নাজুক বাজারে বিনিয়োগকারীদের হাহাকার
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » পুঁজিবাজার
কার্যকর উদ্যোগ নেই

নাজুক বাজারে বিনিয়োগকারীদের হাহাকার

ঘুরে দাঁড়ানোর বছরে ফের নাজুক হয়ে উঠেছে দেশের পুঁজিবাজার। টানা দর পতন যেন বাজারের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনই কমছে মূল্য সূচক। এক দিন একটু বাড়লে পরের দিন তার চেয়ে দ্বিগুণ কমছে। গত দুই মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩০৮ পয়েন্ট কমেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, টানা এই দর পতনের জন্য তারল্য সংকট যতটা না দায়ি, তারচেয়ে বেশি দায়ি আস্থাহীনতা। নানা কারণে বাজারের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। এর মধ্যেই যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন উপাদান। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাকিং, অ্যামালগেমেশন নিয়ে একটি বড় শিল্পগ্রুপের কারসাজি ইত্যাদি বিষয় আস্থার ঘরে নতুন করে আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে যতই দিন যাচ্ছে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বাড়তি বিনিয়োগের সমন্বয়ের সময় শেষ হয়ে আসছে। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত এ সময়সীমা বাড়বে সীমা বাড়ানো হবে কি না তা নিয়ে সংশয় কাটছে না মোটেও। এছাড়া নতুন গভর্নরের দৃষ্টিভঙ্গী বুঝতেও সময় নিচ্ছেন অনেক বিনিয়োগকারী।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নানা কারণে বাজারের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাকিং ইত্যাদি, অ্যামালগেমেশন নিয়ে একটি বড় শিল্পগ্রুপের কারসাজি ইত্যাদি বিষয় আস্থার ঘরে নতুন করে আঘাত হেনেছে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি ডিএসই প্রধান সূচক ৪ হাজার ৬১০ পয়েন্ট ছিল। এক মাসের ব্যবধানে সূচক নেমে আছে ৪ হাজার ৫৩৭ পয়েন্টে। আর শেষ এক মাসে প্রধান সূচক কমেছে ২৩৫ পয়েন্ট। শেষ ৮ কার্য দিবসে প্রধান সূচক কমেছে ১৭৪ পয়েন্ট।

বাজারের এই অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হাহাকার পড়ে গেছে। অনেক বিনিয়োগকারী হতাশায় ভেঙ্গে পড়ছেন। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটু আগে পরে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য। তাই বিনিয়োগকারীদের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য নিয়ে পরিস্থিতি সামলানো।

বাজারের এই অবস্থা উত্তরনে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংক অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) ছাড়া অন্য কোনো সংগঠনের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

এ বিষয়ে ডিএসইর নব নির্বাচিত পরিচালক মো: রকিবুর রহমান অর্থসূচককে বলেন, আমাদের একার পক্ষে বাজারকে এ অবস্থান থেকে উঠানে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত উদ্যোগ।

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রণালয়, বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, ডিএসই, সিএসই, বিএমবিএ, লিস্টেড কোম্পানি অ্যাসোসিয়েশসহ সবার এগিয়ে আসতে হবে। সবাই মিলে বাজারকে অনেক দূর নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর আর্থিক সূচকগুলো পুঁজিবাজারের জন্য অনেক বেশি অনুকূল হয়ে উঠেছে। দেশের রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় তার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। অন্যদিকে ব্যাংকে আমানতের সুদ হার এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। চলতি বাজেটে দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু প্রণোদনা। এসব কারণে চলতি বছর থেকেই পুঁজিবাজার গতিশীলতার দিকে যাবে এমন আশা ছিল সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা বাজারের উপর আস্থা রাখতে না পারায় দেখা যাচ্ছে পুরো বিপরীত চিত্র।

তাদের মতে, এ মুহুর্তে বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ব্যাংকের বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময় সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে। ২০১৩ সালে প্রণীত ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের ফলে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমার অতিরিক্ত হয়ে পড়ে। আইনে ওই বিনিয়োগ সমন্বয়ের জন্য যে সময় বেঁধে দেওয়া হয় তা কার্যকর হলে আগামী ২৩ জুলাইয়ের মধ্যে শেয়ার বিক্রি করে বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয় করতে হবে। আইনের শর্ত পরিপালনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করলেও বাজারের মন্দাবস্থার কারণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শেয়ার বিক্রি করতে পারেনি। এমন অবস্থায় স্টেকহোল্ডারদের দাবির আর বাজার বাস্তবতার প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী বিনিয়োগ সমন্বয়সীমা ২ বছর বাড়ানোর ঘোষণা দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাতে সাড়া দেয়নি। এমন অবস্থায় সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক ব্যাংক লোকসান দিয়ে হলেও শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। অন্যদিকে বাকী প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্ট হ্যাক করে ৮০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ ডলার হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও বিনিয়োগকারীদের আস্থার উপর বড় আঘাত হয়ে দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকই যেখানে সুরক্ষিত নয়, সেখানে তাদের শেয়ার, বিনিয়োগ ইত্যাদি কতটা সুরক্ষিত তা নিয়ে সংশয়ে আছেন অনেকেই।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকই যেখানে সুরক্ষিত নয়, সেখানে তাদের শেয়ার, বিনিয়োগ ইত্যাদি কতটা সুরক্ষিত তা নিয়ে সংশয়ে আছেন অনেকেই।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর পদে পরিবর্তন এসেছে। তিনি কতটা পুঁজিবাজারবান্ধব তা পর্যবেক্ষণ করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে চান  অনেক বিনিয়োগকারী।

সামিট পাওয়ারসহ কয়েকটি কোম্পানির অ্যামালগেমেশন প্রক্রিয়াও বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। তাদের প্রস্তাবিত অ্যামালগেমেশন স্কিম বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করছেন তারা। এর আগে তিতাস গ্যাসের ক্ষেত্রে দায়িত্বহীন সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। বিশেষ করে ওই ঘটনায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছে।

এমন বাস্তবতায় বাজারকে স্বাভাবিক ধারায় ফেরাতে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিভাগের আরো সংবাদ