প্রতিটি মানুষই একটি করে আলাদিনের প্রদীপ নিয়ে আসে
today-news
brac-epl
প্রচ্ছদ » বিবিধ
শুভ জন্মদিন হুমায়ুন আহমেদ

প্রতিটি মানুষই একটি করে আলাদিনের প্রদীপ নিয়ে আসে

‘পৃথিবীতে আসার সময় প্রতিটি মানুষই একটি করে আলাদিনের প্রদীপ নিয়ে আসে, কিন্তু খুব কম মানুষই সেই প্রদীপ থেকে ঘুমন্ত দৈত্যকে জাগাতে পারে।’humayun

উক্তিটি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকের। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি সমাদৃত। তিনি হুমায়ুন আহমেদ। তিনি ঠিকই আলাদিনের প্রদীপের দৈত্যের ঘুম ভাঙ্গিয়েছেন। তিনিই সাহিত্যের রাজ্যে গড়েছেন জনপ্রিয়তার ‘গুলিস্তান’।

আজ বাংলা কথাসাহিত্যের প্রবাদপুরুষ খ্যাত  হুমায়ুন আহমেদের জন্ম দিন।হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই নভেম্বর নেত্রকোণার কেন্দুয়ার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন।পিতা ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ।

হুমায়ুন আহমেদের লেখা থেকে জানা যায় ছোটবেলায় তার ডাক নাম ছিলো কাজল। কিছুদিন পরেরই তার বাসার সকলে তাকে বাচ্চু বলে বলে ডাকতে শুরু করে। কারণ  তার পিতার শখ ছিলো কয়েকদিন বাদেবাদেই ছেলেদের নাম পরবির্তন করা।humayun-ahmed_5

বাবার চাকুরী সূত্রে  আবাসের মতো নিয়মিতই বদলাতে হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। তিনি পরে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই বিজ্ঞানে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন।এরপর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে । ওঠেন মহসীন হলে।

একবার হলে সাঁড়া পড়ে গেল!  নতুন একজন ছাত্র হলে উঠেছে। যে কিনা হাত দেখে যে কারো ভবিষ্যত বলে দিতে পারে। মুহসীন হলের ছাদে বসে সে প্রতিদিন কোনো না কোনো ছাত্রের হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলে দেয় এবং সে যা বলছে তার প্রায় সবই মিলে যায়! শুধু তা-ই নয়, এই ছেলে ম্যাজিক দেখাতে পটু! হুমায়ুন আহমেদ ম্যাজিকম্যান হিসেবে অল্পদিনের মধ্যেই সার ক্যাম্পাসে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন।H_M

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

তবে লেখালেখির শুরুটা আরো কিছুদিন আগের। তার প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে।  ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে উপন্যাসটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭২-এ কবি-সাহিত্যিক আহমদ ছফার উদ্যোগে উপন্যাসটি খান ব্রাদার্স কর্তৃক গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রখ্যাত বাংলা ভাষাশাস্ত্র পণ্ডিত আহমদ শরীফ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দিলে বাংলাদেশের সাহিত্যামোদী মহলে কৌতূহল সৃষ্টি হয়। সত্যিকারে এর পরে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। লেখালেখিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় একসময় তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে দেন। শিক্ষক হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন এই অধ্যাপক৷

তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। তার বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত। সত্তর দশকের শেষভাগে থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর।

তার সৃষ্ট হিমু ও মিসির আলি চরিত্রগুলি বাংলাদেশের যুবসমাজকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে। তার নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহ পেয়েছে অসামান্য দর্শকপ্রিয়তা।

সংখ্যায় বেশী না হলেও তাঁর রচিত গানগুলোও সবিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার অন্যতম উপন্যাস হলো নন্দিত নরকে, মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প, মাতাল হাওয়া ইত্যাদি।

হুমায়ূন আহমেদ বিয়ে করেছেন দুইবার। প্রথমা স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ।তাদের বিয়ে হয় ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে।এই দম্পতির তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে। তিন মেয়ের নাম বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং ছেলের নাম নুহাশ আহমেদ।

১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যভাগ থেকে শীলার বান্ধবী এবং তার বেশ কিছু নাটক-চলচ্চিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী শাওনের সাথে হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠতা জন্মে। এর ফলে সৃষ্ট পারিবারিক অশান্তির অবসানকল্পে ২০০৫-এ গুলতেকিনের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয় এবং ঐ বছরই শাওনকে বিয়ে করেন। এ ঘরে তাদের তিন ছেলে-মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রথম ভূমিষ্ঠ কন্যাটি মারা যায়। ছেলেদের নাম নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন।

২০১১ সেপ্টেম্বের তার দেহে মলাশয়ের ক্যান্সার(কোলন ক্যান্সার )ধরা পড়ে। তিনি নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তবে টিউমার বাইরে ছড়িয়ে না-পড়ায় সহজে তার চিকিৎসা প্রাথমিকভাবে সম্ভব হলেও অল্প সময়ের মাঝেই তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ১২ দফায় তাকে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর তাঁর কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলেও, শেষ মুহূর্তে শরীরে অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমণ করায় তার অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কৃত্রিমভাবে লাইভ সাপোর্টে রাখার পর ১৯ জুলাই ২০১২ তারিখে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন।

এই বিভাগের আরো সংবাদ