চাকরির বিনিময়ে ঘুষ চাইতে গিয়ে ধরা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » ব্যাংক-বিমা

চাকরির বিনিময়ে ঘুষ চাইতে গিয়ে ধরা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে চাকরি দেওয়ার নামে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। অভিযোগ ওঠেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও এই প্রতারক চক্রের সাথে জড়িত। মঙ্গলবার এমন এক ‘প্রতারককে কৃষি ব্যাংকের এক চাকরি প্রার্থীর কাছ থেকে ঘুষের পরিমাণ নিয়ে বাক-বিতণ্ডার সময় হাতেনাতে ধরেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই আরেক কর্মকর্তা। খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ৩০ তলা সংলগ্নী ভবনের চত্বরে এ ঘটনা ঘটেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একই কায়দায় কৃষি ব্যাংকের একাধিক চাকরি প্রত্যাশীকে টাকার বিনিময়ে চাকরির প্রস্তাব দিয়েছেন আবদুল্লাহ আল মামুন নামের ওই কর্মকর্তা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ব্যাংক সুত্রে জানা যায়, মো. ইব্রাহীম নামের এক ব্যক্তি সম্প্রতি কৃষি ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার পদে নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। গত ১০ এপ্রিল ০১৬২৯৮৯৭৪৫৪ নাম্বার থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন তাকে ফোন করেন।ইব্রাহীমের বিশ্বাস অর্জন করতে তার ট্র্যাকিং আইডি, পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হওয়ার কথা, রোল নাম্বার সবই জানানো হয়। ইব্রাহীমও মনে করেন, তিনি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির কেউ একজন হবেন। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী মামুন তাকে দেখা করতে বলেন। ইঙ্গিত দিয়ে রাখেন কৃষি ব্যাংকের চাকরিটা পেতে সহায়তা করবেন তিনি।

bb employee

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা এসে মামুনকে নিয়ে যায়। (গোল চিহ্নিত)

ইব্রাহীম নিজেই বলেন, ১০ তারিখ আমি তার সঙ্গে দেখা করি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০ তলা ভবনের রিসিপশনে বসে কথা হয়। প্রথমে ৫ লাখ টাকার কথা বললেও দর কষাকষিতে মামুন আমাকে ২ লাখ টাকায় চাকরি নিয়ে দেবেন ঠিক হয়। এসময় বলা হয়, টাকার একটি চেক আগে প্রদান করতে হবে; চাকরি হলে একাউন্টে টাকা জমা দিয়ে দিতে হবে।

এরপর ইব্রাহীম বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত তার এক আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ঘটনা শুনে তিনি ইব্রাহীমকে নিয়ে হাতে-নাতে মামুনকে পাকড়াও করেন।

এসময় মামুনকে টাকা দাবির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি দাবি করেন ‘পিরোজপুর জেলা ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত শামীম নামের এক ব্যক্তিই ইব্রাহীমের সাথে যোগাযোগ করেছেন। যে নাম্বার থেকে ফোন করা হয়েছে সেটাও তার নয়।

তবে ওই সময়ে উপস্থিত ইব্রাহীম জানান, সরাসরি সাক্ষাতে মামুনই তার সাথে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন্য টাকা দিতে বলেছেন।

পরে মামুনের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের পাম্প অপারেটর হিসেবে কাজ করি। এসময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা এসে মামুনকে নিয়ে যায়। জানা যায়, পাম্প অপারেটর হিসেবে কাজ করা মামুন একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা।

ইব্রাহীম অভিযোগ করেন, শুধু তাকেই নয়, কৃষি ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া তার অলি নামের এক বন্ধুকেও একইভাবে ফোন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগে গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে প্রধান করে একটি নির্বাচক কমিটি গঠন করে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদাধিকারবলে ‘ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি’নামক এই কমিটির প্রধান। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কমিটিতে সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। এ কমিটির সচিবালয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০ তলা সংলগ্নী ভবনে অবস্থিত।

সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, বিডিবিএল, কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন, ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ, কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে জনবল নিয়োগে কাজ করছে এই কমিটি। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে দুর্নীতি ঠেকাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাই এ ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। ব্যাংক সুত্র জানায়, চাকরি পাওয়ার আশায় বিভিন্ন সময়ে মৌখিক পরীক্ষায় অংশে নেওয়ার পর হাতে টোকেন দিয়ে দেওয়া, ফোন করে টাকার দফারফা করার মতো ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি বিভাগের এক পিয়নকে এ ধরনের সন্দেহজনক আচরণের অভিযোগে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কিছু কর্মকর্তাও এসব অনিয়মে ক্ষুব্ধ। তারা জানান, এভাবে কারও চাকরি দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ পরীক্ষার্থীদের ডিটেইল সিলেকশন কমিটি ছাড়া কোনও বিভাগেই থাকে না। একটি গ্রুপ চেষ্টা করছে সিলেকশন কমিটিকে সমালোচিত করার জন্য। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর হাত থেকে জনবল নিয়োগের ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর নিয়োগ বাণিজ্য হাতছাড়া হওয়াতে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেছনে লেগেছে।

এদিকে মামুনের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমারা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করবো। অপরাধের প্রমাণ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এসবি/শাহীন

এই বিভাগের আরো সংবাদ