৫ শর্ত দিয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যানকে উকিল নোটিস পঙ্কজ রায়ের
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » পুঁজিবাজার

৫ শর্ত দিয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যানকে উকিল নোটিস পঙ্কজ রায়ের

অভ্যন্তরীণ বিবাদে নাজুক অবস্থায় আছে ব্রোকারপ্রতিষ্ঠান অ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির তিন পরিচালক এখন দুই ভাগে বিভক্ত। একটি অংশ আছেন চেয়ারম্যান পঙ্কজ রায়। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে জোট হয়েছেন অপর দুই পরিচালক মাধব চন্দ্র দাস ও পার্থ প্রতীম দাশ।

চলমান জটিলতা নিরসনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) হস্তক্ষেপ চেয়ে একাধিক বার চিঠি দিয়েছেন বলে জানান পঙ্কজ রায়। তিনি জানান, অপর দুই পরিচালককে নেপথ্যে ইন্ধন দিচ্ছেন কিছুদিন আগে অ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের পর্ষদ থেকে অপসারিত পরিচালক তপন কুমার পোদ্দার।

পঙ্কজ রায়ের অভিযোগ, চেয়ারম্যান হওয়া সত্বেও অ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজের উপর কার্যত তার কোনো কর্তৃত্ব নেই। অপর দুই পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার তপন কুমার পোদ্দার বিপুল পরিমাণ মার্জিন ঋণ সুবিধা নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে সঙ্কটে ফেলে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানে চলমান নানা আর্থিক অনিয়ম বন্ধ করতে চেয়েও সফল হচ্ছেন না তিনি। সব কিছুতেই অন্ধকারে রাখা হচ্ছে তাকে। এমনকি চেয়ারম্যানের কাছে তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র না দিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে বারণ করে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

বিএসইসি ও ডিএসইর হস্তক্ষেপ চাইলেও দুটি সংস্থাই এ বিষয়ে নির্বিকার বলে দাবি করেন পঙ্কজ রায়। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে অবিলম্বে ৫টি বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গত ৩ মার্চ বিএসইসির বিরুদ্ধে উকিল নোটিস দেওয়া হয়েছে।

বিষয়গুলো হলো- সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা তার আত্মীয়-স্বজনের জন্য মার্জিন ঋণ সুবিধা বন্ধ রাখা; এদের মধ্যে যারা মার্জিন ঋণ নিয়েছেন, তাদের ঋণ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া; ২০১০ সালে বিএসইসির জারি করা সংশ্লিষ্ট আইন পরিপালন না করা পর্যন্ত কোনো পরিচালকদের সম্মানি এবং লভ্যাংশ বিতরণ বন্ধ রাখা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ইস্যু করা সব চেকে প্রত্যেক পরিচালকের স্বাক্ষর নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে ওই নোটিসে।

নোটিসে বলা হয়েছে, এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আদালতে যাবেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান।

চেয়ারম্যান হওয়া সত্বেও অ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজের উপর কার্যত পঙ্কজ রায়ের কোনো কর্তৃত্ব নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। অপর দুই পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার তপন কুমার পোদ্দার বিপুল পরিমাণ মার্জিন ঋণ সুবিধা নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে সঙ্কটে ফেলে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানে চলমান নানা আর্থিক অনিয়ম বন্ধ করতে চেয়েও সফল হচ্ছেন না তিনি। সব কিছুতেই অন্ধকারে রাখা হচ্ছে তাকে। এমনকি চেয়ারম্যানের কাছে তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র না দিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে বারণ করে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

অ্যালায়েন্স সিকিউরিটজ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান পঙ্কজ রায় অর্থসূচককে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে শুধু তাদের পরিচালকদের স্বার্থ জড়িত নয়, এর সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অ্যাকাউন্টহোল্ডার তথা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থও জড়িত। তাই অচলাবস্থা নিরসনে বিএসইসির হস্তক্ষেপ চেয়েছি। তারা কোনো ব্যবস্থা না নিলে প্রয়োজনে আদালতে যেতে আমি বাধ্য।

তিনি জানান, আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এমন সন্দেহে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারী লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে হিসাব গুটিয়ে নিয়েছে। তাই এ মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া জরুরি।

