দেড়শ বছর পর ঢাকায় নতুন বন্যপ্রাণির সন্ধান
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » বিবিধ

দেড়শ বছর পর ঢাকায় নতুন বন্যপ্রাণির সন্ধান

জঞ্জাল আর ঝঞ্জাটের শহর ঢাকা। দূষণে দূষণে প্রাণের প্রতিকূল এই মেগা সিটি। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ সেই শহরেই মিলল নতুন প্রজাতির বন্যপ্রণি!

দেড়শ বছর পরে ঢাকায় নতুন প্রজাতির কোনো বন্যপ্রাণি আবষ্কিার করলেন তরুণ প্রাণি বিজ্ঞানী সাজিদ আলী হাওলাদার। সম্প্রতি নতুন প্রজাতির এক ব্যাঙ আবিষ্কার করেছেন তিনি। ঢাকার নামে ব্যাঙটির নামকরণ হয়েছে Zakerana dhaka.

journal.pone.0149597.g005

আর বাংলায় এর নাম ‘ঢাকাইয়া ব্যাঙ’ রাখার প্রস্তাব করেছেন সাজিদ। তিনি জানান, Zakerana ব্যাঙের একটি গণ, যা Dicroglossidae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা কাজী জাকের হোসেনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এই গণের নাম জাকেরানা রাখা হয়েছে।

সাজিদ জানান নতুন প্রজাতি পাওয়ার ক্ষেত্রে এটা তার ৫ম সাফল্য। ২০১১ সালে তার প্রথম স্বীকৃতি মেলে বাংলাদেশের এনডেমিক প্রজাতির ব্যাঙ Fejervarya asmati। পরে অবশ্য গণ বদলে এর নাম করা হয় Zakerava asmati।

এদিকে নতুন প্রজাতির ব্যাঙের আবিষ্কার বিষয়ে সাজিদ জানান, মেগা সিটিতে প্রতিকূল পরিবেশে নতুন প্রজাতির একটি প্রাণি লুকিয়ে ছিল। গত দেড়শ বছর এই শহরে নতুন কোনো প্রাণি না পাওয়া গেলেও এই আবিষ্কার ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। প্রতিকূল পরিবেশে প্রাণ ধারণের ক্ষমতা, অভিযোজিত হওয়ার ক্ষমতা নির্দেশ করে।

তিনি তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সব চিন্তা কে আরেকবার ভুল প্রমাণ করে দিল প্রাথমিক ফলাফল। পৃথিবীর অন্যতম এই ঘনবসতিপূর্ণ শহরেই পাওয়া গেল একটা নতুন প্রজাতির ব্যাঙ, যার পরিচয় ছিল পুরো পৃথিবীর মানুষের কাছেই অজানা! ঢাকার সরু রাস্তার পাশের এই ব্যাঙগুলো আজ পৃথিবীর মানুষের কাছে পরিচিত হল নিজ পরিচয়ে। সসচেয়ে মজার বাপার হলো ব্যাঙটি আবিষ্কৃত হলো গণভবন এবং সংসদ ভবন এলাকা থেকেই। রাজধানীর শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও বর্ষাকালে এই প্রজাতির ব্যাঙের দেখা মেলে। ঢাকা শহরের নামেই দেওয়া হলো ব্যাঙটির নাম ‘Zakerana dhaka’। বাংলাতে বলা যেতে পারে ‘ঢাকাইয়া ব্যাঙ’।

11011039_1180155582000696_5163828313907624124_n

এদিকে সাজিদের এই সাফল্যের উচ্চসিত প্রসংশা করেছেন তার বন্ধু, এক সময়ের গবেষণা সহকারী ও গণমাধ্যম কর্মী নাসিমূল আহসান। তিনি বলেন, গাছপালা, জলাধারকে খুন করে আমরা ইট-কাঠের জঙ্গল তৈরি করছি। ‘ঢাকাইয়া ব্যাঙ’র মতো আরও কত ব্যাঙ, বন্যপ্রাণি প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে- সেই খোঁজ কে রাখে! সাজিদ ভীনদেশে বসে একা একা লড়াই করে যাচ্ছে। তার লড়াইয়ে শরিক হতে পারাটা ভীষণ সুখকর! ঢাকাবাসী কিংবা বাংলাদেশের মানুষ তার জন্য কি করবে জানি না, কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি আমরা ভাই-ব্রাদার মিলে বিমানবন্দরে তার জন্য ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো।

