বিবিসির চোখে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » লিড নিউজ

বিবিসির চোখে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ

প্রচণ্ড রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে শুরু হলো ২০১৫ সাল। শেষদিকেও এই উত্তেজনা বিরাজমান। তবে শুরুতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠা থাকলেও বছর শেষে পরিস্থিতি অনেকটা শীতল। সব মিলিয়ে দেশে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা ছিল সমাপ্ত বছরে।

বছরজুড়ে বাংলাদেশের আলোচিত ঘটনাগুলো নিয়ে ‘বাংলাদেশ: ফিরে দেখা ২০১৫’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। ওই প্রতিবেদনের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

রাজনীতিতে শুরু, রাজনীতিতে শেষ: আওয়ামী লীগ জোটের অধীনে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। ২০১৫ সালের ৫ই জানুয়ারি সেই নির্বাচনের বছর পূর্তি পালন নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি মুখোমুখি অবস্থান নেয়। ৫ই জানুয়ারি ঢাকায় সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল বিএনপি। এঘটনাকে কেন্দ্র করে তার দুদিন আগে থেকে নিজ কার্যালয়ে প্রশাসন কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখে দলটির প্রধান খালেদা জিয়াকে।

Gulshan

বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের সামনে আরাফাত রহমান কোকোকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স। ছবি: মহুবার রহমান

গুলশানের অফিস থেকে বের হতে না পেরে খালেদা জিয়া অব্যহতভাবে একটি অবরোধ কর্মসূচি চালানোর ঘোষণা দেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আর ব্যাপক ধড়পাকরের মধ্যে শুরু হয় দেশজুড়ে টানা অবরোধ। সেইসঙ্গে সহিংসতার পথ বেছে নেয় তারা।

গুলশানের কার্যালয়ে দিনরাত অবস্থান করেছিলেন খালেদা জিয়া। একপর্যায়ে সেখান থেকে পুলিশ অবরোধ তুলে নিলেও প্রথম দিকে খালেদা জিয়া সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে অস্বীকৃতি জানান। টানা ৯২ দিন সেখানে অবস্থান করেন তিনি। পুরো সময়টা দেশ কার্যত অচল ছিল। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেল শতাধিক মানুষ।

বছরের শেষেও রয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। তবে সহিংসতা নয়, এখন চলছে নির্বাচনী উত্তাপ। বছর শেষ হওয়ার ১ দিন আগে দেশের ২০০টির বেশি পৌরসভায় মেয়র নির্বাচনে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ভোটযুদ্ধে নামছে প্রার্থীরা। জাতীয় নির্বাচনের অংশ না নিলেও এই নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন বিএনপির প্রার্থীরা।

হামলার লক্ষ্য ভিন্নমত: ২০১৫ সালে ব্লগারদের উপর একের পর এক হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে। দেশজুড়ে ভিন্ন মতাবলম্বী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি নাগরিকদের উপর সন্ত্রাসী হামলা ঘটেছে বেশি কয়েকটি।

২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকার বাংলা একাডেমির বইমেলা থেকে ফেরার পথে আততায়ীর হামলায় নিহত হয় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ব্লগার ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক অভিজিৎ রায়। মারাত্মক আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা বন্যা আহমেদ। অভিজিৎ রায় বাংলাদেশে দ্বিতীয় ব্লগার যিনি ভিন্ন মত প্রকাশের জন্য খুন হয়। এর আগে প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে চলা শাহবাগ আন্দলনের সময়।

অভিজিৎ রায়ের হত্যার পর চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আরও ৩ জন ব্লগার খুন হয়। মার্চ মাসে খুন হয় ওয়াশিকুর রহমান, মে মাসে অনন্ত বিজয় দাস আগস্ট মাসে নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় এবং অক্টোবর মাসের শেষে ঢাকায় ২টি প্রকাশনা সংস্থায় একযোগে হামলার ঘটনা ঘটে। জাগৃতি নামে একটি প্রকাশনা সংস্থার মালিক ফয়সাল আরেফীন দীপন তার কার্যালয়ে নৃশংস হত্যার শিকার হয়।

Gulshan2

সিজার তাবেলা হত্যার পর গুলশানজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ছবি: মহুবার রহমান

বিদেশিরাও ছিলেন হামলার লক্ষ্য: ২০১৫ সালে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের উপর হামলার কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে পৃথক হামলায় প্রাণ হারান ২ জন বিদেশি নাগরিক। ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার গুলশানে আততায়ীর হামলায় নিহত হন সিজার তাভেলা নামে এক ইতালীয় নাগরিক। ৩ সেপ্টেম্বর রংপুরে নিহত হন কুনিও হোশি নামে এক জাপানি নাগরিক। এরপর আরও কয়েকজন বিদেশি নাগরিকের উপর হামলা হলেও তারা বেঁচে যান। এসময়ে বাংলাদেশে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে বিশ্বের অনেক দেশ। এমনকি হামলার আশঙ্কায় অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ক্রিকেট দল তাদের বাংলাদেশ সফরও বাতিল করে।