চলমান সঙ্কটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম বন্ধ রাখা উচিত বলে মনে করেন পঙ্কজ রায়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে বিএসইসিকে অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, ২০১৩ সালে অ্যালায়েন্স সিকিউরিটজের চার পরিচালকের মধ্যে ঝামেলা শুরু হয়। ওই সময়ে ডিএসইর সিনিয়র সহ-সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী মধ্যস্থতা করে বিষয়টির সমাধান করেন। কিছু দিন ভালোভাবে চলার পর আবার বিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। বর্তমান চেয়ারম্যান পঙ্কজ রায়কে অপসারণ করে তিন পরিচালক জোর করে দায়িত্বে আসেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। ২০১৫ সালের ২২ জুন আয়োজিত পর্ষদ সভায় এ জটিলতা তৈরি হয়। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রায় দেয়। তাতে চেয়ারম্যান হিসেবে তপন কুমার পোদ্দারের দায়িত্বগ্রহণকে অবৈধ ঘোষণা করে পরিচালনা পর্ষদ থেকে তাকে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

গত বছরের ২২ জুনের পর্ষদ বৈঠকে কোনো এজেন্ডা না থাকায় বোর্ড সভা মূলতবী ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান। এরপরই বাকি তিন পরিচালক বিনা নোটিশে আবার পর্ষদ সভার আয়োজন করেন। সে সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন চেয়ারম্যান। এরপর আদালতের রায় অনুযায়ী চেয়ারম্যান কর্তৃক মূলতবী ঘোষিত বোর্ড সভার পরের কোনো সভাকে আমলে নেওয়া হবে না এবং এরপর থেকে নেওয়া সব সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশের আওতায় থাকবে- মর্মে আদালত স্থগিতাদেশ জারি করে। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশ আসার পর কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করা হলে তা আদালত অবমাননার আওতায় পড়বে- মর্মে রায় দেওয়া হয়।

এদিকে আদালতের রায়ের পর গত সপ্তাহে অফিসে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার সময় কোম্পানির পরিচালক পার্থ প্রতিম দাস পঙ্কজ রায়কে অকথ্য ভাষায় গাল মন্দ করেন। একই সময়ে তাকে জীবন নাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে- অভিযোগ করে গত ৭ মার্চ মতিঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পঙ্কজ রায়।

একই দিন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থপনা পরিচালক একটি অফিসিয়াল সার্কুলার জারি করে। ওই সার্কুলারে বলা হয় তার অনুমোদন বাদে কোনো ব্যক্তিকে কাগজপত্র দেওয়া যাবে না। অথচ প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন অনুসারে চেয়ারম্যান যেকোনো সময়; যেকোনো কাগজপত্র চাইতে পারেন। আদালতের রায়ের পরও তাকে মেনে নিতে পারছনে না প্রতিষ্ঠানটির অন্য দুই পরিচালক।

পুরো বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই তারা কাজ করছেন। এমন অবস্থায় চাকরি নিয়ে শঙ্কায় আছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। বেতন না হওয়ায় ইতোমধ্যে অনেক কর্মকর্তা চাকরি ছেড়েও দিয়েছেন। কাউকে আবার বাধ্য করা হয়েছে চাকরি ছাড়ার জন্য।

চেয়ারম্যান পঙ্কজ রায় বলেন, আইন অনুযায়ী পরিচালক পদ হারিয়েছেন তপন কুমার পোদ্দার। ওই ঝামেলার মিমাংসা না হওয়ার কারণে তা উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। অবশেষে আমরা সঠিক বিচার পেয়েছি।

তিনি বলেন, আদালতের রায়ের পরও বিষয়টি তারা মেনে নিতে পারছেন না। উল্টো তারা আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন। আবার কোনো কর্মকর্তা আমার সঙ্গে কথা বললে তাদেরকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করছেন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পঙ্কজ রায়ের করা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাধব চন্দ্র দাস। তিনি বলেন, আমরা যা কিছু করছি, সব প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই করছি।

অ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজের অচলাবস্থা নিয়ে বিএসইসি ও ডিএসইর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে দেন। তাদের বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে করার কিছুই নেই। কোনো বিনিয়োগকারী বা শেয়ারহোল্ডার তাদের দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত হন- তাহলেই কেবল তারা ব্যবস্থা নেবেন।

ডিএসইর সংশ্লিষ্ট বিভাগের উপ-মহা ব্যবস্থাপক আসাদুর রহমান অর্থসূচককে বলেন, এমন অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এটি তাদের নিজেদের বিষয়। তারাই এটির সমাধান করবেন। যদি কোনো বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আমাদের কাছে অভিযোগ করে তাহলে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেব।

প্রায় একইরকম কথা বলেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান। তিনি বলেন, এই বিষয়ে আমরা একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি যদি বিনিয়োগকারী বা শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হয় তাহলে অবশ্যই আমরা পদক্ষেপ নেব। আর যদি তাদের নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হয়; তাহলে তারাই এর সমাধান করবে।

অর্থসূচক/জিইউ/এমই/

এই বিভাগের আরো সংবাদ