দীর্ঘমেয়াদী তহবিল ঋণ পাবে না রাষ্ট্রীয় ব্যাংক
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » ব্যাংক-বিমা

দীর্ঘমেয়াদী তহবিল ঋণ পাবে না রাষ্ট্রীয় ব্যাংক

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের  দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায়  ঋণ পাবে না রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক বাংকগুলো।

দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের উৎপাদনশীল খাতের সক্ষমতা বাড়াতে সম্প্রতি ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় এবং “ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট” এর আওতায় বিশেষ এই তহবিল গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তহবিলের লক্ষ্য দেশের ব্যাংকগুলোর বেশি সুদে বৈদেশিক মুদ্রায় বাণিজ্যিক ঋণের উপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং ঋণ পরিশোধে দীর্ঘমেয়াদের সুবিধা দেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র বলছে, এই তহবিল থেকে ঋণ নিতে ব্যাংকগুলোকে যে ধরনের শর্ত দেওয়া হয়েছে তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। ফলে তহবিল থেকে ঋণ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবে না।

একই কারণে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণ না পাওয়ার তালিকায় রয়েছে- ব্র্যাক ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক

একই কারণে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণ না পাওয়ার তালিকায় রয়েছে- ব্র্যাক ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।

এ তহবিল থেকে ঋণ দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুই দফায় ইতোমধ্যে ১৬ টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে। প্রথম দফায় চুক্তি হওয়া ৪টি ব্যাংক যথাক্রমে মিউচুয়াল ট্রাষ্ট ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও আল-অরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। দ্বিতীয় দফায় ৬টি ব্যাংক যথাক্রমে ইস্টার্ন ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়।

চুক্তির আওতায় ব্যাংকগুলো তহবিল থেকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থাৎ ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদী বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ সহায়তা পাবে।কোন ধরনের খাতে ব্যাংকগুলো ঋণ দেবে সেটি নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করলে ঋণের অর্থ ছাড় করা হবে।

ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে প্রাথমিকভাবে তিন ধরনের শর্ত মানতে হবে। প্রথম শর্ত হলো- ব্যাংকগুলো ঋণ নিয়ে যে ধরনের উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ করবে তা পরিবেশগত, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত কোনো ঝুঁকি তৈরি করবে কিনা তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে টাকা নেওয়ার আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র জমা দিতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত হলো- ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৮ শতাংশের নিচে থাকতে হবে। এছাড়া যেসব ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ্য থেকে পর্যবেক্ষণ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সেগুলো এ তহবিল থেকে কোনো ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবে না।

এ শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় রাষ্ট্রায়াত্ব কোনো ব্যাংক এ ঋণের সুবিধা পাচ্ছে না। কারণ রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৮ শতাংশের বেশি। তাছাড়া রাষ্ট্রায়াত্ব ৪ টি বাণিজ্যিক ব্যাংকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া রয়েছে।

এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সসিয়াল সেক্টর সাপোর্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক প্লানিং ডিপার্টমেন্টর (এফএসএসএসডিপি) যুগ্ম মহাব্যবস্থাপক মেজবাউল হক অর্থসূচককে বলেন, তহবিল থেকে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে আমরা ব্যাংকগুলোর সুশাসনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। ফলে অর্থ পাওয়ার জন্য প্রাথমিক শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে তাদের ঋণ দেও রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংগুলোর একটিও যোগ্য নয়। সব মিলিয়ে ২০ থেকে ২২টি ব্যাংক এই ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবে বলে জানান তিনি।

তহবিলের সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ক্যামেলস সূচককে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থাৎ যে ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিং যত ভালো সুদহারে সেটি তত বেশি ছাড় পাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, ৫ বছর ৭ বছর ও ১০ বছর এই  ৩টি মেয়াদে ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেওয়া হবে। ক্যামেলস সূচকের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে ৩ টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। এর প্রথম ক্যাটাগরিতে অর্থাৎ যে ব্যাংকের সার্বিক দক্ষতা যাদের ভালো তাদের ক্ষেত্রে সুদ হার হবে যথাক্রমে ৫ বছরের ঋণের জন্য ৩ শতাংশ হারে, ৭ বছরের জন্য ৩.২৫ শতাংশ হারে এবং ১০ বছরের জন্য ৩.৫ শতাংশ হারে।