ভিন্ন মতালম্বীদের উপর একের পর এক হামলার পেক্ষাপটে বছরের শেষ দিকে এসে শুরু হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। নজিরবিহীন হামলার শিকার হয়েছে শিয়া মতাবলম্বীরা। ২৩ অক্টোবর গভীর রাতে তাদের পবিত্রদিন আশুরা উপলক্ষে আয়োজিত তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে পুরান ঢাকার ইমামবাড়ায় বোমা হামলায় একজন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হন। ঢাকার ৪০০ বছরের ইতিহাসে এর আগে কখনও শিয়া মতাবলম্বীরা কোনো হামলার শিকার হয়নি।

২৬ নভেম্বর বগুড়ার শিবগঞ্জে শিয়া মতাবলম্বীদের একটি মসজিদে নামাজের সময় মুসল্লিদের উপর এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে মসজিদের মুয়াজ্জিনকে হত্যা করা হয়। এসময় ইমামসহ তিনজন আহত হন। গত ৪ ডিসেম্বর দিনাজপুরের কাহারোলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী কান্তজিউ মন্দির প্রাঙ্গণে শতবর্ষ পুরনো এক মেলায় বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। ১০ ডিসেম্বর ওই কাহারোলেই কৃষ্ণভক্ত হিন্দুদের আরেকটি মন্দিরে একযোগে বোমা ও গুলি হামলা চালানো হয়।

এসময় বিদেশি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্থাপনায় হামলার ঘটনায় দায় স্বীকার করে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠীর নামে। যদিও বেশিরভাগ ব্লগার হত্যাকাণ্ডের দায় আল কায়েদার কথিত ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা স্বীকার করেছিল।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা দায় স্বীকারের ঘটনাগুলোকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের এক নতুন মাত্রা হিসেবে বর্ণনা করেন। যদিও সরকার বরাবরই এ আশঙ্কা অস্বীকার করে বলেছে, বাংলাদেশে আইএসসহ কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব নেয়।

rajon

সামিউল আলম রাজনকে অত্যাচারের ছবি।

অমানবিক নিষ্ঠুরতা: বছরের মাঝামাঝি সময়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার জন্ম দেয়- সিলেটে শিশু রাজন ও খুলনায় রাকিবকে নির্মমভাবে হত্যা। ওই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড মানুষকে নাড়া দিয়েছে বিশেষভাবে। জুলাই মাসে সিলেটে শিশু রাজন নামে এক শিশুকে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা দেশের মানুষ।

শিশু রাজন হত্যার মূল অভিযুক্ত কামরুল ইসলাম ঘটনার পরই সৌদি আরব চলে গিয়েছিল। সেখানে তাকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত আনা হয় তাকে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার কার্যক্রম শেষে কামরুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেয় সিলেটের আদালত।

অপরদিকে আগস্ট মাসে খুলনায় রাকিব নামে এক শিশুর মলদ্বার দিয়ে মোটরগাড়ির চাকায় হাওয়া দেওয়া নল ঢুকিয়ে বাতাস প্রবেশ করিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাও প্রচণ্ড সমালোচিত হয়। নভেম্বরে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির রায় দেয় আদালত। এতো দ্রুত কোনো মামলার বিচার করাটাও বাংলাদেশের নজিরবিহীন ঘটনা।

মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির বিষয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে ৩ জন মানবতাবিরোধী অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এপ্রিলে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। নভেম্বরে একই রাতে জামায়াতের আরেক শীর্ষ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

Mustafizur Rahman

বামহাতি ফাস্ট বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে টাইগারদের উল্লাস।

সুখবর: ২০১৫ সালে হোমগ্রাউন্ডে খেলা একদিনের আন্তর্জাতিক সিরিজের সবকটিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। বাংলাদেশের কাছে পরাজিতের তালিকায় রয়েছে ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পরাক্রমশালী দল।

গত ৬ জুলাই জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদের মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজি শেষ হওয়ার পর দেখা গেছে, বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র দূরীকরণের লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে পূরণ করেছে।

বাংলাদেশে বহু বিতর্ক সৃষ্টিকারী মেগা নির্মাণ প্রকল্প পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ঢাকার কাছে মুন্সিগঞ্জে পদ্মা নদীর উপর দিয়ে শুরু হয়েছে মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণ কাজ। গত ১২ ডিসেম্বর ৬ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সেতুটির মূল অবকাঠামো নির্মাণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটির সম্পূর্ণ অর্থায়ন করবে বাংলাদেশ সরকার; যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এর আগে এই প্রকল্পটিতে বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়ন করার কথা থাকলেও দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে অর্থায়ন বাতিল করে সংস্থাগুলো।

এই বিভাগের আরো সংবাদ