কয়েক ঘণ্টার বিভীষিকা ও রাব্বী
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » লিড নিউজ

কয়েক ঘণ্টার বিভীষিকা ও রাব্বী

সোজা হয়ে তো দূরে থাক, এক পাশে কাত হয়ে গোলাম রাব্বীকে হাঁটতে হচ্ছিল আরেক জনের কাঁধে ভর করে। শরীরের পাশাপাশি চোখেও গত রাতের কয়েক ঘণ্টার বিভীষিকার ছাপ স্পষ্ট। কথা বলার সময় ঢোক গিলছিলেন বারবার, যেন মস্তিষ্কের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার দুঃসহ স্মৃতি থামিয়ে দিচ্ছিল বারবার। হাতের তরতাজা ক্ষত দেখে জিজ্ঞেস করার সাহস হল না এ কিসের। মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক চত্বরে দাঁড়িয়ে তার মুখে যা শোনা গেল তা নিঃসন্দেহে ভয়ংকর।

গোলাম রাব্বী

গোলাম রাব্বী

অন্য সাধারণ দিনের মতোই রোববার রাতে আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াত খেয়ে ফিরছিলেন রাব্বী। সামনে কী অপক্ষা করছে জানলে হয়ত এ জীবনে মোহাম্মদপুরে তাজমহল রোড হয়ে এগুনোর কথা ভাবতেন না তিনি। ঢাকার মতো শহরের ব্যস্ত রাস্তায় ওৎ পেতে বসে থাকা শিকারির কথা কারো এর আগে কল্পনাতেও ছিল না। একে নিয়তি বললে অতুক্তি হবে, বলতে হবে মানুষ ও নাগরিক হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা। রাত এগারোটার পরে সে নাগরিক ব্যর্থতা পেছন থেকে টান দিল রাব্বীর কলার ধরে। এরপর যথারীতি সারা শরীরে চেকিং। রাব্বীর ভাষায়-পকেট থেকে মোবাইল মানিব্যাগসহ সব ধরনের কাগজ ও জিনিসপত্র নিয়ে নেওয়া হল। পরিচয় দেয়া আর কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পাওয়ার আগেই মাদক বহনসহ নানা ঘৃণ্য অপরাধে নাম জড়ানোর হুমকি এসে গেল। মুক্তির পথ একটাই নগদ পাঁচ লাখ টাকা।

হতবিহ্বল রাব্বীর ভাষায়, আটকের পর সেই এসআই মাসুদ আমাকে গাড়িতে তুলে মোহাম্মদপুর এলাকায় চক্কর দিতে থাকে। প্রথমে বলা হল, ৫৪ ধারায় আটক দেখিয়ে মামলার আসামি করা হবে। এক পর্যায়ে এসআই মাসুদ বলেন, ‘পুলিশের ক্ষমতা কী জিনিস বুঝস, তোকে মাদক ব্যবসায়ী বানাবো।’

দেশেরে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে উপস্থাপনা করার কথা জানালে শুরু হয় বেধড়ক মারধর। তাকে জানানো হল, তোকে পায়ে গুলি করে বলা হবে মাদক সেবন করে পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করার কারণে এ পরিণতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তার পরিচয় বলার পর জিজ্ঞেস করা হল, ‘বেতন স্কেল কত। তাড়াড়াড়ি টাকার ব্যবস্থা কর।’

রাব্বী জানান, তাকে গাড়িতে তুলে ‍ঘোরানোর সময় পুলিশ দল আরও কয়েকজনকে একইভাবে আটক করে যা পেয়েছে তাই হাতিয়ে নিয়েছে। তার কাছ তাৎক্ষণিক কিছু আদায় করতে না পেরে ক্রসফায়ারের হুমকিও দেওয়া হয়।

মুক্তিপণ নিয়ে আসার ব্যবস্থা করার জন্য তার হাতে ফোন দেওয়া হল। এই ফাঁকে রাব্বী পুরো ঘটনা জানান তার এক পরিচিতকে। পরে সেই বড় ভাই-বন্ধু অন্য কয়েক জনের সহায়তায় রাব্বীকে উর্দিধারীদের হাত থেকে উদ্ধার করেন।

রাব্বী বলেন, মারের চোটে এখনো মুখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে। ঘাড়সহ সারা শরীরে তীব্র ব্যথা।

একটু থেমে বললেন, পুলিশের খপ্পরে পড়ার কথা এতদিন পড়েছি আর শুনেছি। এবার নিজেই সে দুঘর্টনার শিকার হলাম। এ অভিজ্ঞতা যে কত দুঃসহ তা একমাত্র ভুক্তভোগীদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব।

তার কথা শুনতে শুনতে একটি দৃশ্যের কথা মনে ভেসে উঠল- আফ্রিকার কোন জঙ্গলে এক হরিণ শাবককে ঘিরে রেখেছে হায়েনার দল। কোন এক সৌভাগ্যের কারণে তার গাঁয়ে আঁচড় কেটে ছেড়ে দেওয়া হল। দ্বিতীয় জীবনপ্রাপ্তির পরেও এখনো সে হরিণ শাবক ভয়ে কাঁপছে।

অর্থসূচক/এসবি

এই বিভাগের আরো সংবাদ