একইভাবে দ্বিতীয় ক্যাটাগরির ব্যাংকগুলোকে যথাক্রমে ৫ বছরের ঋণের জন্য ৩.২৫ শতাংশ হারে, ৭ বছরের জন্য ৩.৫ শতাংশ হারে এবং ১০ বছরের জন্য ৩.৭৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে।

তৃতীয় ক্যাটাগরির ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই সুদহার হবে যথাক্রমে ৫ বছরের ঋণের জন্য ৩.৫ শতাংশ, ৭ বছরের জন্য ৩.৭৫ শতাংশ  এবং ১০ বছরের জন্য ৪ শতাংশ। অর্থাৎ  ক্যামেলস রেটিং এ এক ধাপ উপরে উঠতে পারলে ব্যাংগুলোর দশমিক ২৫ শতাংশ হারে স্প্রেড কমে যাবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্টের প্রকল্প পরিচালক আহসান উল্লাহ বলেন, সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা ব্যাংকগুলোর পারফর্মমেন্সকে মানদণ্ড হিসেবে নিয়েছি। অর্থাৎ যে ভালো সে অবশ্যই বেশি সুবিধা পাবে। অপর দিকে যে খারাপ তাকেও সেভাবে মুল্যায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের কার্যক্রম কিভাবে আরও ভালো করবে সেদিকে নজর দেবে। ফলে ব্যাংকিং খাতে ভালো করার ব্যাপারে একটি প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে।

এদিকে ব্যাংকগুলো গ্রাহক ভেদে ১ থেকে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ হারে বাড়তি সুদ যোগ করে ঋণ দিতে পারবে। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদের হার হবে ৭ শতাংশ। যা বাণিজ্যিক ঋণের সুদের তুলনায় অনেক কম।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে আরও জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ইস্টার্ন ব্যাংক এ সাউথইস্ট ব্যাংক জানিয়েছে তারা অর্থ নিতে প্রস্তুত।

এদিকে প্রাথমিকভাবে তহবিলের পরিমাণ ৩৫০ মিলিয়ন ডলার থাকলেও ব্যাংকগুলোর চাহিদা বড়লে সে অনুযায়ী ঋণ নিতে পারবে। তখন চাহিদার উপর ভিত্তি করে তহবিলের পরিমান আরও বাড়ানো হবে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটি অলিখিত চুক্তি আছে যে ব্যাংকগুলো যদি তাদের ভালো করে এবং সেই অনুযায়ী চাহিদা যদি বাড়ে তবে তহবিলের পরিমাণও বাড়িয়ে দেওয়া হবে।

এ তহবিল থেকে গ্রাহক পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থাৎ ডলারে ঋণ প্রদান করা হবে। ফলে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার (ফ্লাকচিউয়েশন) উঠা-নামার কারণে যদি হার বেড়ে যায় তখন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এফএসএসএসডিপির যুগ্ন মহাব্যবস্থাপক মেজবাউল হক বলেন, এই ঝুঁকি জেনেই গ্রাহককে ঋণ নিতে হবে। তবে গত ২০ বছরে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার (ফ্লাকচিউয়েশন) উঠা-নামা হার ২ শতাংশের মধ্যে। ফলে তারা যদি ৭ শতাংশ সুদ হারে ঋণ নেয় এবং ফ্লাকচিউয়েশন হার যদি ২ শতাংশ যুক্ত হয় তাহলে তার সর্বোচ্চ সুদ হার দাড়াবে ৯ শতাংশ হারে। যেটি সাধারণ ব্যাংক ঋণ বা যে কোনো বৈদেশিক ঋণের সুদ হারের চেয়ে অনেক কম। কারণ সাধারণত বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রে সুদ হার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। সে তুলনাই এটি অনেক কম। রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকবে না। ঝুঁকিটা থাকবে মূলত যারা দেশিয় বাজারের জন্য উৎপাদন করবে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