শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » বিবিধ

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ

দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকর হচ্ছে এই স্বস্তি নিয়ে জাতি আজ নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছে। দিবসটি উপলক্ষে আজ সোমবার ভোর থেকেই মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের বাইরে মাজার রোড ও আশেপাশের এলাকা এবং বায়েরবাজার বদ্ধভূমি এলাকায় জনতার ঢল নামে।

President & PM

শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এবছর এমন একটি প্রেক্ষাপটে বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করা হয়েছে যখন একাত্তরের সেই যুদ্ধাপরাধী ও বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে সংশ্লিষ্টদের বিচার কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে মানবতাবিরোধী হত্যা মামলায় দণ্ডিত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হয়েছে। জামায়াতের অপর নেতা মো. কামারুজ্জামান এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম হোতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে অতি সম্প্রতি।

মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এবং বায়েরবাজার বদ্ধভূমিতে শ্রদ্ধানিবেদন করতে আসা মানুষের মুখে দাবী ছিল যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নেওয়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে।

দিবসটি উপলক্ষে আজ রোববার সকালে কালো পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করণ, শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, শহীদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জলন, শোক র‌্যালি, শ্রদ্ধা নিবেদন, চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান ও হাতের লেখা প্রতিযোগিতা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

১৯৭১ সালের এই দিনে চুড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুইদিন আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পরিকল্পিতভাবে দেশের কৃতী সন্তানদের হত্যা করে। তারপর থেকে দিনটি শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

BNP & Khaleda Zia2

শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। ছবি মহুবার রহমান

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানাতে সকালে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নেমেছিল। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই হাজারো মানুষ ভিড় করেন মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের সামনে। সবার হাতে ফুলের তোড়া, কালো ব্যানারে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে লেখা ‘বুদ্ধিজীবীর স্মরণে ভয় করিনা মরনে’ বুদ্ধিজীবীদের রক্ত বৃথা যেত দেব না’ ‘জামায়াত, শিবির, রাজাকার এই মুহুর্তে বাংলা ছাড়’, ‘জামায়াতের রাজনীতি, নিষিদ্ধ কর করতে হবে’, একাত্তরের ঘাতক রাজাকার, আলবদর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে স্লোগান দিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে স্মৃতিস্তম্ভের বেদিমূলে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তারা দীর্ঘক্ষণ।

শ্রদ্ধা নিবেদনের সময়ে সবার দাবী ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে, জাতি আর এ কলঙ্ক বহন করতে চায় না। যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নেওয়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করা সহ সে দেশের সকল পণ্য বর্জন করতে হবে।

Shaheed Buddijibi Dibosh2

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীর রায়েরবাজার বদ্ধভূমিতে সাধারণ জনতার ভিড়। ছবি: মহুবার রহমান

সকাল ৮ টা ৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে নিয়ে দলের পক্ষে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এ সময় আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী ও ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন ও আ ফ ম বাহা উদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজিত রায় নন্দি,সংসদ সদস্য আসলামউল হক আসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৯ টার দিকে ধানমন্ডিস্থ ৩২ নম্বর ভবনের সামনে রক্ষিত জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ত্যাগ করার পর স্মৃতিস্তম্ভ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খুলে দেওয়া হয়। পরে একে একে শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা জানায় কেন্দ্রীয় ১৪ দল, শহীদ পরিবারের সন্তান ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা।

এরপর শ্রদ্ধা জানান দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি, দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি, দলের সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, দলের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), দলের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গণফোরাম, দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী দল, দলের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলসহ (বাসদ) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা।

এছাড়াও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, আওয়ামী যুবলীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, তাঁতিলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ, যুব মহিলা লীগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আমার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, জাতীয় জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানান।

এদিকে বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রায়ের বাজারের বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে সকালে মানুষের ঢল নামে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দালাল রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস সদস্যরা যেখানে জাতির মেধাবী সন্তানদের হত্যা করে ফেলে রেখেছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে বাড়তে থাকে জনতার স্রোত। সব স্রোত যেন এক মোহনায় মিশে একাকার হয়ে যায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে মুহুর্মূহ স্লোগানে বদ্ধভূমি এলাকা প্রকম্পিত হয়ে উঠে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বধ্যভূমির আদলে মানব ভাস্কর্য রচনা করে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর।

বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এক সভার আয়োজন করে আওয়ামী লীগ। দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভায় সভাপতিত্বে করেন এবং গুরুপ্তপূর্ণ ভাষন দেন।

দিবসটি উপলক্ষে সকাল ১১ টায় বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ স্থানে কুরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এ সময়ে মুক্তিযুদ্ধে নিহত সব শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মুনাজাত করা হয়।

এদিকে বিকেলে দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভার আয়োজন করে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)। ডিইউজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অতিকুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফ্রাদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

এছাড়ও জাতীয় প্রেসক্লাবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন অপর অংশ এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। সংগঠনের সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান সাজুর সভাপতিত্বে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কামরুল ইসলাম চৌধুরী, প্রবীণ সাংবাদিক গোলাম মহিউদ্দিন, ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক খায়রুল আলম বকুল, জাতীয় প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি আমিরুল ইসলাম কাগজী, বিএফইউজের নির্বাহী সদস্য সৈয়দ মেসবাহ উদ্দিন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

সূত্র: বাসস

এই বিভাগের আরো সংবাদ