বৈশাখের হাওয়া চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায়
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » লিড নিউজ

বৈশাখের হাওয়া চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায়

একদিকে টাইগার পাস, অন্যদিকে কদমতলি। এই দুই জায়গার রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য যানবাহন। সেই এক ভয়াবহ যানজট। আশেপাশের ফুটপাত দিয়ে পায়ে হেঁটে চলছে মানুষ। গন্তব্য একটাই রেলওয়ের পলোগ্রাউন্ডের মাঠ। সেখানেই চলছে ২৪তম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। মানুষের ভিড়ে সেখানে এখন ঢোকায় যেন দায়।

আসন্ন বৈশাখকে কেন্দ্র করে লোক চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় দর্শক সমাগম বেশি। ছবি সংগৃহীত

আসন্ন বৈশাখকে কেন্দ্র করে লোক চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় দর্শক সমাগম বেশি। ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বাণিজ্য মেলার আজ বিকেলের চিত্র এটি। ছুটির দিন থাকায় এখানে নেমেছে মানুষের ঢল। টিকেট কাউন্টারের সামনে মানুষের ভিড় দেখলেই বোঝা যায় মেলায় চলছে কেনাকাটার ধুম।

চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই) আয়োজিত মেলায় দেশি-বিদেশি সব মিলিয়ে স্টল ও প্যাভিলিয়নের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ শতাধিক।

গত ২ দিন সরকারি ছুটি থাকায় এবং আসন্ন বৈশাখকে কেন্দ্র করে লোক সমাগম বেশি বলে জানিয়েছেন মেলায় আগত বিভিন্ন স্টলের কর্মকর্তারা। তবে মূলত সামনে বৈশাখ আসার কারণে মেলা বেশ জমজমাট বলে জানান তারা।

ছুটির ২ দিনে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, স্টলগুলোর বেশির ভাগই গৃহস্থালি সামগ্রী, প্রসাধনী ও তৈরি পোশাক দিয়ে সাজানো। এবারের মেলায় দর্শনার্থী ক্রেতাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি রয়েছে গৃহস্থালি ও প্রসাধনী পণ্যের দোকানগুলোতে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তৈরি পোশাক, আসবাব ও খেলনা সামগ্রীর দোকানগুলোতেও ব্যস্ত সময় কাটছে বিক্রেতাদের। একই সঙ্গে প্লাস্টিক সামগ্রী, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, জুয়েলারি, সিরামিকস প্রভৃতির স্টলেও দেখা গেছে জমজমাট ভাব।

মেলার ভেতরে দর্শকের সমারোহ। ছবি সংগৃহীত

মেলার ভেতরে দর্শকের সমারোহ। ছবি সংগৃহীত

সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত মেলা ঘুরে দেখা গেছে, সাপ্তাহিক ছুটির কারণে সকাল থেকেই ক্রেতা-দর্শনার্থীদের পদাচারণা চোখে পড়ার মতো। প্রত্যেক স্টল-প্যাভিলিয়নে ক্রেতাদের সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিক্রেতাদের। ক্রেতাদের মাঝেও ছিল পণ্য কেনার ধুম।

দর্শনার্থীরা স্টলগুলো ঘুরছেন আর বিভিন্ন পণ্য সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করছেন। অনেকেই আবার নানা অফার পেয়ে পছন্দের পণ্যটি কিনে বাড়ি ফিরছেন। তবে মেলার বেশিরভাগ স্টল বা প্যাভিলিয়নে পণ্যের উপর বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা চোখে পড়ার মতো।

মেলা ঘুরে দেখা যায়, মানুষের হাতে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে গৃহস্থালির বিভিন্ন পণ্যের ব্যাগ। এর মধ্যে প্লাস্টিকের পণ্য বেশি দেখা গেছে। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ফার্নিচার সামগ্রী, জুতা, পারফিউম, রাইস কুকার, ইস্ত্রি, ইন্ডাকশন চুলা, সবজি কাটার মেশিন, কসমেটিকস,  জুস মেকার, জুস ব্লেন্ডার, ওভেন সহ নানা গৃহস্থলি পণ্য।

তবে বর্তমানে বৈশাখ কেন্দ্র করে তরুণ- তরুণীদের আগমন একটু বেশিই বলা যায়। যার ফলে বৈশাখী পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শাড়ি, ছোটদের বিভিন্ন পোশাকের বিক্রি একটু বেশিই চোখে পড়েছে।

মেলার সবচাইতে আকর্ষণীয় স্টল এর কান্ট্রি পার্টনার থাইল্যান্ডের স্টল।

মেলার সবচাইতে আকর্ষণীয় স্টল এর কান্ট্রি পার্টনার থাইল্যান্ডের স্টল।

মেলায় দেখা গেল, হরেক রকমের জিনিসের সমাহার। বিল্ডিং আইটেম, প্লাস্টিক সামগ্রী, আর্টিফিসিয়াল ফ্লাওয়ার, কার্পেট, হার্বাল, কসমেটিকস, হাউজহোল্ড আইটেম, লেদার, লেদার গুডস, পাটজাত পণ্য, খেলনা, স্পোর্টস গুডস, স্টেশনারী, স্যানিটারী, কনজ্যুমার গুডস, প্রসাধনী, তথ্য প্রযুক্তি, ওয়াটার ফিউরিফায়ার, জুয়েলারি, সিরামিকস, দেশি-বিদেশী বস্ত্র, ফুটওয়্যার, মেলামাইন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, আসবাবপত্র, হস্তশিল্প, এ্যালুমিনিয়ামসহ অনেক নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য।