এ বিষয়ে সাজিদের ওই সময়ের আরেক গবেষণা সহকারী ও বন্ধু, কৃষি আন্দোলন কর্মী তপু রায়হান জানান, সাজিদের এই অর্জন আমাদের গর্বিত করেছে। বিশ্বের কাছে আমাদের নতুন রূপে পরিচয় করাচ্ছে। তাকে অভিনন্দন।

তপু বলেন, সেই ক্যাম্পাস থেকে সাজিদকে দেখছি। আর শিখছি, সফল হতে হলে কতটা নিষ্ঠা থাকা দরকার। রাত নাই, দিন নাই, রোদ-বৃষ্টির তফাৎ নাই। কাজ করতে হবে, তো সে করবে। এইটাই আমাদের সাজিদ। আমাদের গর্ব।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্র বর্তমানে ফেলোশিপ নিয়ে হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ফিনল্যান্ড) জীববিজ্ঞান বিভাগে ব্যাঙের শ্রেণিবিন্যাস বিদ্যার (ট্যাক্সেনমি) ওপর পিএইচডি করছেন সাজিদ। কাজের পরিকল্পনায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম ক্যান্সারের বায়োডাইভার্সিটি ইনস্টিটিউট, পর্তুগালের লিসনো বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালির ন্যাচারাল মিউজিয়ামসহ পৃথিবীর অনেক দেশের বিজ্ঞানী মহলের সহায়তা পেয়েছেন।

২০০৪ সালে চবি প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন সাজিদ। এরপর থেকে ব্যাঙ, পাখি নিয়ে তার পথচলা। ব্যক্তিগতভাবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাঙের জীবন প্রণালী ও বংশবৃদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা চালান তিনি। এসময় তিনি ব্যাঙের বংশবৃদ্ধির জন্য হটস্পট হিসেবে পরিচিত চবির কাটাপাহাড় রাস্তার দু’পাশ থেকে বিভিন্ন ব্যাঙের নমুনা সংগ্রহ করতে থাকেন। এরমধ্যে ২০০৮ সালে একদিন পেয়ে যান বিরল প্রজাতির একটি ব্যাঙ। স্বভাব মতো সেটিকে তিনি ব্যক্তিগত সংরক্ষণাগারে নিয়ে গিয়ে এটির প্রজাতি ও প্রকৃতি উদ্ধারের কাজে লেগে যান। কিন্তু সারাবিশ্বে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ও তালিকাভুক্ত সাড়ে ছয়শ প্রজাতির মধ্যেও এ ব্যাঙের অস্তিত্ব খুঁজে পাননি তিনি। তারপর শুরু হয় অন্য ধরনের গবেষণা।

এ ব্যাঙের ব্যতিক্রমী ডাক ও বৈশিষ্ট্য বের করতে তিনি যোগাযোগ করেন বিশ্বের সেরা সব প্রাণি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে। দীর্ঘদিন ধরে পর্তুগাল, ইটালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় ব্যাঙের ডাকের সাউন্ড এনালাইসিস এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে, এ ধরনের ব্যাঙের অস্তিত্ব একমাত্র বাংলাদেশেই পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে তিনি বিশ্বের সেরা প্রাণি বিজ্ঞানীদের সম্পাদনায় প্রকাশিত বন্যপ্রাণির শ্রেণিবিন্যাসের কাজে নিয়োজিত জার্নাল জুট্যাক্সাতে এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ পাঠান। ওই সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ তার আবিষ্কারের সত্যাসত্য যাচাইয়ের পর চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রবন্ধটি গ্রহণ করেন। এরপর গত ৯ ফেব্রুয়ারি জুট্যাক্সা’র ২৭৬১ ভলিউমে এটি প্রকাশিত হয়।

২০১৩ সালে ফিনল্যান্ডের ‘হেলসিঙ্কি কালচারাল ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড-২০১৩’ লাভ করেন। আগামী বছরই পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরতে চান সাজিদ।

অর্থসূচক/টি/

এই বিভাগের আরো সংবাদ