গল প্লাস্টিক, প্লাস্টিক এক্সেসরিজ লিমিটেড, পলিকন লিমিটেড, শাহাদত ট্রেডিং, আল্টা প্যাক লিমিটেড ও আবদুল গফর অ্যান্ড কোং-এর একটি করে এবং ওয়ালটন হাই টাচ ইন্ড্রাস্টিজ লিমিটেডের ৫টিসহ মোট ৯১টি চালানে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি প্রমাণ পায় এনবিআর।

কাস্টমসের আমদানি নথির তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ‘সিসি (ক্যালসিয়াম কার্বনেট) ফিলার ও মাস্টার ব্যাচ’ এর ১৬ লাখ ৭০ হাজার টাকার দুটি চালান (বি/ই: ১২৯৬৪৯৯ ও ১৩১২৬৩৩) আমদানি করে প্রাণ-আরএফএল। আমদানিকৃত এসব পণ্যের শুল্কহার ১০ শতাংশ। শুল্ক ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানটি পণ্যের এইচএস কোড পরিবর্তন করে আগামপত্রে  ৫ শতাংশ শুল্কযোগ্য পণ্য ‘পিপি কমপাউন্ড’ উল্লেখ করে। এতে প্রতিষ্ঠানটি আট লাখ ৫২ হাজার ৭৫৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়।

এছাড়া একই সময়ে চট্টগ্রামের শাহ আমানত কর্পোরেশন ‘ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের একটি চালান (বি/ই-১৩০৫৭৫৮) আমদানি করে। আমদানিকারকের পক্ষে পণ্য খালাসের দায়িত্বে ছিল শাহ সালাউদ্দিন ট্রেডিং। আমদানি নথিতে পণ্যের এইচএস কোড পরিবর্তন করে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে ল্যাব পরীক্ষায় রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পায় চট্টগ্রাম কাস্টমসের এআইআর শাখার রাজস্ব কর্মকর্তারা।

একইভাবে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ডিসেম্বরের শুরুর দিকে ভারত থেকে প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরির কাঁচামাল ‘কালার মাস্টার ব্যাচ’ এর একটি চালান (বি/ই-১২৪৪৪৩০) আমদানি করে নাভানা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। আমদানি করা এসব পণ্যের নির্ধারিত শুল্কহার ১০ শতাংশ। কিন্তু শুল্ক ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানটি পণ্যের পরিচিতি তালিকার কোড পরিবর্তন করে আগামপত্রে ৫ শতাংশ শুল্কযোগ্য পণ্য ‘পিপি কমপাউন্ড’ উল্লেখ করে। শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৩ লাখ টাকা জরিমানসহ ৭ লাখ ৮৮ হাজার টাকার রাজস্ব আদায় করে কাস্টমস।

এছাড়া চলতি বছর জানুয়ারির শুরুতে ভিয়েতনাম থেকে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ‘সিসি কম্পাউন্ড’ আমদানির (বি/ই-১২৫০২৭৮) মাধ্যমে ৮০ হাজার টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয় নারায়ণগঞ্জের এ.এস.এম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এইচএস কোড পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ায় ফাঁকিকৃত রাজস্বসহ প্রতিষ্ঠানটিকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

জানুয়ারির মাঝামাঝিতে চট্টগ্রামের রয়েল পি পি ব্যাগস লিমিটেড ভিয়েতনাম থেকে প্রায় ৩১ লাখ টাকার একটি চালানে (বি/ই-৩৭৯৭৮) ‘ফিল্ড পিপি কম্পাউন্ড’ আমদানির মাধ্যমে প্রায় দেড় লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়। ফাঁকিকৃত রাজস্বসহ প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন রাজস্ব কর্মকর্তারা।

গত মাসের শেষের দিকে বাগেরহাটের হামকো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ভিয়েতনাম থেকে ‘ফিলার মাস্টার ব্যাচ’ আমদানির (বি/ই-৯০১৪১) মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেয় বলে প্রমাণিত হয়। এজন্য প্রতিষ্ঠানটি থেকে জরিমানাসহ ৯০ হাজার টাকার রাজস্ব আদায় করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।

এছাড়া গত দুই মাসে পণ্যের পরিচিতি তালিকা বা এইচএস কোড পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকির দায়ে পাবনার ফার্মা প্যাকেজ লিমিটেড (বি/ই-২৪৯৩০),  সাতক্ষীরার ইয়াকিন পলিমার লিমিটেড (বি/ই:৭০২৭৪), ঢাকার জিগাতলার গ্লোবাল ট্রেডিং কর্পোরেশনসহ (বি/ই-১৩০৬১৩৯) সাতটি প্রতিষ্ঠান থেকে রাজস্বসহ তিন লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ভুলবশত এমন হয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।

নাভানা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট খায়ের ব্রাদার্সের সত্ত্বাধীকারী এস.এম.এ. খায়ের বলেন, প্লাস্টিক তৈরির সব ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে দীর্ঘদিনই ১০ শতাংশ শুল্ক হার ছিল। আমার সেটাই জানতাম। এটি সম্ভবত ভুলবশত হয়েছে।

তবে চট্টগ্রাম কাস্টমসের একাধিক শুল্ক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্লাস্টিক কাঁচামাল আমদানিকারক এবং খালাসের দায়িত্বে থাকা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট শুল্ক ফাঁকি দিতেই এমনটি করে থাকেন। তারা দীর্ঘদিন ধরেই এসব কাঁচামাল আমদানি-রপ্তানি এবং পণ্য তৈরির সঙ্গে জড়িত। তাই তাদের অনিচ্ছাকৃত ভুল করার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি তাদের জালিয়াতি প্রমাণ হওয়ার পরও তারা তা স্বীকার করতে চান না।

এদিকে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কম শুল্কহারে সব পণ্য বাজারে প্রবেশ করায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে এসব কাঁচামাল তৈরির দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকার দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় যে উদ্যোগ নিয়েছে তার কোনো সুফল পাচ্ছে না তারা। তবে সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমস এসব চালানে বাড়তি নজরদারি বাড়ানোর ফলে নতুন করে আশার সঞ্চয় হয়েছে বলে জানান এসব প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত বছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ৩৬৮ কোটি ৭৮ লাখ ৪০ হাজার ২৮১ টাকার। এসব পণ্যে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২০ কোটি ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮ টাকা। এর মধ্যে ১০ শতাংশ শুল্কযোগ্য প্লাস্টিক কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ৭৯ কোটি ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার ৩৩৪ টাকার। যা থেকে রাজস্ব আসে ৮ কোটি ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৫৮৬ টাকার। চট্টগ্রাম কাস্টমসের এআইআর শাখার কর্মকর্তাদের তদারকি বাড়ানোর ফলে ১০ শতাংশের শুল্কহারযোগ্য আগামপত্র দাখিল গত দুই মাসে বেড়েছে। গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ৩৩ কোটি ২৫ লাখ ৭ হাজার শুল্কায়নযোগ্য পণ্যের বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে তিন কোটি ৪৫ লাখ ৪৯ হাজার  টাকা।

অর্থসূচক/টি/শাহীন

এই বিভাগের আরো সংবাদ