আজ বিকেলে মেলার হাতিল ফার্নিচারের শোরুম থেকে খাট ও সোফা সেট কিনেছেন ব্যবসায়ী মো. ফোরকান রাসেল। তিনি বলেন, নতুন বিয়ে করেছি। সেই জন্য ঘরের জন্য কিছু কেনাকাটা করলাম। এখানে মেলার ছাড় পেয়েছি আবার ফ্রি হোম ডেলিভারি সুবিধা পেলাম।

এদিকে, নগরীর নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে একমাত্র ভাইঝি নিয়ে মেলায় এসেছেন মাজারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ছুটির দিন বলেই ভাইঝিকে নিয়ে মেলাতে আসতে পেরেছি। তাছাড়া সামনে বাঙালীর প্রানের উৎসব বৈশাখ । তাই বিভিন্ন স্টল ঘুরে ভাইঝির জন্য নতুন বছরের থেকে বেশ কিছু খেলনা ও কাপড় চোপড় কিনেছি। তবে অন্যান্য বারের তুলনায় এবার মেলায় বিশৃঙ্খলা বেশ কম দেখতে পাচ্ছি।

মেলায় হাতিল ফানিচারের শোরুমের সামনে দর্শনার্থী। ছবি সংগৃহীত

মেলায় হাতিল ফানিচারের শোরুমের সামনে দর্শনার্থী। ছবি সংগৃহীত

মেলায় ছুটির দিনগুলোতে বেচা কেনা একটু বেশি। তবে বাকি দিনগুলোতে মোটামুটি বেচাকেনা চলছে বলে জানান অলিম্পিক বিস্কুট ইন্ডাস্ট্রিজ এর স্টল ইনচার্জ আরিফুজ্জামান মিয়ান। তিনি বলেন, বাণিজ্য মেলার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তেমন একটা সাড়া পাইনি। সাম্প্রতি ঢাকা বাণিজ্য মেলায় যে সাড়া আমরা পেয়েছিলাম সেটা এখনো আমরা পাইনি। তবে বৈশাখী মেলা আসাতে মেলার শেষদিকে এসে আমরা মোটামুটি সাড়া পাচ্ছি ।

মেলায় মেডিকেল সেন্টারসহ ব্যাংক ও বিকাশের বুথ গুলোতেও ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

এদিকে মেলার সবচাইতে আকর্ষণীয় স্টল হল মেলার কান্ট্রি পার্টনার থাইল্যান্ডের  স্টল। এই স্টলে মুলত মহিলাদের জিনিসপত্র বেশি দেখা যায়। এখানে বিশেষ করে মেয়েদের প্রসাধনী, অলঙ্কার, শোপিস, ব্যাগ প্রভৃতির বিক্রিও ভালো বলে জানিয়েছেন এই প্যাভিলিয়নের কর্মকর্তারা।

২৪ তম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা কমিটির কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ জামাল আহমেদ অর্থসূচককে বলেন, মেলা এখন পর্যন্ত যে অবস্থায় আছে তাতে আমরা খুশি। এখন পর্যন্ত কোনও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া মেলার স্টল কতৃপক্ষ কিংবা মেলায় আগত দর্শনার্থীরা কোনও অভিযোগ করলে আমরা আমাদের যথাসাধ্য তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ২৩ বছর ধরে দেশের এসএমই খাতের বিকাশ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম চেম্বার বাণিজ্য মেলার আয়োজন করে আসছে। প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিশ্ববাজারে দেশি পণ্যের প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধিই মেলা আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য।

মেলায় বসানো

মেলায় বসানো মেডিকেল সেন্টারে দর্শনার্থীরা। ছবি সংগৃহীত

উল্লেখ্য, ১২ বছরের মতো এবারও মেলার পার্টনার কান্ট্রি হিসেবে অংশগ্রহণ করছে থাইল্যান্ড। থাইল্যান্ড ছাড়াও  মেলায় বিদেশি দেশগুলোর মধ্যে ভারত, চীন ও ইরান অংশগ্রহণ করছে। এই চারটি দেশ প্রায় ২৩ হাজার বর্গফুট জায়গা নিয়ে বিভিন্ন স্টলের মাধ্যমে তারা তাদের পণ্য সাজিয়েছে।

চার লাখ বর্গফুটের অধিক জায়গা জুড়ে অনুষ্ঠিত মেলায় এবার ১২টি প্রিমিয়ার গোল্ড প্যাভিলিয়ন, ৩টি মেগা প্যাভিলিয়ন, ৮টি প্রিমিয়ার প্যাভিলিয়ন, ২০টি স্ট্যান্ডার্ড প্যাভিলিয়ন, ১৬৬ টি প্রিমিয়ার মেগা প্যাভিলিয়ন, ২২টি মেগা বুথ, ১০টি প্রিমিয়ার গোল্ড বুথ, ১৪টি স্ট্যান্ডার্ড বুথ, তিনটি রেস্টুরেন্টসহ মোট ৩৮টি প্যাভিলিয়ন বসেছে। তিনটি আলাদা জোনে বিভক্ত হয়ে মোট ৪৫০টিরও অধিক প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিচ্ছে।

এছাড়া সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসাবে রেড ক্রিসেন্ট, সন্ধানী ও বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের জন্য একটি স্টল রয়েছে। মেলায় আগত দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে একটি তথ্য কেন্দ্র রয়েছে।

মাসব্যাপী এই মেলা সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। মেলায় টিকেটের মূল্য রাখা হয়েছে ১০ টাকা।

এছাড়া মেলার সমাপনী অধিবেশনে ১ম, ২য় ও ৩য় বিবেচিত বুথ ও প্যাভিলিয়নকে  বিশেষ পদক ও মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে সনদপত্র প্রদান করা হবে। এছাড়া মেলার যাবতীয় তথ্য www.chittagongchamber.com এই ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।

অর্থসূচক/দেবব্রত রায়/ডিএইচ

এই বিভাগের আরো সংবাদ